সেই ধারণাটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সমৃদ্ধি নাকি গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ অবাধ বা ‘ল্যাসে-ফেয়ার’ (মুক্ত বাজার) পুঁজিবাদের ভিত্তিতে। অথচ বাস্তবতা হলো, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সংকর অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করেছে, যেখানে জাতীয় অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের স্বার্থে রাষ্ট্র বেসরকারি খাতকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, ভর্তুকি দিয়েছে এবং প্রয়োজনে উদ্ধারও করেছে। জনপরিসরের প্রচলিত বয়ানে মুক্তবাজারের প্রশংসা যতই করা হোক না কেন, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বাস্তবে বরাবরই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
এ ইতিহাসের সূচনা বারাক ওবামার স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি দিয়ে নয়, এমনকি ১৯৩০-এর দশকে ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের ‘নিউ ডিল’ দিয়েও নয়। এর শুরু যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রশাসনের সময়, জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে। ১৭৯১ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন কংগ্রেসে এমন একটি প্রতিবেদন জমা দেন, যা সম্ভবত শিল্পনীতি নিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম সুসংগঠিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সরকারি নথি। তার ‘রিপোর্ট অন ম্যানুফ্যাকচারস’-এ তিনি উল্লেখ করেন, বিশেষ করে বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের মতো যুক্তরাষ্ট্রের নবীন শিল্পগুলো সরকারি সুরক্ষা ছাড়া প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ উৎপাদকদের সঙ্গে কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবে না। তাই তিনি ভবিষ্যতের শিল্প গড়ে তুলতে শুল্ক আরোপ ও ভর্তুকি দেয়ার প্রস্তাব করেন।
সেসময় মার্কিন প্রতিনিধি পর্ষদ বা কংগ্রেসের বেশির ভাগ সদস্যই কৃষি খাত থেকে এসেছিলেন। তারা হ্যামিল্টনের প্রতিবেদনটি কার্যত স্থগিত করে দিয়ে তাকে তাৎক্ষণিক লড়াইয়ে হারিয়ে দেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয়ী হন হ্যামিল্টনই। কারণ পরবর্তী এক শতাব্দী ধরে তার ধারণাই আমেরিকার অর্থনৈতিক নীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। হেনরি ক্লের ‘আমেরিকান সিস্টেম’, উত্তরের শিল্পায়নে সহায়ক সুরক্ষামূলক শুল্কনীতি এবং আন্তঃমহাদেশীয় রেলপথ নির্মাণে কেন্দ্র সরকারের (ফেডারেল) সরকারের ভূমি অনুদান—সবকিছুর মধ্যেই হ্যামিল্টনের চিন্তার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। অর্থাৎ শিল্পনীতির জন্ম ব্রাসেলস, বেইজিং, টোকিও বা মস্কোতে নয়।
প্রতিষ্ঠাকালীন সেই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি কখনো হারিয়ে যায়নি। বিংশ শতকে স্নায়ুযুদ্ধের সময় গড়ে ওঠে সামরিক শিল্প জোট। ডারপা (ডিএআরপিএ) ইন্টারনেট উদ্ভাবন করে, নাসা এমন সব প্রযুক্তি তৈরি করে এবং পরে সেগুলো বেসরকারি খাতে ছড়িয়ে দেয়, যা পরবর্তী সময়ে পুরো শিল্প খাতের রূপ বদলে দেয়। ফেডারেল সরকারের ক্রয় চুক্তিগুলো কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে টিকিয়ে রাখে। ডোয়াইট আইজেনহাওয়ারের সময় নির্মিত ‘ইন্টারস্টেট হাইওয়ে সিস্টেম’ শুধু ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো বিনিয়োগই ছিল না; এটি একই সঙ্গে মোটরগাড়ি শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল ভর্তুকিও ছিল। আবার ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় সরকার ব্যাংক ও মোটরগাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে মালিকানার অংশীদার হয়, যা আবারো তথাকথিত মুক্তবাজারের শুদ্ধ মতবাদকে অগ্রাহ্য করে।
তার পরও অবাধ বাজারভিত্তিক আমেরিকার এ মিথ আশ্চর্যজনকভাবে টিকে আছে। বাস্তব চর্চা সেই বিশ্বাস থেকে অনেক দূরে সরে গেলেও এটি যেন এক ধরনের জাতীয় ধর্মে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক ও ইউএসএআইডির মাধ্যমে প্রচারিত একই অর্থনৈতিক মতবাদ অনেক সময় অন্যান্য দেশের বাস্তবভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত আমাদের গবেষণাপত্র ‘দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অ্যাজ অ্যান অ্যাকটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি নেশন‘-এ আমি, জিয়ানডং জু এবং ইউয়ানকুন লি এ বাগ্মিতা ও বাস্তবতার ব্যবধানটি বিশ্লেষণ করেছি। আমরা ১৯৭৩ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জারি হওয়া কংগ্রেসের ১২ হাজার ১৬৭টি আইন এবং প্রেসিডেন্টদের ৬ হাজার ৩০টি নির্বাহী আদেশ পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করেছি। লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) ব্যবহার করে আমরা এমন নীতিগুলো শনাক্ত করেছি, যেগুলো সচেতনভাবে অর্থনীতির কাঠামোকে অবাধ বাজারের স্বাভাবিক ফলাফল থেকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছে। ফলাফল ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আমরা দেখতে পাই, এ সময়ে কংগ্রেসের ২৬৭টি আইন এবং প্রেসিডেন্টদের ১৮৭টি নির্বাহী আদেশে উল্লেখযোগ্য নতুন শিল্পনীতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। অর্থাৎ অর্ধশতাব্দীজুড়ে প্রতি বছর গড়ে নয়টিরও বেশি নতুন শিল্পনীতি কার্যকর হয়েছে। হোয়াইট হাউজ বা কংগ্রেসে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, এ প্রবণতা একই রকম ছিল। রিচার্ড নিক্সন থেকে শুরু করে জো বাইডেন পর্যন্ত প্রত্যেক প্রেসিডেন্টই নতুন শিল্পনীতি গ্রহণ করেছেন। দুই রাজনৈতিক দলের পার্থক্য মূলত মাত্রার; প্রকৃতির নয়।
আমাদের গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পনীতির আরো কিছু আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যও উঠে এসেছে। যেমন দেখা যায় যে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ঐতিহাসিকভাবে অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করে রেখেছেন। শিল্পনীতি-সংক্রান্ত সব আইন ও নির্বাহী আদেশের প্রায় ৫৯ শতাংশেই স্পষ্ট মেয়াদসীমা নির্ধারণ করা আছে, যার গড় স্থায়িত্ব প্রায় চার বছর। অনেক নীতিই পরীক্ষামূলক কর্মসূচি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ব্যর্থ হলে সহজেই তা বন্ধ করা যায়। আবার কিছু নীতিতে শর্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘বাই আমেরিকা’ নীতির আওতায় সরকারি ক্রয়ে দেশীয় পণ্যের অগ্রাধিকার তখনই কার্যকর থাকে, যখন দেশীয় পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজার দামের ১২৫ শতাংশের বেশি না হয়। অদক্ষতার মাত্রা যদি তার বেশি হয়ে যায়, তাহলে সেই ভর্তুকির সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায়।
২৫০ বছর পদার্পণের এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আবারো দৃশ্যমানভাবে স্পষ্ট রাষ্ট্রনির্ভর পুঁজিবাদের দিকে ঝুঁকেছে। ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’, ‘ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট’ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন—উভয়ের আমলেই গৃহীত আক্রমণাত্মক শুল্কনীতি আমেরিকার দীর্ঘ ঐতিহ্য থেকে মৌলিক কোনো বিচ্যুতি নয়। কিন্তু বর্তমান বিতর্ক—যেখানে একপক্ষ ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের বিস্তার দেখছে, আর অন্য পক্ষ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল আরো ন্যায্যভাবে বণ্টনের দাবি তুলছে তা এ দীর্ঘ ধারাবাহিকতাকে আড়াল করে দেয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্র কখনই পুরোপুরি অবাধ বাজারভিত্তিক অর্থনীতি ছিল না। শুরু থেকেই এটি এমন একটি রাষ্ট্র, যা প্রয়োজনে অবাধ বাজারের ব্যর্থতা মনে করলে কৌশলগতভাবে নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করতে প্রস্তুত থেকেছে। একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিযোগিতামূলক বেসরকারি খাতকে ধরে রেখেছে।
গত ২৫০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত রহস্য বাজার কিংবা রাষ্ট্র—কোনো একটির প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী উভয়কেই ব্যবহার করার বাস্তববাদী সক্ষমতাই এর সাফল্যের ভিত্তি। ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বলা যায়, এ বাস্তববাদই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকারগুলোর একটি।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
শাং-জিন ওয়েই: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ও অর্থনীতির অধ্যাপক
[ইংরেজি থেকে অনূদিত]









