বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল টানা বৃষ্টিতে জলমগ্ন রয়েছে। অসংখ্য মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন, পাহাড়ধসের ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রায় বর্ষায় কমবেশি একই চিত্র দেখা যায়, বিশেষত জলাবদ্ধতা। এ পরিস্থিতি কতটা জলবায়ু বিপর্যয় আর কতটা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাগত সংকট থেকে উদ্ভূত?

বর্তমান পরিস্থিতি জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ঘাটতি—উভয়েরই ফল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারি বৃষ্টিপাতের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে, যা শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার পেছনে মানবসৃষ্ট কারণও ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ অবকাঠামো, খাল দখল ও পলি জমে নাব্যতা হ্রাস, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢালে নির্মাণকাজ। তাই জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপক হলেও এর প্রভাব কতটা গুরুতর হবে, তা মূলত নির্ভর করে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ওপর।

কার্যকর পূর্বাভাস ব্যবস্থার মাধ্যমে কী চলমান দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কমানো যেত?

জলবায়ুজনিত দুর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কার্যকর পূর্বাভাসের মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। নির্ভুল বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস এবং বন্যা ও ভূমিধসের তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ দেয়। এ ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া, জরুরি সেবাদানকারী দল প্রস্তুত রাখা, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আগাম মজুদ রাখা যায়। বিশেষ করে ভূমিধসের মতো দুর্যোগ থেকে জনগণের সুরক্ষায় সময়োপযোগী সতর্কবার্তা অত্যন্ত কার্যকর। এতে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষ ঢাল ধসে পড়ার আগেই নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ পান। এমন আগাম প্রস্তুতি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আপনার গবেষণায় চট্টগ্রামের খালগুলোর যে অবস্থা পেয়েছিলেন, তা কি চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি তৈরিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে?

জলাবদ্ধতা ও শহরের খাল নিয়ে আমার সরাসরি কোনো গবেষণা নেই। তবে বিভিন্ন কাজ ও গবেষণার প্রয়োজনে মাঠপর্যায়ে গিয়ে আমি লক্ষ করেছি যে পলি জমা, কঠিন বর্জ্য ফেলা, অবৈধ দখল এবং অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে অনেক খালের কার্যকর পানিপ্রবাহের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। খাল শহরের প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অংশ। যখন এসব খালের পানিপ্রবাহের সক্ষমতা কমে যায়, তখন বৃষ্টির পানি দ্রুত নিম্নাঞ্চলের জলাশয়ে পৌঁছতে পারে না। ফলে ভারি বৃষ্টির সময় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। তাই নগর বন্যা ও জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনায় খাল পুনরুদ্ধার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

চট্টগ্রামের বর্তমান ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?

মূল সমস্যা হলো নগর পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির অভাব। খাল, ড্রেন ও পাম্পিং স্টেশনের মতো নিষ্কাশন ব্যবস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু এগুলোর দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে বিভক্ত থাকায় পরিকল্পনা, সমন্বয় ও রক্ষণাবেক্ষণে দুর্বলতা দেখা দেয়। এর সঙ্গে অকার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে ড্রেনেজ ব্যবস্থা আরো অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

স্লুইস গেট ও পাম্পিং স্টেশনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রকৃত বৃষ্টিপাতের তীব্রতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

একই সময়ে ভারি বৃষ্টিপাত এবং জোয়ারের কারণে জলস্তর বেড়ে গেলে স্লুইস গেট দিয়ে বৃষ্টির পানি কার্যকরভাবে নিষ্কাশন করা যায় না। এ অবস্থায় পাম্পিং স্টেশনই পানি নিষ্কাশনের প্রধান ভরসা হয়ে ওঠে। কিন্তু পাম্পিং স্টেশনের সক্ষমতা পর্যাপ্ত না হলে নিচু এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায়। তাই জলবায়ু সহনশীল নকশা এবং হালনাগাদকৃত বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস বিবেচনায় নিয়ে এসব ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়মিত মূল্যায়ন ও উন্নয়ন করা প্রয়োজন।

Rangamati-pani

জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি মূল্যায়নে আধুনিক তথ্য-উপাত্ত বা মডেলিং কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে বাস্তব পরিকল্পনায়?

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। তবে গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম, রিমোট সেন্সিং, ড্রোন জরিপ, লাইডার ও স্যাটেলাইটভিত্তিক পর্যবেক্ষণ বন্যার পূর্বাভাস, ড্রেনেজ পরিকল্পনা ও ঝুঁকি মূল্যায়নকে অনেক বেশি কার্যকর করতে পারে। তবে অবকাঠামো নকশা ও নগর পরিকল্পনার সঙ্গে এসব প্রযুক্তির আরো কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে, যাতে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব হয়।

প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলোর কারিগরি নকশা কি ভবিষ্যতে চট্টগ্রামে পানি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে?

প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য নিয়মিত খাল রক্ষণাবেক্ষণ, পলি অপসারণ, দখল প্রতিরোধ, কার্যকর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনাও সমানভাবে জরুরি।

স্বল্পমেয়াদি (তাৎক্ষণিক নিষ্কাশন) ও দীর্ঘমেয়াদি (কাঠামোগত সংস্কার) সমাধানের মধ্যে অগ্রাধিকার কোথায় হওয়া উচিত?

চট্টগ্রামের বন্যা বা জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—উভয় ধরনের সমাধানই গুরুত্বপূর্ণ এবং এগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা উচিত। স্বল্পমেয়াদে বন্ধ হয়ে যাওয়া ড্রেন পরিষ্কার করা, পাম্পিং স্টেশনগুলো কার্যকর রাখা, বর্জ্য অপসারণ এবং ভারি বৃষ্টির সময় জরুরি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। জলাবদ্ধতা সংকট নিরসনে জনসচেতনতাও জরুরি। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা থেকে জনগণকে বিরত থাকতে হবে। কেননা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় অংশীদার জনগণ। কেবল প্রশাসন দিয়ে এগুলো সঠিক ব্যবস্থাপনায় রাখা কঠিন হবে।

এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে প্রাকৃতিক জলপথ পুনরুদ্ধার, জলবায়ু সহনশীল ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, নগর জলাধার ও পানি ধারণক্ষম এলাকা সংরক্ষণ এবং সমন্বিত নগর পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। টেকসই সমাধানের জন্য তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের প্রতি আপনার সুপারিশ কী?

নগর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি নেয়া জরুরি, যেখানে খাল, ড্রেন, পাম্পিং স্টেশন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে। এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত জলপ্রবাহ সক্ষমতা মূল্যায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। খাল দখল প্রতিরোধ এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করবে। একই সঙ্গে জিআইএস এবং রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরো উন্নত করতে পারে। অবকাঠামোর নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু অতীতের বৃষ্টিপাতের তথ্য নয়, ভবিষ্যতে বৃষ্টিপাতের ধরন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। কার্যকর নগর ড্রেনেজ ও বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রতিক্রিয়াভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক ও আগাম প্রস্তুতিমূলক কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যাতে প্রতিরোধ, সহনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।