পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চালুর পর জাহাজের গড় অপেক্ষমাণ সময় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে বলে সংসদে জানিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। বন্দর অবকাঠামোর এসব অগ্রগতির পরও চট্টগ্রাম নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা আড়াল করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, বছরে ১১ লাখ কোটি টাকার বেশি শুল্কায়িত আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহনকারী বন্দর শহর চট্টগ্রাম বিশ্ব বন্দরনগরের তালিকায় কখনো ঠাঁই পায়নি। ডিএনভি পাবলিকেশন ও মেনন ইকোনমিকসের র‍্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রবন্দর, শিল্প ভিত্তি ও ব্লু ইকোনমির সম্ভবনা থাকা সত্ত্বেও কেন চট্টগ্রাম বৈশ্বিক মানচিত্রে নিজের জায়গা করে নিতে পারছে না, এ প্রশ্ন তাই ওঠা স্বাভাবিক। কারণ সরকার চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর বলে অভিহিত করলেও এ নগরটি জলাবদ্ধতা, ভোগান্তির কারণেই শিরোনামে আসে বেশি। কাঠামোগত এ সংকট নিরসনে তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সাত-আট বছর ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড—এ তিন সংস্থা মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ের চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে বলা হলেও বর্ষা মৌসুমের প্রথম ভারি বৃষ্টিতে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হলেও জলকপাট বা স্লুইস গেট নির্মাণে বিলম্ব, খালের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা অপসারণে ব্যর্থতা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মেগা প্রকল্পগুলোর প্রকৃত সুফল নগরবাসী পাচ্ছে না। একই সঙ্গে সড়ক উঁচু করার সময় পার্শ্ববর্তী ড্রেন ও বসতবাড়ির উচ্চতার সমন্বয় না করায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ে তেমন মনোযোগ দেয়া হয়নি।

চট্টগ্রামের নগর উন্নয়নে মাস্টারপ্ল্যানের ঐতিহ্য নতুন নয়। ১৯৯৫ সালের পূর্বাচল মাস্টারপ্ল্যানেই জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন খাল খননের নির্দেশনা ও ব্যয় নির্ধারণ করা ছিল। কিন্তু তখন তা বাস্তবায়ন হয়নি; বরং পরবর্তী দুই দশকে খালের জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। বর্তমানে বহুগুণ বেশি ব্যয়ে সেই কাজ করার চেষ্টা চলছে। শহরের পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক নির্মাণ ও খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব একাধিক সংস্থার হাতে বিভক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম ও পারস্পরিক জবাবদিহি এখনো দুর্বল। একটি সংস্থার নির্মিত অবকাঠামো আরেকটি সংস্থার অবহেলায় অকার্যকর হয়ে পড়ার নজিরও আছে। চট্টগ্রামের ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে এসব সমস্যার কারণ বলা হয়। এক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের রটারডামের প্রসঙ্গ হাজির করতে হয়। শহরটির বিস্তীর্ণ অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত হওয়ায় প্রাকৃতিক ঝুঁকি চট্টগ্রামের চেয়ে অনেক বেশি। তবু বাঁধ, খাল, পাম্পিং স্টেশন, কৃত্রিম জলাধার ও স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে রটারডাম বরাবরই বিশ্বের শীর্ষ ১০ বন্দরনগরীর তালিকায় জায়গা করে নেয়। রটারডাম প্রমাণ করেছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই একটি শহরকে সমুদ্রকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে পারে।

আধুনিক বন্দর হিসেবে গড়া হলেও আশপাশের শহর যদি জলাবদ্ধতা, যানজট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণে জর্জরিত থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর কাছে বন্দরনগর হিসেবে চট্টগ্রামের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে। বন্দর ও শহরকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে অভিন্ন উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। এজন্য সিডিএ, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের খাল, ড্রেন ও জলাধার-সম্পর্কিত কার্যক্রম একটি একক নগর জল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা প্রয়োজন। এভাবে দায় এড়ানোর সুযোগ সংস্থাগুলো পাবে না। হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অগ্রগতি যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বাইরে স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে দায় নির্ধারণের সুস্পষ্ট বিধান রাখতে হবে। পুনঃখনন করা খাল ও প্রাকৃতিক জলাধার পুনরায় দখল হওয়া ঠেকাতে ভূমি ব্যবহার আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নালা ও খাল ভরাটের অন্যতম কারণ যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা। উৎসে বর্জ্য পৃথক্‌করণ ও নিয়মিত সংগ্রহ ব্যবস্থা জোরদার না করা পর্যন্ত অবকাঠামোগত বিনিয়োগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। একই সঙ্গে বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পের সঙ্গে নগরের ড্রেনেজ, সড়ক ও পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পনা একীভূতভাবে প্রণয়ন করতে হবে। এভাবে বন্দরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি নগর ব্যবস্থাপনার সংকট দ্বারা সীমাবদ্ধ হবে না।

সিঙ্গাপুর ও রটারডামের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়নের বদলে অন্তত ২৫-৩০ বছর মেয়াদি সমন্বিত নগর ও বন্দর উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টালে যেন উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির না হয় সেটি এর মাধ্যমে নিশ্চিত হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের বড় কারণ অনিয়মিত তহবিল ছাড় ও ভূমি অধিগ্রহণে দেরি। বাজেট বরাদ্দের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন নেতৃত্ব নিয়োগ করা জরুরি।

চট্টগ্রামের সামনে এখন দুটি পথ খোলা। একদিকে সিঙ্গাপুর, রটারডাম বা সাংহাইয়ের মতো স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক বন্দরনগরী হয়ে ওঠার সুযোগ। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার চক্রে আটকে থাকার ঝুঁকি। প্রকৃতি চট্টগ্রামকে আদর্শ বন্দরনগর হয়ে ওঠার সুযোগ দিলেও তা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নীতির ধারাবাহিকতা। বন্দর অবকাঠামোয় বিনিয়োগের পাশাপাশি নগর ব্যবস্থাপনার সংস্কার একই অগ্রাধিকারে না আনা গেলে, চট্টগ্রাম শুধু কাগজে-কলমেই ‘বাংলাদেশের সিঙ্গাপুর’ থেকে যাবে।