আমার দৃষ্টিতে ট্যারিফ ইস্যুটিকে শুধু একটি ক্ষুদ্র প্রেক্ষাপটে দেখলে হবে না। এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চলমান একটি বড় পরিবর্তনের অংশ। এ পরিবর্তনের মূল বিষয় হলো বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার স্থানান্তর। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এ পরিবর্তন শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উত্থানের মধ্য দিয়ে।

আমি যখন ১৯৫০-এর দশকে কেমব্রিজে পড়াশোনা করছিলাম, তখন একটি আলোচিত বিষয় ছিল ডলার সমস্যা। এ নিয়ে আরএফ হ্যারড একটি বইও লিখেছিলেন। বিষয়টি ছিল এমন যে যুক্তরাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে প্রতিযোগিতাশীল অর্থনীতি। ফলে তারা বিপুল পরিমাণ ডলার সঞ্চয় করছিল, যা অন্য দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছিল। তখন এ সমস্যা মোকাবেলার পথ খোঁজা হচ্ছিল। আমি সেই নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে আর ঢুকতে চাই না, তবে এটুকু বলব—বিশ্ব ব্যবস্থার রূপান্তর আসলে তখনই শুরু হয়েছিল।

  • একসময় পাকিস্তানে চলাচলকারী গাড়িগুলোর বেশির ভাগই ছিল আমেরিকান—Chevrolet, DeSoto, Dodge, Plymouth—এ নামগুলো এখনকার প্রজন্মের অনেকেই শোনেননি। কিন্তু আমার বেড়ে ওঠার সময় এগুলো খুবই পরিচিত নাম ছিল।
  • তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতার চেহারা পাল্টে গেছে। ষাটের দশকেই মার্কিন গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি জেনারেল মোটরসকে হার মানাতে শুরু করে জাপানের টয়োটা। এ নিয়েও একটি আলোচিত বই লেখা হয়েছিল, যেখানে তুলে ধরা হয় কীভাবে জাপান টয়োটানির্ভর অটোমোবাইল শিল্পের মাধ্যমে নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। এরপর আসে দক্ষিণ কোরিয়ার উত্থান, আর বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব নেয় জার্মানি।
  • আজকের দিনে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা এশিয়ার রাস্তায় আমেরিকান গাড়ি খুব একটা দেখা যায় না। কিছু স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল (এসইউভি) থাকতেও পারে, তবে সেটি কতটা যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছে, তাও বলা কঠিন—কারণ অনেক সময় এ গাড়িগুলোর উৎপাদন হয় চীনেই। আসলে যদি কেউ জানেন না, তবে বলে রাখা ভালো—বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) পথিকৃৎ ইলোন মাস্কের প্রতিষ্ঠান টেসলা এখন যেসব গাড়ি রফতানি করছে, তার বড় একটি অংশই চীনে তৈরি।
  • এ বাণিজ্যযুদ্ধ ইলোন মাস্কের চীনে পরিচালিত ব্যবসায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়, সময়ই তা বলে দেবে। তবে এ বিষয়টিকে সামনে রেখেই বিশ্লেষণ করতে হবে। যা বলার চেষ্টা করছি, তা হলো বিশ্ব প্রতিযোগিতার কাঠামোয় একসময় ধীরগতির পরিবর্তন শুরু হলেও এখন সেটি রূপ নিয়েছে এক বৈপ্লবিক রূপান্তরে। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এশিয়ার উত্থান ঘটেছে বিশ্বের ‘‌কারখানা’ হিসেবে। এশিয়ার এ উত্থানই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদনভিত্তিক শিল্প খাতকে ধীরে ধীরে ফাঁপা করে তুলেছে।
  • যদি আপনি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে ফিলাডেলফিয়া গাড়িতে ভ্রমণ করে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই রাস্তার দুপাশে ফেলে রাখা পুরনো, বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টিল মিল ও কারখানাগুলো চোখে পড়বে। এ চিত্র শুধু ওই একটি পথে সীমাবদ্ধ নয়—সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই এমন শিল্প ধসের চিত্র দেখা যায়, যা ঘটেছে উৎপাদন খাতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার রূপান্তরের কারণে। এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিশ্ব পুঁজিবাদের চরিত্রেও এক বড় রকমের রূপান্তর এসেছে।
  • আপনারা অনেকেই হয়তো পরিচিত নন, তবে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে সামীর আমিন নামে এক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ লিখেছিলেন Accumulation on a World Scale নামে একটি তাত্ত্বিক কাঠামো, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে বিশ্ব পুঁজিবাদ জাতীয় ভিত্তি থেকে সরে গিয়ে বৈশ্বিক ভিত্তিতে স্থানান্তরিত হয়েছে। উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, যেখানে বৈশ্বিক সংযোগ ও বিশ্বায়নের সুযোগকে কাজে লাগানো হয়। ফলে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানি—যদিও নামেই মার্কিন কোম্পানি—আসলে বৈশ্বিক করপোরেশনে পরিণত হয়, যারা তাদের মুনাফা অর্জন করে বৈশ্বিক বাজার থেকে। এ উৎপাদন ও সম্পদ সঞ্চয়ের বৈশ্বিক কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত প্রতিযোগিতার নতুন মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে।
  • এ রূপান্তরের প্রভাব ছিল গভীর। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ যখন বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ নিয়ে লেখেন, তিনি দেখান এটি কীভাবে বহুজাতিক কোম্পানির জন্য উপকারী হলেও উন্নয়নশীল দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে আমার সহপাঠী জগদীশ ভগবতী, এক বিরল মুহূর্তে যার মতের সঙ্গে আমি একমত হয়েছিলাম, তিনি স্টিগলিৎজের এ বিশ্লেষণকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, বিশ্বায়ন আসলে উন্নয়নশীল দেশের জন্য উপকারী এবং বাংলাদেশ এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
  • তবে এ পরিবর্তনের মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপও তৈরি হয়—বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় সমালোচক হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবিত্ত শ্বেতাঙ্গ কর্মজীবী জনগোষ্ঠী। যারা একসময় নিয়মিত উৎপাদনশীল চাকরিতে পেনশন সুবিধাসহ কর্মরত ছিলেন, তারা ধীরে ধীরে চাকরি হারিয়ে খাবারের দোকানে বা ফাস্টফুড চেইনে কাজ খুঁজতে বাধ্য হন। কারণ প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা এবং শিক্ষার মান উন্নত করতে না পারা তাদের বিশ্ব প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতায় পিছিয়ে দেয়। এ শ্রেণীই পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে প্রধান সমর্থক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। তাদের চোখে বিশ্বায়ন মানেই নিজ দেশের ক্ষতি। এখানে আসলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই একটি কাঠামোগত সমস্যা তৈরি হয়েছে—যেখানে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির রূপান্তরের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এ বৈসাদৃশ্য থেকেই জন্ম নিয়েছে বর্তমান সংকট।
  • পরবর্তী যে বড় পরিবর্তনটি আমরা প্রত্যক্ষ করলাম তা হলো নিয়মভিত্তিক বিশ্বায়ন থেকে সরে এসে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বিভিন্ন উপকরণের ব্যবহার শুরু হওয়া। বাজারভিত্তিক নিয়মের ওপর দাঁড়ানো যে বিশ্বায়ন একসময় গৃহীত ছিল, এখন তার বিভিন্ন উপাদানই পরিণত হচ্ছে অর্থনৈতিক অস্ত্রে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার কিংবা SWIFT পেমেন্ট সিস্টেমের নিয়ন্ত্রণ, আগে এগুলো ছিল বিশ্বায়নের অন্তর্ভুক্ত নিয়মিত কাঠামো; এখন সেগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে কৌশলগত চাপের মাধ্যম হিসেবে।
  • এ রূপান্তর এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। যেমন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, ইউরোপও SWIFT সিস্টেম ও অন্যান্য আর্থিক প্রক্রিয়াকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিশ্ববাণিজ্যে হস্তক্ষেপমূলক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে এ অস্ত্রায়নের প্রক্রিয়াই এখন বৈশ্বিক রাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
  • বর্তমানে ইউরোপ সরাসরি যুদ্ধ না করলেও ইউক্রেনকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধে লিপ্ত এবং সেক্ষেত্রে তারা ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে—যার মাধ্যমে তাদের নিজস্ব বাজারে প্রবেশাধিকার থেকে ইরানকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এ নতুন বাস্তবতা হলো বিশ্বায়ন এখন আর কেবল মুক্তবাজার বা বাণিজ্যিক সুবিধার কাঠামো নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র, যেখানে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলোকে প্রয়োজনে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
  • কিন্তু বাস্তবে কী ঘটছে? বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার অস্ত্রায়ন এখন এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে এমন সব দেশও এর শিকার হচ্ছে যাদের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে কোনো সরাসরি সম্পর্কই নেই। এ প্রক্রিয়ায় যেসব দেশ নিরপেক্ষ থেকেছে বা নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছে, তারাও আজ গুটিয়ে পড়ছে তথাকথিত কোল্যাটারাল স্যাংশনের আওতায়। বিশ্বায়নের যে ধারণা একসময় বাজার-নিয়ন্ত্রিত ছিল, তা আজ রূপ নিচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায়।
  • এ প্রেক্ষাপটে ট্যারিফ বা শুল্ক এখন আর কেবল অর্থনৈতিক নীতির অংশ নয়, তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক হাতিয়ার। একদিকে এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবেলার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে নানা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।
  • উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর যে শুল্ক আরোপ করেছিল, তার পেছনে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল ফেন্টানিল নামক মাদকদ্রব্যের আমদানি। অথচ এটি একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা—যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে মাদকের চাহিদা ও সেবন বাড়ছে এবং সেই দায় চাপানো হচ্ছে সীমান্তবর্তী দেশগুলোর ওপর। আর তাদের ওপর আরোপিত হচ্ছে শুল্ক, যা মূলত অর্থনৈতিক যুক্তির বাইরের বিষয়। এ প্রবণতা দেখায়, মার্কিন বাজার, যা একসময় বৈশ্বিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল, এখন হয়ে উঠেছে একটি কৌশলগত সম্পদ। এ বাজারে প্রবেশের শর্ত নির্ধারণে ব্যবহৃত শুল্ক এখন একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্যারিফকে শুধু বাণিজ্যনীতির আলোকে দেখা যাবে না—এটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি বড় উপাদান।
  • আরো গভীরভাবে দেখলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি—যা একসময় বাজারনীতির অধীন ছিল—বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে ধীরে ধীরে ‘কমান্ড ইকোনমি’ বা নির্দেশনাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। এ পরিবর্তিত বাস্তবতাই আজকের বৈশ্বিক বাণিজ্য রাজনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। আজকের এ নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ক্রমেই রাজনৈতিক আদেশে নির্ধারিত হচ্ছে। এমন বাস্তবতা খুব কম দেশেই দেখা যায়, যেখানে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পুনর্বিন্যাস করা হয়।
  • আমি ব্যক্তিগতভাবে বাজার অর্থনীতির প্রতি অতটা উৎসাহী নই, কিন্তু এখানে উপস্থিত আমার অনেক বন্ধু ও সহকর্মী, যারা একসময় বাজার অর্থনীতির সমালোচক ছিলেন, তারাই আজ এর প্রবল সমর্থক হয়ে উঠেছেন। দুর্ভাগ্যবশত যেসব দেশ থেকে আপনারা এ বাজারনীতির পাঠ নিয়েছেন, সেই যুক্তরাষ্ট্রই আজ বাজারভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সরে গিয়ে এক নতুন ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ বাস্তবতায় শুল্ক ব্যবস্থাকে কেবল একটি অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা যাচ্ছে না—এটি এখন বৈশ্বিক রাজনীতির অংশ। তবে শুরুতে কেউই কল্পনা করেনি যে এ শুল্ক ব্যবস্থা বৈশ্বিক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়বে।
  • প্রশ্ন হলো ট্রাম্প প্রশাসনের এ ট্যারিফ আরোপের মূল উদ্দেশ্য কী? বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের উচিত হবে, এ ধরনের সিদ্ধান্তে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে, যুক্তরাষ্ট্রের অভিপ্রায় ও কৌশল ভালোভাবে বোঝা। যদি ট্রাম্পের ঘোষণাগুলোর দিকে নজর দেন, তবে দেখবেন—তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে ১৯ শতকের আমদানি-বিকল্প শিল্পায়নের (Import Substitution Industrialization) মডেলে ফিরিয়ে নেয়া।
  • আপনারা অনেকেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অর্থমন্ত্রী আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের একটি জাতীয় প্রতিবেদনের সঙ্গে পরিচিত নন। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে ব্রিটেনের তুলনায় পিছিয়ে থাকা আমেরিকান শিল্প খাত সুরক্ষায় রক্ষনশীল নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। একই পথ অনুসরণ করেছেন জার্মান শাসক বিসমার্কের নীতি পরামর্শক ফ্রেডরিক লিস্ট। ইউরোপের অন্যান্য অগ্রসর অর্থনীতির বিপরীতে নবীন জার্মান শিল্প সুরক্ষায় রক্ষনশীল নীতি গ্রহণ করেছিলেন।
  • আজকের মার্কিন নীতিতেও সেই ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। তবে তখন এটি ছিল একটি নবীন রাষ্ট্রের শিল্পায়নের কৌশল, আর আজ এটি পরিণত হয়েছে একটি পরিপক্ক অর্থনীতির আত্মরক্ষামূলক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই একসময় শিল্পায়নের সূচনালগ্নে সংরক্ষণবাদ নীতির পথে হেঁটেছিল। উনিশ শতকের শেষদিকে প্রেসিডেন্ট ম্যাককিনলি শুল্ক বৃদ্ধি করেন, সেই একই যুক্তির ভিত্তিতে—একটি উঠতি শিল্প ক্ষমতাকে রক্ষা করা প্রয়োজন।
  • এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে অনেক উন্নয়নশীল দেশও ‘আমদানি-প্রতিস্থাপন শিল্পায়ন’ (Import Substitution Industrialisation) নীতির পথে হেঁটেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিবিদ জগদীশ ভগবতী ও অন্যান্য পশ্চিমা পরামর্শদাতা আমাদের বুঝিয়েছিলেন—এটি আর কার্যকর নয়। আমাদের বলা হয়েছিল, অর্থনৈতিক মুক্তবাজার ব্যবস্থাই সর্বোত্তম পথ। যুক্তরাষ্ট্র ফেরত পণ্ডিতরা শেখাতেন—শুল্ক বাতিল করো, আমদানির সুযোগ বাড়াও, তাহলেই উন্নয়ন হবে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি হয়ে উঠল? তারা তো উদার বাণিজ্য ও মুক্ত অর্থনীতির পথেই সফল হয়েছে।

কিন্তু আজ ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে দেখা যাচ্ছে সেই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যা একসময় ছিল দেশের গর্ব, এখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা বন্ধ হওয়ার পথে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনি পুনরায় শিল্পায়নের ডাক দিচ্ছেন—নতুন কর্মসংস্থান তৈরির জন্য।

একসময় যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ শতাংশই ছিল শিল্প খাত থেকে—আজ তা নেমে এসেছে মাত্র ১০ শতাংশে। আর শিল্প খাতে কর্মসংস্থান নেমে এসেছে ৮ শতাংশে। এ পরিসংখ্যানই বোঝায়, ট্রাম্প প্রশাসন কেন শিল্প পুনর্জাগরণের জন্য রক্ষণশীল বাণিজ্যনীতির (যেমন ট্যারিফ) আশ্রয় নিচ্ছে। এ অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক শিল্পনীতির পুনর্জাগরণ বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতের অংশীদারত্ব মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ১০ শতাংশ। এ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য—শিল্প খাতে উৎপাদনের পরিমাণ ও কর্মসংস্থান উভয়ই বাড়ানো। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু বিশ্লেষণে—সম্ভবত অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যানের সূত্র ধরে—উল্লেখ করা হয়েছে, এমন উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশ পুনঃশিল্পায়ন হবে স্বয়ংক্রিয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প খাতে কর্মসংস্থান সর্বোচ্চ ২ শতাংশ বাড়লেও, মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১২ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে। অর্থাৎ এ কৌশল থেকে দীর্ঘমেয়াদি বা ব্যাপক কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা অযৌক্তিক। তবুও এটিই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য। তবে এর বাইরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য রয়েছে, যা আমাদের মতো দেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সেটি হলো রফতানি বাড়ানো।

বর্তমানে যেভাবে নির্বাচিত দেশগুলোর ওপর দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে সেটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বাড়ানোর একটি কৌশল। উদ্দেশ্য হলো এ শুল্ক চাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরো পণ্য কিনতে ‘প্ররোচিত’ করা, যেন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসে। তবে এ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বিতর্ক রয়েছে। তাই একই সঙ্গে আমদানি প্রতিস্থাপন এবং রফতানি উন্নয়ন—এ দুই নীতির সম্মিলিত প্রয়োগে নীতিগত দ্বৈততা দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: আমরা রফতানি বাড়াতে চাচ্ছি, তবে এর মাধ্যমে কি বাণিজ্য ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে? এটি সত্য যে যদি আমি রফতানি বাড়াতে সক্ষম হই, তবে একসময় বাণিজ্য ঘাটতি কমবে। কিন্তু যদি বাণিজ্য ঘাটতি কমে যায়, তবে সেই হিসাব অনুযায়ী আমার আমদানিও কমে যাবে। অর্থাৎ যদি আমি ঘাটতি পুরোপুরি শূন্যে নিয়ে আসতে পারি, তবে আমদানির ওপর শুল্ক আবার ১০ শতাংশ ফিরে যাবে।

যদি আমরা ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের রফতানি বাড়াই, তবে সেই রফতানি বৃদ্ধি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমদানি বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ উৎপাদন খাতের রফতানি অনেক ক্ষেত্রেই এমন উপকরণের ওপর নির্ভর করে যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে উপলব্ধ নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বায়ন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আমাদের আমদানির প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়। এটি আমার মূল পয়েন্টকে আরো শক্তিশালী করে যে শেষ পর্যন্ত আপনার রফতানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা আদৌ আমদানি প্রতিস্থাপন ঘটাতে সহায়ক নাও হতে পারে। তবে আবার এটি এমনও নয় যে বাণিজ্য ঘাটতি আসলে দুর্বলতার লক্ষণ। আমাদের ঐতিহ্যগত অর্থনীতির ধারণায় বাণিজ্য ঘাটতি কখনো কখনো স্বাস্থ্যকর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশও হতে পারে। কিন্তু আমি যা বলছি তা হলো এ নীতিগুলোর বাস্তব প্রয়োগের ফলাফল কী হবে।

ধরা যাক, বাংলাদেশ যদি তার বাণিজ্য ঘাটতি শূন্যে নামিয়ে আনে তাহলে প্রাক্কলন অনুযায়ী এর পরিণতি হবে যে ঘাটতি কমে ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাবে। কিন্তু আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হলো যদি অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও এ বাণিজ্য ঘাটতি ধীরে ধীরে কমে আসে, তবে শুল্কও সেই অনুপাতে কমে যাবে। এর অর্থ হলো শুল্ক সুরক্ষা দিয়ে আমদানি প্রতিস্থাপন করার প্রভাবও হ্রাস পাবে, কারণ যদি আপনার শিল্পকে ৪৭ শতাংশ শুল্ক দিয়ে রক্ষা করা হয়, তবে এটি সম্ভাব্যভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে শিল্প স্থাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

কিন্তু যদি এ শুল্ক কমে ১০ শতাংশ বা তারও কমে চলে আসে তাহলে উৎপাদনকারীরা শিল্প স্থাপন করার জন্য তেমন আগ্রহী হবেন না, কারণ সুরক্ষার স্তর কমে যাবে। এ সমস্যা শুধু এখানেই শেষ নয়—আপনি এক্ষেত্রে শুধু ১০ শতাংশে এসে থামবেন না। বাণিজ্য ঘাটতি ও শুল্কের হ্রাস একটি ধীরগতির প্রক্রিয়া হবে এবং যার ফলে অর্থনীতি যে স্তরে সুরক্ষিত ছিল, তা ক্রমেই হ্রাস পাবে। এটি বোঝায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নতুন উৎপাদনকারী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি উচ্চ মাত্রার অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। ফলে অনিশ্চয়তা আসবে, যা বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু, এটি সবারই জানা। বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেও যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে তা বাজারে এরই মধ্যে প্রভাব ফেলছে।

এটি সরাসরি শুল্কের প্রাথমিক লক্ষ্য—আমদানি প্রতিস্থাপন শিল্পায়ন—এর সফলতা অর্জনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তাই আপনার যে প্রত্যাশা ছিল যে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বৃহত্তর সংখ্যায় শিল্প স্থাপন করবেন, তা বাস্তবায়িত হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আমি জানি না কিন্তু যারা সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন এবং শপিং করেছেন, তাদের অনেকেই এ পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। আমি যখন আমার নাতির জন্য খেলনা কিনতে যাই, আমি ভালো কোনো মার্কিন ব্র্যান্ডের খেলনা আশা করি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, যখন আমি সেগুলো দেখি, তখন তার ওপর মার্কিন ব্র্যান্ডের লোগো থাকলেও সেগুলো আসলে চীনে তৈরি। আপনি যদি একটি হার্ডওয়্যার দোকানে গিয়ে লোহা বা টোস্টার কিনতে যান, তাহলে সেখানেও আপনি দেখতে পাবেন, সবই চীনে তৈরি।

এখন ট্রাম্পের প্রত্যাশা হচ্ছে যে টোস্টারগুলো আবার চীনের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হবে। তবে এটি সম্ভব হবে যদি এমন এক সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, যার দাদা একসময় টোস্টার তৈরি করতেন, এখন এটি অনুভব করেন যে এত বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে টোস্টার তৈরির কারখানা আবার শুরু করা লাভজনক হবে। তিনি ভাববেন, ‘‌আজকাল কি হবে? আমি তো ৪০ শতাংশ সুরক্ষা পেলেও প্রতিযোগিতামূলক হতে পারব না। নিশ্চিতভাবেই আমি ১০ শতাংশ সুরক্ষায় প্রতিযোগিতামূলক হতে পারব না।’

তাহলে আমি কেন এটি করব? এবং কীভাবে নিশ্চিত হতে পারি যে আমার কারখানার জন্য ৪০ শতাংশ সুরক্ষা থাকবে? তাই এই পুরো কৌশলের লক্ষ্য বা ফলাফল এখন এমনভাবে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে যা অর্থনীতিবিদরা এবং বাজার বিশ্লেষকরা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাতের লোকজনও মনে করছেন।

শেষ করতে চাই, কারণ আমি বিশেষভাবে খুশি যে এখানে আমাদের কিছু প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক উপস্থিত আছেন, আমি তাদের কাছ থেকে শিখে নিজের জ্ঞান আরো বাড়াতে চাই। আমি তাদের কাছ থেকে বুঝতে চাই, বাংলাদেশের জন্য ট্রাম্প শুল্কের অর্থ কী? আমরা এরই মধ্যে দেখেছি যে আমাদের শুল্কহার ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এরপর আমরা কোনো ধরনের পুরোপুরি বিবেচনা না করেই, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একটি চিঠি পাঠিয়ে, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট পণ্য যা থেকে আমদানি বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে, তার জন্য একটি তালিকা পাঠিয়েছি। এখন আমি নিশ্চিত নই, এ বিষয়টি পুরোপুরি না বুঝে বা এর পূর্ণ প্রভাবগুলো না ভেবেই কেন আমরা এত তাড়াতাড়ি এটি করেছি? আমি মনে করি, সেই তালিকা এখনো পাঠানো হয়নি। চিঠিতে কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের উল্লেখ করা হয়েছিল। এখন এখানে আমাদের যা ভাবতে হবে তা হলো—এ প্রক্রিয়াটি আসলে কীভাবে কাজ করবে? আমরা ঘোষণা করেছি যে আমরা কিছু পণ্যের আমদানি বাড়াব।

যেমনটি বলা হয়েছে, বেশকিছু পণ্যের জন্য এরই মধ্যে জিরো ট্যারিফ ঘোষণা করা হয়েছে, যেমন তুলা। এখন তুলার আমদানি বাড়াব কীভাবে, কারণ মার্কিন তুলার রফতানির ওপর কোনো শুল্ক বাধা নেই। কিন্তু আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি তুলা আমদানি করছেন না। কারণ এটি একটি বাজারের সিদ্ধান্ত, ব্যবসায়ীরা টেক্সটাইল শিল্প খাতে নিয়েছেন। তারা তুলা মিশ্রণ করে, তাদের প্রয়োজন বিভিন্ন ধরনের তুলার, তাদের দাম নির্ধারণের ওপর নির্ভর করে কোথা থেকে তারা তুলা কিনবে এবং তারা বাজারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা ৮০ শতাংশ তুলা কিনবে, যার বেশির ভাগই আসছে ভারত থেকে, কিছু পাকিস্তান থেকে, কিছু মধ্য এশিয়া থেকে, কিছু আফ্রিকা থেকে এবং কিছু মার্কিন তুলাও তারা কেনে। তারা কিছু ধরনের তুলা ব্যবহার করে যা ডেনিম তৈরির জন্য প্রয়োজন। তাহলে এ পরিস্থিতিতে আমার যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু আমদানি করব যদি এটি একটি বাজার অর্থনীতি হয়।

রেহমান সোবহান: চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

[৮ এপ্রিল পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতায়]