বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোর প্রায় ৫৩ শতাংশ অঞ্চলে বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততা রয়েছে। লবণাক্ততার প্রভাব কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু, মানবস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান। এর মধ্যে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধান সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ফসল। ফলে এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকায় বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উৎপাদন কমে যাচ্ছে। উৎপাদিত ফসলেও থাকছে নানা ত্রুটি। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর কৃষিজমিতে লবণের স্বাভাবিক মাত্রা ধরা হয় ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি অব স্যালিনিটি (ডিএস)। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণায়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকার কৃষিজমিতে ২৫ ডিএস মাত্রায় লবণের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ধরনের তথ্য রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে বিশেষজ্ঞদের। ২০২২ সালেও এসব এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা ছিল মাত্র ৪ দশমিক ১ ডিএস। সে হিসাবে গত তিন বছরে লবণাক্ততা বেড়েছে ছয় গুণের বেশি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এর প্রভাবে কৃষি ফলন কমে গিয়ে জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। এত দ্রুত কীভাবে লবণাক্ততা বেড়েছে তা খতিয়ে দেখতে সে বিষয়ে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

এ অঞ্চলে লবণাক্ততা বিভিন্ন মাত্রায় উপস্থিতির কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি হলো—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিক চিংড়ি চাষ এবং উজান থেকে সীমান্তবর্তী নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, খুলনা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর ও সাতক্ষীরা জেলায় ফসল উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষকরা বর্তমানে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। শুষ্ক মৌসুমে তারা জমি পতিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে (অক্টোবর-মে পর্যন্ত) খরার মৌসুমে নদীর লবণাক্ততায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে, যা পানীয় ও সেচযোগ্য পানির ঘাটতি তৈরি করবে এবং জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাবে। নদীর লবণাক্ততা ও মিঠা পানির প্রাপ্যতার পরিবর্তন মাছ চাষের উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করবে। এতে মিঠা পানির মাছ ও চিংড়ির প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে প্রধান ও সর্বাধিক বাজারমূল্যের ‘সুন্দরী’ গাছের পরিবর্তে ‘গেওয়া’ ও ‘গরান’ গাছের আধিক্য দেখা দিতে পারে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় মাটির লবণাক্ততা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। ২০৫০ সালের মধ্যে গড়পড়তা লবণাক্ততা ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এ বৃদ্ধি ৫৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে। তবে লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবেলায় স্থানীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে যেসব কৌশল বিদ্যমান রয়েছে সেগুলো পর্যাপ্ত নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে এমন কিছু অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে এ অঞ্চলের মানুষের উপকারে আসে।

এছাড়া বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০৩ সাল থেকে লবণাক্ততা সহনশীল বেশ কয়েক জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে। যাতে সেসব এলাকায় এ জাতগুলো চাষ করা যায়। কারণ প্রচলিত জাতগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভালো ফলন দিতে পারে না। যদিও নতুন উদ্ভাবিত এসব জাত কৃষকদের মধ্যে তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। একটি নতুন জাত মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করে বিস্তৃত করতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগে, যার মধ্যে লবণাক্ততা আরো বেড়ে গিয়ে সেই জাতটি অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। ফলে দেশের বহু আবাদযোগ্য জমি অনাবাদি বা পতিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্যমতে, দেশের আবাদযোগ্য জমির ৩০ শতাংশের বেশি উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। ১৯৭৩-২০০৯ সাল পর্যন্ত একটি তুলনামূলক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৮ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর উপকূল ও চরাঞ্চলের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততা রয়েছে।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, মৎস্য অধিদপ্তর, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আবাদযোগ্য জমির মধ্যে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর (৪৯ লাখ একর) লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে বার্ষিক গড় তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের পরিমাণে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে, যা সরাসরি দেশের প্রধান ফসল যেমন ধান ও গমের উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলের উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ এতে কীটপতঙ্গের আক্রমণ বাড়ছে।

লবণাক্ততা বাড়ার কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। লবণাক্ত পানি পান করায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। যেমন উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, কলেরা, অকাল গর্ভপাত, বিকলাঙ্গ সন্তান জন্মদান, অপুষ্টি ইত্যাদি। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে। আইসিডিডিআর,বি গবেষকরা তাদের পর্যবেক্ষণাধীন এলাকায় ১২ হাজার ৮৬৭টি গর্ভধারণের তথ্য নথিভুক্ত করেছেন। তারা প্রতিটি গর্ভবতী নারীকে সন্তান প্রসব পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেন এবং দেখতে পান, যারা উপকূলীয় সমতলে, সমুদ্রতট থেকে ২০ কিলোমিটারের মধ্যে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাত মিটার উচ্চতায় বসবাস করেন, তারা অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের নারীদের তুলনায় গর্ভপাতের ঝুঁকিতে ১ দশমিক ৩ গুণ বেশি থাকেন। তারা মনে করছেন, এ পার্থক্যের মূল কারণ হলো নারীরা যে পানি পান করেন, তাতে অতিরিক্ত লবণের উপস্থিতি।

লবণাক্ততার কারণে দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু ও জলজ প্রাণীর ওপরই কেবল প্রভাব পড়ছে না বরং মানুষের কর্মসংস্থানও কমছে। গ্রীষ্ম মৌসুমে কৃষিকাজ, যেমন ধান চাষ ও ঘেরভিত্তিক চিংড়ি চাষ কমে যাওয়ায় নারী-পুরুষ উভয়েরই কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। অনেক পুরুষ গ্রাম ছেড়ে নগর বা অন্যান্য গ্রামীণ কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চলে কাজের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন। নারীরা কৃষি-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। যেসব পরিবার চিংড়ি চাষে সফল হয়েছেন তারাও খাদ্যনিরাপত্তায় ভুগছেন। কারণ লবণপানির ঘের চাষের কারণে যেসব জমিতে আগে গাছপালা, ফলমূল হতো এখন আর কিছুই হয় না।

লবণাক্ত পরিবেশে চাষাবাদ অভিযোজনে বিভিন্ন কৌশলের কথা উঠে এসেছে। যেমন উন্নত সেচব্যবস্থা, সার ব্যবহার, জমি উঁচু করা, উঁচু বেডে চাষ, খাড়াভাবে উদ্যানচাষ (ভার্টিক্যাল হর্টিকালচার) ও লবণাক্ত সহনশীল গাছপালা। এসবের মধ্যে স্থানীয় কৃষকরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মিঠা পানির সেচ ব্যবস্থাকে। এ সেচ ব্যবস্থা তাদের চাষাবাদের জন্য অপরিহার্য। মিঠা পানির সহজলভ্যতা থাকলে ফসল উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু তা না থাকলে অন্য কোনো কৌশলই কার্যকর নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

তাই মিঠা পানির উৎস ও প্রবাহ বাড়াতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। খাল, নদী বা পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে। মিঠা পানি সংরক্ষণ করে প্রতিটি বাড়ি ও কৃষিজমিতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি লবণাক্ত জলাধার থেকে অন্য কোথাও যাতে পানি প্রবেশ করতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। স্থায়ীভাবে মিঠা পানির সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে লবণপানির ঘের সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।

লবণ সহনশীল গাছপালা, বিশেষ করে ধান ও গমের জাত এবং বেগুন, টমেটো, কুমড়োর মতো সবজির জাত নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা এগুলোকে সম্ভাবনাময় মনে করলেও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার সঙ্গে প্রযুক্তি কতটা তাল মিলিয়ে চলতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য আরো সহনশীল জাত প্রয়োজন। আরো একটি চ্যালেঞ্জ হলো একটি নতুন জাত মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করে বিস্তৃত করতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগে, যার মধ্যে লবণাক্ততা আরো বেড়ে গিয়ে সেই জাতটি অকার্যকর হয়ে যায়। তবে সবচেয়ে কার্যকর ও প্রয়োজনীয় অভিযোজন কৌশল হতে পারে মিঠার পানির সেচ ব্যবস্থা। এলাকাভিত্তিক সমস্যার সমাধান হলেও এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবস্থাপনার কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে দেশে খাদ্য সুরক্ষার জন্য ভূমি লবণাক্তকরণ সমস্যার মোকাবেলা করা অতীব জরুরি।