চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ভিয়েতনামের প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) দাঁড়িয়েছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় গত ছয় মাসে বাংলাদেশের এফডিআই এক বিলিয়নেও পৌঁছায়নি। কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগ প্রসঙ্গে কাউকে প্রশ্ন করলে সবার আগে যে কথাটি শোনা যায়, আমাদের অসম সুযোগ ব্যবস্থা। এখানে প্রশ্ন আসে আর কোন কোন বিষয় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে আমরা এটিকে বলি ‘থ্রি-সি’।

বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিশ্বাসযোগ্যতা, নীতি ধারাবাহিকতা ও সক্ষমতা—এ তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। এক. রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রথমে কেউ যদি বিনিয়োগ করার জন্য টাকা নিয়ে আসে, তাকে সেই দেশের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এটি দেশী-বিদেশী যেকোনো বিনিয়োগকারীর জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু আমাদের এখানে নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর পরিবেশ ঠিক নেই। যে কারণে বিনিয়োগকারীরা আমাদের সহযোগিতা করে না ও রাষ্ট্রের ওপর তাদের বিশ্বাস থাকে না। নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর পরিবেশ কেমন তা ব্যাখ্যা করছি। ইউনিলিভার বাংলাদেশ প্রায় ৬২ বছর ধরে ব্যবসা করছে। সম্প্রতি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য একটি জমি নিবন্ধন করা হয়েছে। সেটি পুরোপুরি বুঝে পেতে আমাদের ৩০ মাস সময় লেগেছে। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানের যদি একটি জমি পেতে ৩০ মাস লাগে তাহলে নতুন কোনো কোম্পানি এ দেশে ব্যবসা করতে এলে সেটির কী অবস্থা হবে? এমনকি নিবন্ধন ও চুক্তির সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধও করা হলেও এটির মধ্যে জটিলতা রয়েছে। এখন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর পরিবেশ সহজীকরণ প্রয়োজন। এছাড়া আইনের প্রয়োগ নিয়ে অনেক জটিলতা রয়েছে। এক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মেধাস্বত্ব অধিকার (আইপিআর) ও স্বত্বাধিকার (কপিরাইটস)। এগুলোর সঙ্গে আমরা ভালোভাবে পরিচিত নই। আমরা শুধু আর্থিক বিনিয়োগ নিয়ে আসি না, ব্র্যান্ডও নিয়ে আাসি। তাই ব্র্যান্ডকে রক্ষা করাটাও জরুরি। আমরা এখানে একটি ব্র্যান্ড নিয়ে এলে সেটি নকল করা হচ্ছে। ব্র্যান্ড রক্ষার্থে কপিরাইট নিরাপত্তাকে আরো উন্নত করতে হবে। মেধাস্বত্ব অধিকার আরো কীভাবে সংরক্ষণ করতে পারি সেটা নিয়ে কাজ করা দরকার।

আবার ব্যবসায়িক আলাপ-আলোচনার, চুক্তির বিষয়ে বাংলাদেশের দুর্নাম রয়েছে। যেকোনো বিষয়ে মতানৈক্য থাকতেই পারে, চুক্তির বরখেলাপ হতে পারে। সেসব বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট নিয়মকানুন রয়েছে। সম্মানজনক উপায়ে এর সমাধান হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সুতরাং আমরা এসব সংস্কার কীভাবে করতে পারি, যাতে বিশ্বাযোগ্যতা গড়ে তুলতে পারি, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে।

একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতাও জরুরি। আমি যে নীতিটা প্রণয়ন করি, সেটি যদি আমি পরিবর্তন করে ফেলি তাহলে এটি কীভাবে সহায়ক হবে? উদাহরণস্বরূপ যদি বলি, আমার জন্য একটা ট্যাক্স রেট আছে। আমি সে রেট ধরেই অর্থবছরের আর্থিক হিসাবনিকাশ সম্পূর্ণ করার পর আমাকে জানানো হলো যে আমার ট্যাক্স রেট বেশি। এ রকম নজির এ দেশে আছে। কিন্তু আজকে কোনো বিদেশী বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করল, আর আগামী বছর কর বেড়ে গেলে এতে বিনিয়োগ আসবে না। কর বেশি হওয়াটা সমস্যার না। কিন্তু কর বাড়ালে সেটি স্পষ্টভাবে একটি অর্থবছরের হিসাব সম্পন্ন করার আগেই জানাতে হবে। ব্যবসার জন্য এটি ক্ষতিকারক। যদিও আশার খবর হলো বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে এ নিয়ে আমরা আলোচনা করছি এবং এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।

বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে আরেকটি জরুরি বিষয় হলো সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় থাকা। বিডা কর সম্পর্কে এক ধরনের বলল, এনবিআর অন্য ধরনের কথা বললে চলবে না। আমি যদি বিনিয়োগ নিয়ে আসি এবং সে চুক্তিটি বিডার সঙ্গে হয়, তাহলে সবকিছুর নির্ধারক হতে হবে বিডাকেই। বিডাকে সব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমি খুশি হয়েছি দেখে যে বিডার বর্তমান ম্যানেজার বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। দেশী বা বিদেশী বিনিয়োগকারীকে যদি নিয়ে আসা হয় এবং প্রতিশ্রুতি দেয়া হয় তাহলে সেটা রক্ষা করতে হবে।

এর বাইরে রয়েছে সক্ষমতা। পুঁজিবাজার তৈরি করা হয়েছে উদ্যোক্তারা যেন সেখান থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারেন। অথচ ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তরা গত অর্থবছরে ১ শতাংশেরও কম টাকা উত্তোলন করেছেন এ দেশের পুঁজিবাজার থেকে। ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ টাকা ব্যাংক থেকে ওঠানো হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তা আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি।

আমাদের এসব অধিকার প্রয়োজন। আর এর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা। সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া এসব অধিকার রক্ষা করা কঠিন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিনিয়োগের পরে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। শুধু বিনিয়োগ আনলে হবে না, তাদের খেয়ালও রাখতে হবে। এরই মধ্যে এ নিয়ে কিছু কাজ শুরু হয়েছে। নিরীক্ষণের ওপর প্রতিক্রিয়া জানানো শুরু হয়েছে। এছাড়া অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটর (এইও) চালু হয়েছে। আমরা সবাই জানি এখানে কাস্টমসের কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একই কোম্পানিকে বছরের পর বছর একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ ও সম্পদ নষ্ট হয়। এক্ষেত্রে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিল। এখন এইও সুবিধা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বন্দরে দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স সুবিধা পাবে। কোনো বাধাবিপত্তি ছাড়াই বন্দর থেকে আমদানি পণ্য খালাস করে সরাসরি নিজেদের ওয়্যারহাউজে নিয়ে যেতে পারে। এতে তাদের সময় বাঁচে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সময়সূচি মেনে চলা সহজ হয়। এ ধারণা তিন-চার বছর ধরেই বাংলাদেশে ছিল। কিন্তু কেউ তা ব্যবহার করতে পারেনি বা ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি।

মোট কথা, সার্বিকভাবে ট্যাক্স সিস্টেমকে ডিজিটালাইজড করতে হবে। মানুষের হাতে ছেড়ে দেয়া হলে এটি কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর কর ব্যবস্থা না থাকাটাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ দেশে একজন বিনিয়োগকারীর করহার ৪৫ থেকে ৪৮ শতাংশ। এটি এত বেশি যে তুলনাও করা যায় না। এখন যদি আমাকে কেউ বলে বিনিয়োগ করতে, আমি করতাম না। একজন ব্যবসায়ী কেবল করের কারণে এখানে বিনিয়োগ করতে চায় না সে কথা সবসময় মনে রাখা প্রয়োজন। এটি নিয়ে কাজ করতে হবে। বর্তমানে এগুলো সংস্কারের সময় এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ একটি বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা উপস্থিত আছেন। আমি তাকে অনুরোধ করব বাংলাদেশে কোনো পাবলিক রিলেশন (পিআর) এজেন্সি খোলা যায় কি না সেটি নিয়ে ভাবতে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা এখানে রয়েছে, তবে ভালো দিকও রয়েছে। সেগুলোও সামনে আসা উচিত। কাজটি পিআর এজেন্সি করতে পারবে।

মোহাম্মদ জাভেদ আখতার: চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড

[১১ নভেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]