৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল সামরিক আইন জারি করেন। ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ শক্তিগুলোকে নির্মূল করতে এ ঘোষণা প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করেন তিনি। সামরিক আইন জারির পর পরই এর প্রতিবাদে সেই দেশের জনগণ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। ভোর হওয়ার আগেই জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ইওলের জারি করা সামরিক আইন বাতিলের প্রস্তাব পাস হয়। যদিও ইওলকে এরই মধ্যে অভিশংসন করা হয়েছে। সাংবিধানিক আদালতে তার বিচার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ইওল কেন সামরিক আইন জারি করলেন, সে বিষয়টি এখনো অনেকেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।
গত সপ্তাহে সিউলে দীর্ঘ পরিকল্পিত সফরের সময় অর্থনীতিবিদ ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তখন কেউ কেউ মনে করেন, গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ নির্বাচনে ইওলের দল পিপল পাওয়ার পার্টি (পিপিপি) বিপুল ব্যবধানে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। এর পর থেকেই তিনি সংসদে কোনো আইন পাস করতে পারছিলেন না। ফলে রাজনৈতিক এ জটিলতায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। একজন সাবেক প্রসিকিউটর হিসেবে ইওল রাজনৈতিকভাবে কৌশলী নন এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে আপস করা তার পক্ষে কঠিন ছিল।
ইওলের সামরিক আইন জারির ঘোষণাটি একটি রাজনৈতিক অপমৃত্যুতে পরিণত হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বিরোধীদের প্রথম অভিশংসনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ পিপিপির সংসদ সদস্যদের অন্তত আটজনকে ইউলের অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেয়ার প্রয়োজন থাকলেও তারা ভোট না দিয়ে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু জনগণের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। জনমত জরিপগুলোয় জনগণ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করতে থাকে। তাই গত ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় অভিশংসন ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন পিপিপির সংসদ সদস্যরা অভিশংসন ভোটে অংশ নেন। অবশেষে প্রস্তাবটি ২০৪-৮৫ ভোটে পাস হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার ভেতরে-বাইরের অনেক মানুষ, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি, তারা মনে করেন প্রেসিডেন্ট ইওলের অভিশংসন দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রের কার্যকারিতাকে প্রমাণ করে। এখন সিউলের রাস্তা স্বাভাবিক, দিনে সবকিছু স্বাভাবিক গতিতেই চলছে।
এমনকি ইওলের সামরিক আইন জারির পর ১০ দিনের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থিতিশীল ছিল। স্বল্প সময়ের জন্য সামরিক আইন জারির পর দ্য কোরিয়া কম্পোজিট স্টক প্রাইস ইনডেক্স বা স্টক-মূল্য সূচক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৪৬৪-এ দাঁড়িয়েছে এবং গত ৯ ডিসেম্বর তা ২ হাজার ৩৬১-তে দাঁড়ায়। কিন্তু তারপর থেকে সূচকটি তার বেশির ভাগ ক্ষতি পুনরুদ্ধার করেছে এবং ১৩ ডিসেম্বর তা বেড়ে ২ হাজার ৪৯৫-এ দাঁড়ায়। একইভাবে ১০ বছরের বন্ডের রেট অব রিটার্ন সামান্য কমে গেলেও সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
৪ ডিসেম্বর প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ১ হাজার ৪১৩ ওন। মুদ্রাটির অবমূল্যায়নে ১৩ ডিসেম্বরে ডলারের বিনিময় হার দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩৫ ওনে। যদিও ইওলের সামরিক আইন জারির আগে থেকেই ওনের পতন শুরু হয়েছিল। গত ২৭ নভেম্বর ডলারের বিনিময় হার ছিল ১ হাজার ৩৯১ ওন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নয়, বরং দুর্বল আর্থিক নীতিই এ অবমূল্যায়নের কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে অর্থনীতিতে যে স্থিতিশীলতা রয়েছে সেটি শুধু সম্ভব হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংক অব কোরিয়ার গভর্নর রি চ্যাং-ইয়ং এবং অর্থমন্ত্রী চোই সাং-মোকের নেতৃত্বে দক্ষ অর্থনৈতিক টিমের কারণে। এজন্য দক্ষিণ কোরিয়া এ টিমের কাছে ঋণী। তারা অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সঠিক সময়ে সঠিক বার্তা দেয়ার পাশাপাশি বাজারে তারল্য প্রবাহসহ বেশকিছু কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন করেছেন।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দক্ষিণ কোরিয়া ঝুঁকিমুক্ত। প্রেসিডেন্ট ইওলকে চূড়ান্তভাবে অপসারণ করা হবে নাকি তাকে পুনর্বহাল করা হবে—এ বিষয়ে দেশটির সাংবিধানিক আদালত ছয় মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেবেন। দেশটিতে অতীতে উভয় ফলাফলের প্রতিফলনের উদাহরণ রয়েছে। আদালত ২০০৪ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট রোহ মু-হিউনের অভিশংসন বাতিল করেছিলেন, কিন্তু ২০১৬ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাইয়ের ক্ষেত্রে তা বহাল থাকে।
আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট পার্কের ক্ষেত্রে তিন মাসে রায় দিয়েছিলেন। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ইওলের ভবিষ্যৎ মার্চ কিংবা জুনে নির্ধারিত হতে পারে। যদি আদালতে অভিশংসন বহাল থাকে তাহলে ৬০ দিনের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। অর্থাৎ সেটি হতে হবে মে ও আগস্টের মধ্যে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হান ডাক-সু প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে প্রধানমন্ত্রীর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মতো দেশে-বিদেশে সমান কর্তৃত্ব থাকবে না। ফলে অভিশংসন প্রক্রিয়াটি একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করবে, যা জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রত্যাশিত মার্কিন নীতির পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া জানাতে দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতাকে সীমিত করবে।
উদাহরণস্বরূপ দক্ষিণ কোরিয়া নতুন শুল্ক নীতির মুখোমুখি হতে পারে অথবা দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ নেয়ার দাবি উঠতে পারে। প্রেসিডেন্ট পুতিন রাশিয়ার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের ইউক্রেন যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করেছেন, যা ট্রাম্পের জন্য উদ্বেগের কারণ।
সুতরাং ইওলের সামরিক আইন জারির ঘোষণা স্বল্পস্থায়ী হলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। অভিশংসনের নাটক শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়া একটি ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব কোরিয়ান উপদ্বীপে একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে পারে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৪]
তাকাতোশি ইতো: জাপানের সাবেক উপ-অর্থমন্ত্রী; অধ্যাপক, স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং টোকিওর ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের সিনিয়র অধ্যাপক
ভাষান্তর: দিদারুল হক ও মিনহাজুল আবেদীন










