সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনে গিয়েছিলেন। ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় অংশীদার ভারতে না গিয়ে এ দুই দেশে যাওয়ার কূটনৈতিক তাৎপর্য কী?
ব্যক্তিগতভাবে আমি এ দুই সফরকে সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি এগ্রেসিভ পুশ হিসেবে দেখি। বোঝা যাচ্ছে, সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। সে আলোকে নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিজস্ব স্বকীয়তা গড়ার চেষ্টা থেকেই হয়তো ভারতে না গিয়ে মালয়েশিয়া-চীন সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনী ইশতাহারের স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এ সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি। সরকারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের ভিত্তিতে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় এ দুই দেশে সফর করা হয়েছে। স্বভাবতই বৈদেশিক নীতিমালার ক্ষেত্রে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। আর এ সফরের মাধ্যমে সরকার এ বার্তাই দিয়েছে, আমরা একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করব। জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করেই সফর নির্ধারিত হবে। পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টাও সে কথাই বলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কোন দেশ সফর করব সে সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হবে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বাজার বহুদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। শ্রমবাজারটি আবারো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চালু করা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফরে শ্রমবাজার খোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি বাদে এ সফরের বড় অর্জন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ। এখন কূটনৈতিক মহল যদি সঠিকভাবে দরকষাকষি করতে পারে তাহলে দেশের অর্থনীতিতে অনেক সুফল আসতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আর হালাল অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার অগ্রগতিও ইতিবাচক অর্জন। অন্যদিকে চীন আমাদের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী। অবকাঠামো, মূলধনি যন্ত্রপাতি, অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ প্রতিরক্ষা খাতেও দেশটির সঙ্গে আমাদের সুদৃঢ় ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সে আঙ্গিকে চীন সফরটিও আমাদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণেও চীনের ব্যাপক অবদান রয়েছে। এজন্যই এ দুই সফরকে সরকারের কৌশলগত কূটনীতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সরকার সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়ে তার নীতিমালা নির্ধারণের কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে কি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির পূর্ণ প্রতিফলন পাওয়া গেছে?
স্বাভাবিকভাবে যেকোনো উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্রে সফর করলে প্রত্যাশা থাকে অনেক। কিন্তু প্রত্যাশার তুলনায় প্রাপ্তি কমই আসে। এ দুই সফরেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা রয়েছে। তবে এ দুই প্রারম্ভিক সফরের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত প্রক্রিয়া পুনর্জীবিত হলো।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ আছে। এরই মধ্যে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর জন্য সরকার আবেদন করেছে। সামনে তার নিষ্পত্তি হবে। এলডিসি উত্তরণ কৌশলগত কারণে এবার পেছানো হলেও একসময় আমাদের উত্তরণ করতেই হবে। এমনটি হলে অনেক ক্ষেত্রে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে। এমনকি চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা আর কোটা নিয়ে কিছু বিষয়ে আবার আলোচনা করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। এগুলো দূর করার জন্য রফতানি বাড়ানোর পাশাপাশি বহুমুখী করার বিকল্প নেই। রফতানি বাজার সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তিগত সুবিধা আদায়ে এ দুটি সফর প্রয়োজনীয় ছিল। আর এ দুই সফরের মাধ্যমে সরকার বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সেটা হলো তারা অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারগুলোকে শুরু থেকেই বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।
চীন সফরে ১৩টি সমঝোতা ও দুটি চুক্তি সই হয়েছে। এগুলো প্রকৃত অর্থে আমাদের অর্থনীতিতে বড় রূপান্তর আনতে পারবে বলে মনে হচ্ছে?
চীন সফরে সরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমঝোতা ও চুক্তি স্বাক্ষরেই গুরুত্ব দিয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এর প্রতিফলন ঘটেছে। আমাদের অর্থনীতির জন্য কিছু কিছু সমঝোতা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়। এর মধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনার ব্যবস্থাপনাটিকে নিয়ে আগে কথা বলতে হয়। এবার কাঠামোগত নিয়ম অনুসরণ করেই সমঝোতা হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রথমে সরকারের ব্যবস্থাপনার অধীনে ছিল। সেখানে পানি ব্যবস্থাপনা, বণ্টনের বিষয় ছিল। প্রধানমন্ত্রীও জানিয়েছেন, যেকোনো মূল্যেই এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন হবে। চীনের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে সমঝোতা হয়েছে।
সবুজ ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়ে সমঝোতা স্মারকটাও খুবই জরুরি। প্রধানমন্ত্রী উদ্ভাবন, সুনীল অর্থনীতি ও সবুজ অর্থনীতিতে জোর দিয়েছেন। এজন্য বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এগুলো আমাদের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত। এর বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর পাশাপাশি কারিগরি ও শিক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী চীনে পড়ালেখা করছেন। এ বিষয়ে কিছু সহযোগিতা হবে। এদিকে ভোকেশনাল ও কারিগরি প্রশিক্ষণ আমাদের শিক্ষা খাতের গুণগত মান ও শিল্পসংযুক্তির স্বার্থে প্রয়োজন। মিডিয়া ও কমিউনিকেশনে মনোযোগ বাড়ানোর জন্যও সমঝোতা হয়েছে।
বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য তিনটি সমঝোতা হয়েছে। বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য সম্ভবত চট্টগ্রামের আনোয়ারাকে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হবে। চীনের শেনজেনে যে অর্থনৈতিক অঞ্চল আছে সেখানে কী পরিমাণ বিনিয়োগ আকর্ষণ হয়েছে তা প্রত্যক্ষ করেছি। শেনজেন অর্থনৈতিক অঞ্চল সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, তদারকি, কর রেয়াত এবং গবেষণা সুবিধা পাওয়ায় দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। সেটিরই ক্ষুদ্র সংস্করণ হিসেবে আনোয়ারাকে বিবেচনা করা যায়। বিডা জানিয়েছে, এ সমঝোতার পর এরই মধ্যে বিনিয়োগে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। শিল্প স্থানান্তরের সমঝোতা হয়েছে। চীন মূল্য সংযোজন করে এমন সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় অবদান রাখতে সক্ষম। তাই তারা বিশ্বের নানা প্রান্তে শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থানান্তর করছে। দেশটির সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি বড়, বরং আমরা অনেক প্রয়োজনে চীন থেকে আমদানি করি। এ ঘাটতি কমানোর জন্য বিনিয়োগ আকর্ষণ বড় ভূমিকা রাখবে।
তার পরও এ সফরে কিছু বিষয়ে ঘাটতি রয়ে গেছে। চীনা ঋণের বিষয়ে আরেকটু দরকষাকষি করে সুদহার নির্ধারণের সুযোগ ছিল। কয়েকটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার পরিসর আরো গভীর ও সুদৃঢ় করার সুযোগ ছিল। এর মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চীনা ঋণের সুদহার কমানো যায় কিনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বহুমুখী করার উপায়গুলো নিয়েও কাজ করা যেত। এখানে ইভি কোম্পানিগুলোকে স্থানান্তরের চেষ্টা করা যেত। সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা আদায়ের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প আদায়ের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও উপকারী হতো। এমনকি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ও দুই দেশের সহযোগিতা গভীর করার সুযোগ ছিল। এখনো সে সুযোগ আছে। এজন্য কূটনৈতিক মহলকে সক্রিয় হতে হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার শিগগিরই উন্মুক্ত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে কী কী চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছেন?
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেটের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য থমকে আছে। কিন্তু আমাদের হতাশ হলে চলবে না। নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এগোতে হবে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও সে কথাই বলেছেন। এজন্য শিগগিরই শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবে এমনটা ভাবা যাবে না। আগে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে আরো স্বচ্ছ ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। যারা সেখানে শ্রম বিনিয়োগ করতে যাবেন তারা যেন কোনোভাবেই প্রতারণার শিকার না হন সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে সরকার কী কী করতে পারে?
এজন্য আমাদের খাতওয়ারি পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের তুলনামূলক সুবিধার জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাব এমন পণ্যগুলো বাছাই করতে হবে। আবার পণ্য বাছাই করলেই হবে না। এ পণ্যের মূল্য সংযোজন ক্ষমতা থাকা জরুরি। রফতানি করার মতো উপযোগিতা ওই পণ্যের আছে কিনা নিশ্চিত হতে হবে। শুধু কাট পেস্ট করে পণ্য তৈরি করলেই মূল্য সংযোজন হয় না।
মালয়েশিয়া এখন অনেক উন্নত। সেখানে হালাল অর্থনীতিও একটা বড় বাজার। এরই মধ্যে বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত খাবার, পানীয় এমনকি প্রক্রিয়াজাত মাংস বিপণনের প্রচেষ্টা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সম্ভবত আমরা কিছু পণ্য রফতানিও করছি। এজন্য মালয়েশিয়ার বাজারটাও আমাদের জন্য বড় সুযোগ।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে আপনি বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছেন। এছাড়া আর কী কী উপায়ে আমরা এ ঘাটতি কমাতে পারি?
আমরা তৈরি পোশাক খাতের যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করি। আবার শিল্প খাতের কাঁচামাল কেনার জন্যও চীনের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। বাংলাদেশ থেকে রফতানির ক্ষেত্রে শুধু কর রেয়াত দেয়া হলো কিন্তু রফতানি বহুমুখীকরণ করা হলো না। সেক্ষেত্রে রফতানির বাজার বড় করা কঠিন হবে। তাই বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ আর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের মতবিনিময় বাড়াতে হবে। পণ্য রফতানি বহুমুখী করার জন্য আগে সম্ভাবনাময় পণ্যগুলো চিহ্নিত করতে হবে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কাটিং এজ টেকনোলজি ও সফটওয়্যার চীনে অনেক জনপ্রিয়। বাংলাদেশে মেধার অভাব নেই। যৌথ অংশীদারত্বের মাধ্যমে যদি বিভিন্ন শিল্প খাত তৈরি করা যায় সেটাও আমাদের বৈদেশিক আয় বাড়াতে সাহায্য করবে। শুধু উৎপাদন করলেই হবে না। গবেষণা ও উন্নয়নও হতে হবে। কিছু প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট থাকবে। সেখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা উদ্ভাবনের উৎসাহ পাবেন। এভাবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে এসে প্রতিষ্ঠান গড়লে আমাদের কর্মসংস্থান বাড়বে। সেটাও একটা বড় আয়ের উৎস হবে। এদিকে চীন সফরে স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার জন্য সমঝোতা হয়েছে। চীনের কুনমিং অঞ্চলে সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে যান। আমি রাষ্ট্রদূত থাকার সময়েও দেখেছি ওদের স্বাস্থ্যসেবা কতটা টেকসই ও উন্নত। এ প্রযুক্তিগত সহায়তা আমরা কীভাবে এখানে আনতে পারি তার উদ্যোগ নিতে হবে। ইভি কোম্পানিগুলোকে বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা জরুরি। এমনকি চীনা কোম্পানিগুলোকে এখানে স্থানান্তরের জন্যও পরিকল্পনা করতে হবে। অর্থাৎ বাণিজ্য সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে।
চীনের সঙ্গে ১৩টি সমঝোতা স্মারক সই হলেও সেগুলো প্রকৃতপক্ষে চুক্তি হয়নি। ফলে বিনিয়োগ আকর্ষণে কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগ নিশ্চিতে সরকার ও কূটনৈতিক মহলের পদক্ষেপ কী কী হতে পারে?
সমঝোতা চুক্তিগুলো নিয়মিত তদারক করা দরকার। দেশে বিভিন্ন প্রকল্প তদারকির জন্য অর্থমন্ত্রী উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করেছেন। আমরা যদি চীনের ক্ষেত্রে একই ধারণার প্রয়োগ করতে পারি তাহলে সক্রিয় চীনা বিনিয়োগগুলো কী পর্যায়ে আছে তা বুঝতে পারব। এখানে একটি সক্রিয় কাঠামো থাকা দরকার। কারণ বিনিয়োগকারীরা সবসময় সুযোগ-সুবিধা খোঁজেন। প্রণোদনা কোথায় কোথায় আছে আর তাদের বিনিয়োগে বাধাগুলো কী এগুলো নিশ্চিত হতে চায়। তাই নিয়মিত সমঝোতা ও চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করলে অনেক প্রতিবন্ধকতা দূর করা যাবে।
চীন সফরে প্রতিরক্ষা কূটনীতির বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। এর মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ নামক একটি কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয় রয়েছে। এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
অনেক দেশেই ‘টু প্লাস টু’ ধারণা রয়েছে। পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য এমনটা হতেই পারে। তবে এ সমঝোতার প্রক্রিয়াগত জায়গাটি এখনো স্পষ্ট নয়। আমাদের তাই কিছুদিন অপেক্ষা করত হবে এটুকু জানার জন্য যে এটি কীভাবে কাজ করবে। আমার মতে এটা ইতিবাচক পদক্ষেপ। চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য ভালো ব্যবস্থা। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতেও এটি ইতিবাচক হতে পারে। কারণ এটি আমাদের নিরাপত্তার একটি বড় বিষয়।
আসিয়ানে মালয়েশিয়া খুব প্রভাবশালী অবস্থানে আছে। যেহেতু মালয়েশিয়া সফরে একটি ইতিবাচক সাড়া মিলেছে তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতেও কি তাদের সমর্থন আমরা পেতে পারি?
মালয়েশিয়া সবসময়ই আমাদের প্রতি সহনশীল আচরণ করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখনো ওরা আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা আসিয়ানের ফরম্যাটের বাইরে থেকেও দ্বিপক্ষীয়ভাবে এ সমস্যা সমাধানের কথা বলেছে। আসিয়ানের মধ্যে মতভেদ থাকতেই পারে। তার পরও মালয়েশিয়া রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে নিপীড়িত গোষ্ঠী বলে অভিহিত করেছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করার সময় আমাকে এমন আলোচনা করতে হতো। আসিয়ান ফরম্যাটেও মালয়েশিয়া আমাদের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত ছিল। এ নিপীড়িত গোষ্ঠীরও নিজস্ব কিছু চাহিদা আছে। বাংলাদেশ থেকে যথাসাধ্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এদিকে আমাদেরও তো সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে। এক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আশানুরূপ প্রতিক্রিয়াও আমরা সবসময় পাই না। তাই এ বিষয়ে এখনো চাপ রয়ে গেছে। আলোচনা অবশ্য চলছে।
চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি কী সুবিধাজনক হবে, নাকি ঝুঁকিপূর্ণ হবে?
এখানে দুটো আঙ্গিক রয়েছে। প্রথমত অর্থনৈতিক দিক। যে স্থানে করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছে তা তুলনামূলক অনুন্নত ও পিছিয়ে পড়া। তাই করিডোরের মাধ্যমে যদি উন্নয়ন হয় সেটি ইতিবাচক। এদিকে উন্নয়নের পাশাপাশি যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে বিসিআইএম অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমারের একটি ধারণা ছিল। অর্থাৎ করিডোরটি চীনের কুনমিং থেকে শুরু হয়ে কলকাতা পর্যন্ত যাবে। ভারতের আপত্তির কারণে এ উদ্যোগটি এগোয়নি। এদিকে চীনের এদিকে আগ্রহ আছে। এখন মিয়ানমারের প্রতিক্রিয়াই দেখার বিষয়। কারণ বিসিআইএম আলোচনার সময়ও মিয়ানমারকে খুব সক্রিয় মনে হয়নি। বাংলাদেশ এ বিষয়ে আগ্রহী ছিল। অনেক বহুজাগতিক এজেন্সিও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত ছিল। এডিবি এমনকি বিশ্বব্যাংকও চেয়েছিল এ অঞ্চলে কানেক্টিভিটি বাড়ুক।
এজন্যই মিয়ানমারের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ভূরাজনৈতিকভাবে এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপও আছে। তারা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে তা জানা জরুরি। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণে বিষয়টিকে আমরা ভালোভাবেই সামলে নিতে পারি। চীন বিনিয়োগ করলে আমাদের উন্নয়ন হবে। আবার যোগাযোগ সক্ষমতার বিষয়টি সরকারকে সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
গোটা বিশ্বই নানা অস্থিরতায় টালমাটাল। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগোতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী থাকবে?
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সরকার তার দর্শন ও লক্ষ্য অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। কূটনৈতিক মহল তার প্রয়োগ করে। সরকারই সিদ্ধান্ত নেয় কোন দেশে যাব এবং কাদের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করা হবে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ বলেই পরিচিত। কিন্তু আমাদের রফতানি-আমদানির মধ্যে বিরাট পার্থক্য। বিনিয়োগ ও সংরক্ষণেও ঘাটতি কম নয়। এগুলো কমাতেই উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাড়াতে হবে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আমাদের অন্তর্ভুক্তিমূলক বাণিজ্যিক কূটনীতির দিকে এগোতে হবে। কোনো পক্ষকেই এখানে বাদ দেয়ার সুযোগ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র আমাদের তৈরি পোশাক খাতের বড় বাজার। তারপর ইউরোপেও আমরা জিএসপি সুবিধা পাই। এগুলো সংকুচিত হলে এ খাতে অনেকগুলো সমস্যা দেখা দেবে। এসব সরকারের ভাবনায় থাকেই। কিন্তু ভূরাজনৈতিকভাবে কিছু লাল সীমাও তো আছে। স্বার্থগত দ্বন্দ্ব দেখা দিলে আমাদের ভেবে দেখতে হবে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক টানাপড়েন বাড়ে এমন চুক্তিগুলোকে এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়।









