স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭১। কিন্তু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তালিকায়ও নিচের সারিতে অবস্থান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে, অন্যতম হলো দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পর্যাপ্ত দক্ষ শিক্ষক না থাকার পেছনে দুর্বল শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থার বড় দায় রয়েছে। এখানে নিয়োগের ক্ষেত্রে বরাবরই গবেষণা ও দক্ষতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের সাম্প্রতিক খসড়া নীতিমালায় চোখ রাখলে বিষয়টি আরো একবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ নীতিমালায় দেখা গেছে, এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের জন্য যথাক্রমে ৫ ও ১০ নম্বর ধার্য করা হয়েছে। আর পিএইচডির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৫ নম্বর। অর্থাৎ এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল। অথচ পিএইচডি ডিগ্রি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য অপরিহার্য। এটি শুধু একাডেমিক জ্ঞান নয়, বরং নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে সহায়ক। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে একজন জটিল সমস্যা বিশ্লেষণ, তথ্যভিত্তিক সমাধান তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় অবদান রাখতে সক্ষম হন। যে কারণে অধিকাংশ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডিকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে ধরা হয়। এমনকি এশিয়ার নানা দেশে চীন, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও শিক্ষক নিয়োগে পিএইচডি ডিগ্রিকে ন্যূনতম শর্ত হিসেবে ধরা হয়। পাশাপাশি নিয়োগে গুরুত্ব দেয়া হয় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, স্বীকৃত জার্নালে প্রকাশনা ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে। যে কারণে তারা বিশ্ব র্যাংকিংয়েও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে আসতে পারে।
দুঃখজনকভাবে আজও এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ নীতিমালায়। স্কুল-কলেজের ফলাফলকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। গবেষণাকর্ম ও উদ্ভাবনী দক্ষতা এখানে গৌণ বিষয়। বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের সাম্প্রতিক এক নিয়োগ পরীক্ষায়ও লক্ষ করা গেছে। সেখানে একজন প্রার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিতে ভালো ফল করেও বাদ পড়েছেন। কারণ প্রার্থীর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফল শর্ত পূরণ করেনি। বলা বাহুল্য, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এ ধারা বজায় থাকলে কখনই উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান বাড়বে না।
পৃথিবী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন উচ্চ মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকরা। কেবল তাই নয়, পিএইচডি চলাকালীন অনেক শিক্ষার্থী এমন কিছু আবিষ্কার করেছেন যেগুলো পৃথিবীতে আমূল পরিবর্তন এনেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন আবিষ্কারকদের কথা। এর সূচনা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি শিক্ষার্থী ল্যারি পেজ আর সের্গেই ব্রিন। তাদের সঙ্গে ছিলেন কম্পিউটার বিজ্ঞানী তামারা মাঞ্জনারও। এ ঘটনা এ গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় যে শিক্ষকরা যদি দক্ষ গবেষক ও উদ্ভাবনী জ্ঞানসম্পন্ন না হন তাহলে শিক্ষার্থীদের পক্ষেও খুব বেশি এগোনো সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ও মানসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারবে না। স্ট্যানফোর্ড, এমআইটি কিংবা সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বকে বদলে দিয়েছে তাদের দক্ষ শিক্ষকের গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে। আর এটি সম্ভব হয়েছে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পিএইচডি ডিগ্রি বা গবেষণার গুণগত মানকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে। কিউএস র্যাংকিংয়ের সেরা ১০০ তালিকায় এশিয়ার যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জায়গা করে নিয়েছে, দেখা গেছে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে পিএইচডি। এ তালিকায় আছে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটি, সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়, মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়া। সুতরাং শিক্ষা ও উদ্ভাবনে অগ্রগামী অবস্থান অর্জন করতে হলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয়ও শিক্ষক নিয়োগে গবেষণা, পিএইচডি ডিগ্রি ও আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে করতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।
দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, শর্ত শিথিল, এমনকি আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ পাওয়া যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির তথ্যে দেখা গেছে, গত দেড় দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়োগ পেয়েছেন অন্তত ৮ হাজার ৮০০ জন। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কর্মরত শিক্ষকদের ৫৪ শতাংশই নিয়োগ পেয়েছেন গত ১৫ বছরে। তাদের বড় অংশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় স্বজনপ্রীতি, দলীয় বিবেচনা, শর্ত শিথিল, আর্থিক লেনদেনসহ অবৈধ উপায়ে নিয়োগ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০১৬ সালের এক প্রকাশনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ, বিজ্ঞপ্তির বাইরে মাত্রাতিরিক্ত নিয়োগ, পরীক্ষার ফল প্রভাবিত করাসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়। এমনকি আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পদে নিয়োগে ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্যও উঠে আসে ওই প্রকাশনায়। এসব তথ্য বলে দেয়, শিক্ষক নিয়োগে বেশির ভাগ সময়ই যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হয়েছেন, আর সুযোগ পেয়েছেন অযোগ্যরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত শিখন ও শেখানোর ওপর। এতে কর্মজীবনে গিয়ে গ্র্যাজুয়েটরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে একজন শিক্ষার্থী পরিণত বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাদের আলোকিত করার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। জ্ঞান, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, সৃজনশীলতাসহ মানবিক গুণাবলির উন্মেষ ঘটাতেও ভূমিকা রাখেন শিক্ষকরা। তাই উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ে কোন কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হবে সেটি খুবই সতর্কভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মেধা, গবেষণা, দক্ষতাকে যেমন প্রাধান্য দেয়া দরকার; তেমনি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে বিদ্যমান যাবতীয় অনিয়ম বন্ধ করে শিক্ষা ও গবেষণার মান নিশ্চিত করবে এমন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।










