বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও আগের তুলনায় বেড়েছে। এর সঙ্গে বাড়ছে দগ্ধ রোগীর সংখ্যাও। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, জনবহুল এ দেশে দগ্ধ রোগীর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। সুচিকিৎসার সব সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান থাকায় দগ্ধ রোগীর চাপ বাড়ছে এখানে। দেশের ১৩টি হাসপাতালে বার্ন ইউনিট থাকলেও সেগুলোয় জনবল ও চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল। এ কারণে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই গুরুতর দগ্ধ রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েই ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হচ্ছে। রোগীর চাপ এরই মধ্যে হাসপাতালটির সক্ষমতাকে অতিক্রম করেছে। সময়মতো চিকিৎসার অভাবে স্থানান্তরকালীন রোগীর মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের ঝুঁকিও বাড়ছে।
একটি হাসপাতালের ওপর সারা দেশের রোগীদের চাপ থাকায় সেখানেও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার হুমকি তৈরি হয়েছে। একটি হাসপাতালের ওপর চাপ কমিয়ে আনতে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় দগ্ধ রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সরকারকে সঠিক নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
দেশে দগ্ধ রোগীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট। রাজধানীর চানখাঁরপুলে অবস্থিত ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটি চালু হয় ২০১৬ সালের এপ্রিলে। হাসপাতালটিতে ২২ শয্যাবিশিষ্ট নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ), রোগীর উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য ২২ শয্যাবিশিষ্ট হাই ডেফিশিয়েন্সি ইউনিট (এইচডিইউ), ১২টি অপারেশন থিয়েটার এবং একটি অত্যাধুনিক পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ড রয়েছে। শুধু দগ্ধ রোগী নয়, হাসপাতালটিতে জন্মগত ঠোঁটকাটা, তালুকাটাসহ বিভিন্ন রোগীদের প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাক্টিভ সার্জারিরও বন্দোবস্ত আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বণিক বার্তাকে বলেছেন, ‘বর্তমানে মোট ১৩টি হাসপাতালে বার্ন ইউনিট আছে। এখন আরো ১০০ বেডের পাঁচটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।’
কিন্তু দেশের বর্তমান বাস্তবতায় যেসব বার্ন ইউনিট রয়েছে সেখানে চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল। দেশে বিগত বছরগুলোয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে দগ্ধ রোগীর সংখ্যাও। কিন্তু সে অনুপাতে রোগীর সহজলভ্য সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এমনিতেই বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যয়বহুল ও হয়রানিমূলক। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রয়েছে নানা অব্যবস্থাপনা। গ্রামের সব মানুষের সামর্থ্য সমান নয়। যেকোনো মানুষকে ঢাকায় এসে উন্নত চিকিৎসা নিতে হলে আর্থিকসহ নানা প্রস্তুতির বিষয় জড়িত। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো কোনো দগ্ধ রোগীর পক্ষে তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি নিয়ে ঢাকায় এসে উন্নত চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয় না। যেহেতু চিকিৎসাসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার, সেহেতু সব মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব।
ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালগুলোয় যেসব বার্ন ইউনিট রয়েছে সেগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। কোনো কোনো হাসপাতালে নেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র, নেই যন্ত্রপাতি, আবার কোথাও নেই চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবল, কোনোটিতে নেই বার্ন ইউনিটই। এসব কারণে দেশের যেকোনো জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে দূর-দূরান্ত থেকে রোগীদের আসতে হয় ঢাকায়। ফলে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক ইনস্টিটিউটে বাড়ছে রোগীদের চাপ। ইনস্টিটিউটের এ চাপ সামলানোর সক্ষমতা না থাকায় ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ আশপাশের মেডিকেল কলেজে রোগীদের পাঠানো হচ্ছে। ঢাকার বাইরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হচ্ছে দেশের অন্যতম সরকারি হাসপাতাল। হাসপাতালে বার্ন ইউনিট চালু হয়েছিল ২০১৫ সালে। চালুর পর থেকে বার্ন ইউনিটের যে জনবল কাঠামো ছিল তা কখনই পরিপূর্ণ হয়নি। এটি দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় ৩০ শয্যার বার্ন ইউনিটে প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকে। তাদের চিকিৎসায় রয়েছেন মাত্র একজন চিকিৎসক। আবার ওয়ার্ডে শয্যা সংকট থাকায় দগ্ধ রোগীদের মেঝেতে কিংবা অন্য ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এ থেকে সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে, ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিটের চিত্র। চাহিদা অনুপাতে হাসপাতালে যে মানের বার্ন ইউনিট থাকা প্রয়োজন, তা অনুপস্থিত।
কোনো দগ্ধ রোগীর ২৪ ঘণ্টা হচ্ছে ‘গোল্ডেন আওয়ার’। এ সময়ে তাকে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে হয়। কিন্তু সূদুর রংপুর বিভাগের কোনো জেলার কোনো কোনো দগ্ধ রোগীকে এ সময়ের মধ্যে ঢাকায় এনে চিকিৎসা করানোর বাস্তবতা নাও থাকতে পারে। এছাড়া যেসব হাসপাতালে রোগীর বাড়তি চাপ রয়েছে সেখানে সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকে। সংক্রমণের কারণে মৃত্যুর পাশাপাশি রোগীদের সেরে উঠতেও অনেক সময় লেগে যায়। আরেকটি বিষয় বরাবরই লক্ষণীয়, দেশে যখন বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে তখনই বার্ন ইউনিটের সংকট কাটানোর চেষ্টা দেখা যায় নীতিনির্ধারকসহ সব পর্যায় থেকেই। কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে সবকিছু বেমালুম ভুলে যায় সবাই। অথচ সব হাসপাতালে যদি দগ্ধ রোগীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা থাকত তাহলে তাদের চিকিৎসা দেয়া অনেক সহজ হতো। এতে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ওপর রোগীদের চাপ অনেকাংশেই কমে যেত। তখন মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকিও কমে আসত। মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দিতে বার্ন চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় বার্ন চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে সরকার পদক্ষেপ নিক। দেশের চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জনের সংখ্যা বাড়ানো দরকার।










