বাংলাদেশ সংবিধানে স্পষ্টভাবে বৈষম্যের বিপরীতে বলা আছে। এর ভিত্তিতেই দেশের আইনগত কাঠামো, অর্থনৈতিক পরিবেশ ও ব্যবসার নীতিগত কাঠামো তৈরি হলে এবং প্রয়োগ নিরপেক্ষভাবে হলে দেশে অনেকাংশে বৈষম্য কমে যেত বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘‌সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ কতটুকু দেখেছি সেটা বহুবার বলেছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে যখন আমাকে বলতে বলা হলো, তখন Anatole’s France-এর বিখ্যাত একটি উদ্ধৃতি মনে পড়ল। সেটি হলো, ‘‌The law, in its majestic equality, equally forbids the rich as well as the poor to sleep under bridges, to beg in the streets, and to steal bread.’ বাংলাদেশের আইনের কাঠামো অনেকটা এ রকমই। আমরা সবার জন্য অনেক কিছু নিষেধ করে দিই। কিন্তু যাদের জন্য প্রয়োজন এবং যারা বৈষম্যের শিকার হয়ে আমাদের সমাজের ‘‌সামাজিক চুক্তি’ অনুসারে সুযোগ-সুবিধা নিতে পারছেন না তাদের জন্য আইনের কাঠামো কীভাবে তৈরি ও প্রয়োগ করব—সেই চিন্তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। সেই কাজগুলো করতে গিয়ে আমরা সংযোগ হারিয়েছি। বাংলাদেশে যথেষ্ট ভালো আইন আছে। কিন্তু আইন ভালো থাকলেও প্রয়োগের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই বৈষম্য সৃষ্টির জন্য আমাদের আইনগত কাঠামোর ব্যবহার হয়েছে; বৈষম্য নিরসনের জন্য ব্যবহার হয়নি। ব্যবসা কাঠামোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, আমার ৩০ বছরের ব্যবসায়িক আইনজীবীর অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমাদের যে আইন আছে তার চেয়ে ৬০-৭০ শতাংশ রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন আছে। আজকে যদি এগুলো বাদ দিয়ে দেয়া হয় তাহলে আমাদের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে আরো স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা পেতে পারি। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আধুনিক ব্যবসায়িক ফ্রেমওয়ার্কের অনুশীলন দেখে রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন স্থাপন করতে পারি।

আজকে আইনের ব্যবহার নিয়ে আলোকপাত করতে চাচ্ছি। কিছু আইন রয়েছে তার কাঠামোয় বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। কিন্তু আমরা সবসময়ই আইনের সমভাবে প্রয়োগ, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা চাই। কিন্তু এসব বিষয়ে বহু বছর বলার পরও এখনো আমরা পাইনি। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান উপস্থিত আছেন। গত দুই-তিন দশকে এ নিয়ে আমরা বহু আলাপ করেছি। সেখান থেকে দু-একটি উদাহরণ দেয়া দরকার। যদিও আমরা গণমাধ্যমে এসব উদাহরণ নিয়মিত পড়ছি। ধরুন, এনবিআরের ট্যাক্সেশনের আইনগুলোয় ডিসপ্রেশন থাকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ট্যাক্স রিটার্নস বা কাস্টমসের কার্যক্রমে নিরীক্ষা করার প্রবিধান রয়েছে। কিন্তু বছরের পর বছর যখন একই কোম্পানির নাম ওই দৈবচয়নে উঠে আসে তখন সেই আইনের ব্যবহারের স্বচ্ছতার ব্যাপারে প্রশ্নের উদ্রেক হয়।

আরেকটি বিষয় নিয়ে বলা দরকার। জমির ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত কর কাঠামো বা ফির কাঠামো নিয়ে গভর্নর ও এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে সম্প্রতি আলোচনা করেছি। বাংলাদেশে খুব কমসংখ্যক ছাড়া কোনো জমির প্রকৃত বাজারমূল্য দলিলে প্রতিফলিত হয় বলে মনে হয় না। কেন? কারণ দলিলে যে মূল্য দেয়া হবে তার ওপর ১৬ শতাংশের কাছাকাছি কর দিতে হবে। কাজেই মৌজা ভ্যালু দিয়ে আরো কম কর দেয়া যায়। তাতে কী হলো? কেউ পৈতৃক সূত্রে যে জমিটা তার বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন সেটি বৈধ সম্পদ। কিন্তু সেটা বিক্রি করে যে টাকা পাচ্ছেন তার অধিকাংশই কিন্তু কালো টাকা হয়ে যাচ্ছে। সেটাকে বৈধ করতে গিয়ে তখন তারা বলছেন অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দেয়া হোক। এরপর বলছেন, এ অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করতে হলে তারা নিয়মিত করদাতার চেয়ে কম কর দিয়ে বৈধ করবেন। এ ধরনের বৈষম্যমূলক আইন ও বৈষম্যমূলক ব্যবহারে কী হয়? যারা বৈধভাবে কাজ করতে চান এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালাতে চান—তারা একটি হতাশায় পড়ে যান। আইনকে সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না করা হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিন্তু আইন প্রয়োগ করা যায় না। বিষয়টি আমাদের সবার একান্ত মনে রাখা দরকার। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাই না কেন বা ইজ অব ডুয়িং বিজনেসের কথা বলি না কেন—আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে আইনি কাঠামো রয়েছে তা অত্যন্ত ভালো আছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ আইনের যে বৈষম্যমূলক প্রয়োগ দেখেছি, তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

আরেকটি জিনিস দেখছি, যেখানে নাগরিকদের জবাবদিহি করা হচ্ছে সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক বা দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি করা হচ্ছে না। সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা এদিকে নজর দেবেন বলে আশা করছি। কারণ একজন নাগরিকের ক্ষেত্রেই শুধু একা একা কোনো আইন ভঙ্গ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

এখানে আরো দুটো বিষয় সংক্ষেপে বলছি। এক. পরিবেশ ও জলবায়ুসংক্রান্ত আইন, বিশেষ করে পরিবেশসংক্রান্ত আইনের বৈষম্যমূলক ব্যবহারে শুধু ব্যবসায়ী কিংবা ব্যবসার ক্ষতি হয় না। বরং পরিবেশগত ক্ষতি বা অবক্ষয়ের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে দেশের নিম্ন আয় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ওপর, বিশেষ করে মহিলাদের ওপর। এর বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ করার পথও খুব কম।

বৈষম্যমূলক আইন ও বৈষম্যমূলক ব্যবহারের কারণে লিঙ্গবৈষম্য প্রকট হয়। এর অন্যতম উদাহরণ ট্রেড লাইসেন্স। বাংলাদেশের নারীরা অনেকেই ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পের ব্যবসা করছেন। কিন্তু ট্রেড লাইসেন্স না পাওয়ার কারণে তারা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারছেন না। এ কারণে এখনো আমাদের ৭০-৮০ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। পরিচালন বিধিনিষেধ তাদের ওপর অনেক বেশি পড়ে। কারণ এ বিধিনিষেধ যিনি ১০ লাখ টাকার ব্যবসা করছেন তার ওপর যতখানি পড়ছে, তেমনি যিনি ১ কোটি টাকার ব্যবসা করছেন তার ওপর সমভাবেই ততখানি পড়ছে। এ বিষয়গুলো আইন ও নীতি প্রণয়ন বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই মনে রাখি না। আইন-আদালতের ক্ষেত্রেও কেউ যদি কারো কাছে ৫ লাখ টাকা পান, তাকে যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে এবং বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে, তেমনি যিনি ৫০ কোটি পান তার জন্যও একই প্রক্রিয়া।

সবশেষে বাংলাদেশের যেসব নিয়ন্ত্রক ও আইনি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ একান্ত প্রয়োজন। গত কয়েক দশকে এটি একেবারে হয়নি, বরং অনেক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিগুলো নড়ে গেছে। সেগুলোকে অনেক শক্ত করে গড়ে তুলতে হবে। দার্শনিক প্লেটো ও জেমস ম্যাডিসনের দুটি কথা বলে আমার আলোচনা শেষ করছি। প্লেটো বলেছিলেন, ‘Good people do not need laws to tell them to act responsibly, while bad people will find a way around the laws.’ অন্যদিকে জেমস ম্যাডিসন বলেছিলেন, ‘If Men were angels, no government would be necessary.’

নিহাদ কবির: সাবেক প্রেসিডেন্ট, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)

[১১ নভেম্বর বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বৈষম্য, আর্থিক অপরাধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির নিরাময়’ শীর্ষক তৃতীয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৪-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্য]