বিশ্ব রাজনীতির মেরুকরণ একটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত—এ তিন পরাশক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু অর্থনৈতিক বা সামরিক নয়, বরং কৌশলগত ও আদর্শিক বিভাজনের দিক থেকেও সুস্পষ্ট। এ ভূরাজনৈতিক আবহে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন মোড় নিচ্ছে, যেখানে উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তির প্রধানতম একটি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জাতীয় নেতৃত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, তা শুধু বাংলাদেশ নয় বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কেননা মধ্য আয়ের, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, ঘনবসতিপূর্ণ ও সমুদ্রপথের সন্নিকটে অবস্থিত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এখন আর পরাশক্তিদের জন্য সীমান্তবর্তী একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ নয়, বরং এক সম্ভাবনাময় গেইটওয়ে।
মনে রাখা ভালো যে এনসিপি বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চে নতুন হলেও কূটনৈতিক কৌশলের দাবির বাইরে নয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের ত্রিমাত্রিক শক্তি সমীকরণের ভেতর দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা— এ এক ধরনের অত্যন্ত জটিল কাজ, যা রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা, পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারণ করে দেয় যে কঠিন কাজটি করেই নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে টিকে থাকতে হবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশী শক্তির ভূমিকা: একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তবে এটি কেবল বন্ধুত্বের নয়, বরং রাজনৈতিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে বহুবার। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে যা সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, আঞ্চলিক অব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ নির্বাচনে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় অবকাঠামো উন্নয়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ এবং সামরিক সরঞ্জাম রফতানির মাধ্যমে চীন বাংলাদেশে এক ধরনের ‘কৌশলগত বন্ধন’ গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, উন্নয়ন সহায়তা ও নিরাপত্তাভিত্তিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে তার প্রভাব বজায় রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নির্বাচনী স্বচ্ছতা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্য একই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা—দুই-ই।
নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রেক্ষাপট: আদর্শিক নয়, বাস্তববাদী কূটনীতি
নতুন রাজনৈতিক শক্তি যখন গণতান্ত্রিক পথেই ক্ষমতায় যেতে চায়, তখন তাদের পররাষ্ট্রনীতি হতে হবে বাস্তববাদী, কৌশলনির্ভর এবং জনগণের চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল। এ দল যদি অতীতের মতো একচেটিয়া পক্ষপাত বা শত্রুবান্ধব মডেল থেকে বেরিয়ে এসে ‘কৌশলগত সমদূরত্ব’ বজায় রাখতে পারে, তবে সেটিই হবে একটি প্রগতিশীল ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি।
তাদের নীতিকে ‘নৈতিক বাস্তববাদ’ বলা যেতে পারে—যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, মানবাধিকার, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রকে একত্রে বিবেচনায় রাখা হয়। তাদের নীতি হতে হবে বহুমাত্রিক যেখানে প্রতিটি বৈদেশিক সম্পর্ক নির্ধারিত হবে ‘পারস্পরিক সম্মান’, ‘অর্থনৈতিক লাভ’ ও ‘ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য’ দিয়ে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: উন্নয়ন বনাম নির্ভরতা
বিশ্ব অর্থনীতির পাগলা ঘোড়া চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা জরুরি। তবে কৌশলগতভাবে সাবধান থাকা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চীনের অর্থনৈতিক সহায়তা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঋণের ফাঁদ এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা অস্বীকার করা যায় না। সুতরাং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উচিত হবে—চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব বজায় রাখা, কিন্তু ‘জাতীয় স্বার্থ’ ও ‘স্বাধীন নীতি’ বজায় রাখা, যাতে চীনের প্রভাব অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়, কিন্তু রাজনৈতিক নির্ভরতা সৃষ্টি না করে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক: বন্ধুত্বের বাইরে গিয়ে সমানাধিকারের পথে
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে গভীর, কিন্তু প্রায়ই অসম। পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট ইস্যু ও বাণিজ্যিক ঘাটতির প্রশ্নে জনগণের মাঝে তীব্র ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। তাছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে সরকারকে উৎখাত করা হলো তাদের প্রতি ভারতের নগ্ন সমর্থন ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে খোলামেলা হস্তক্ষেপ ভারতকে চিরবৈরী করে তুলেছে। তথাপি নতুন দলের উচিত হবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল সরকারের পর্যায়ে না রেখে জনগণের পর্যায়ে নামিয়ে আনা। ‘পিপল টু পিপল কূটনীতি’, ‘সাংস্কৃতিক বিনিময়’ ও ‘সীমান্ত অঞ্চল উন্নয়ন’ এ সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক: সহযোগিতা, কিন্তু স্বাধীনতা বজায় রেখে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই বহুমাত্রিক। মানবাধিকার, সুশাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, বাণিজ্য, শিক্ষা ও অভিবাসন এ সব খাতেই সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে নতুন দলের উচিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাগত জানানো, কিন্তু সেটিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর চাপ প্রয়োগের সুযোগ না দেয়া। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের উল্লেখযোগ্য বৈরিতা না থাকলেও বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি ও মুসলিম দেশগুলোয় গত কয়েক দশকের যুদ্ধবিস্তারকে বাংলাদেশের মানুষ ক্রিটিক্যালি দেখে থাকে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের এ মনোভাবও মাথায় রাখতে হবে। ‘নীতিনির্ধারক নয়, গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার’—এই মডেলেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।
আঞ্চলিক কাঠামোর পুনরুজ্জীবন: সার্ক, বিমসটেক ও আসিয়ানের সঠিক ব্যবহার
দলের পররাষ্ট্রনীতি একক দেশনির্ভর না হয়ে বহুপক্ষীয় সংস্থার মাধ্যমে আঞ্চলিক জোট শক্তিশালী করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। সার্ক যদি অকার্যকর হয়, তাহলে বিমসটেক ও আইওআরএর মতো কাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের নেতৃত্ব বিকশিত হতে পারে। আসিয়ানের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য, পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রযুক্তি বিনিময় খাতে কার্যকর কূটনীতি বাংলাদেশের ভিন্ন কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়।
জনগণকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি: কূটনীতি শুধু কূটনীতিকদের জন্য নয়
নতুন রাজনৈতিক শক্তিকে মনে রাখতে হবে, পররাষ্ট্রনীতি শুধু কূটনৈতিক মহলের আলোচনার বিষয় নয়, এটি জনগণের স্বার্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি বড় উদগাতা ছিল ভারতের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের অনেক গোপন চুক্তি যেগুলোকে জনগণ সন্দেহের চোখে দেখেছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর তাই স্বাভাবিকভাবেই কূটনীতির ক্ষেত্রেও যথাসম্ভব স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নাগরিকরা প্রত্যাশা করে। এ প্রেক্ষাপটে একটি ‘জনবান্ধব পররাষ্ট্রনীতি’ তৈরির জন্য চাই—উদ্যোক্তা, প্রবাসী বাংলাদেশী, কৃষি রফতানিকারক, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করে পররাষ্ট্রনীতি সম্প্রসারণ করা।
নতুন প্রতিকূলতা: হাইব্রিড যুদ্ধ, তথ্যযুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কেবল রাষ্ট্রদূতদের মাধ্যমে গড়ে ওঠে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সোশ্যাল মিডিয়া, অপতথ্য বা ভুয়া খবর ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এখন পররাষ্ট্রনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। নতুন রাজনৈতিক দলের উচিত হবে একটি ‘সাইবার কূটনীতি ইউনিট’ গঠন করা, যা কূটনৈতিক তথ্যযুদ্ধ, ডিজিটাল প্রপাগান্ডা এবং তথ্যনিরাপত্তা ইস্যুতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হবে।
একটি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও সাহসী কূটনৈতিক কাঠামোর জন্য প্রস্তুতি
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব চাইলে কেবল দেশে নয়, গোটা অঞ্চলে এক নতুন পররাষ্ট্রনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। এ দৃষ্টান্ত কেবল তোষামোদি থেকে সরে এসে ভারসাম্য, মর্যাদা ও স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে সম্ভব। নতুন দলের উচিত হবে তিন পরাশক্তির প্রতি সমদূরত্ব বজায় রেখে, কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে, জনগণের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। এতে বাংলাদেশ একটি মর্যাদাসম্পন্ন, শক্তিশালী ও ভবিষ্যৎনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
আলাউদ্দীন মোহাম্মদ: যুগ্ম সদস্য সচিব, জাতীয় নাগরিক পার্টি










