রাজস্ব প্রশাসন ও নীতি প্রণয়ন কার্যক্রম পৃথকের সুপারিশ দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি নানা সময়ে পৃথকের উদ্যোগ নেয়ার প্রয়াসও দেখা গেছে। বিশেষত ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজস্ব প্রশাসন ও নীতি প্রণয়ন কার্যক্রম পৃথক করতে একটি আদেশও জারি করা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারের দাবি জোরালো হয়ে উঠলে সেখানেও রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আলাদা করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১২ মে এনবিআর ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে সরকার। এর মাধ্যমে এনবিআরকে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে নতুন দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে। অধ্যাদেশে নতুন দুই বিভাগের কার্যপরিধি কী হবে তাও উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি বিভাগই থাকবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ধারণা করা হয়েছিল এনবিআরের দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় কাঠামো ভেঙে পৃথক দুটি বিভাগ গঠনের মধ্য দিয়ে রাজস্ব প্রশাসনে এক যুগান্তকারী সংস্কার সম্ভব হবে। কিন্তু সংস্কারের বদলে সংস্কার ঘিরে নতুন অভ্যন্তরীণ জটিলতা দেখা দিয়েছে এনবিআরে।

পৃথক বিভাগ হওয়া নিয়ে তেমন কারো আপত্তি না থাকলেও অধ্যাদেশ জারির পর থেকেই কোন পদে কাকে পদায়ন করা হবে তা নিয়ে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনে নামেন শুল্ক-কর বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কাজ বন্ধ রেখে শুরু করেন আংশিক কলমবিরতি। এনবিআর বিলুপ্তির অধ্যাদেশ জারির পাশাপাশি রাজস্ব নীতি বিভাগে রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগের দাবি তোলেন তারা। অন্যদিকে অধ্যাদেশে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে এ বিভাগের সচিব পদে নিয়োগ দেয়ার কথা থাকলেও রাজস্ব খাতের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ নেই। পদ-পদবি নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন এখনো চলমান রয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনবিআর চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিও। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাহত হচ্ছে রাজস্ব আহরণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম। আন্দোলনের প্রভাবে বন্দর ও কাস্টমসে আমদানি-রফতানি বিঘ্নিত হচ্ছে। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কলমবিরতি পালন করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর ফলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় শুল্কায়ন কার্যক্রম হয়েছে ১০ শতাংশের মতো। তবে কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সব দপ্তরে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এরই মধ্যে রফতানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলোয় কাঁচামাল ছাড় করতে না পারায় উৎপাদন ব্যাহত হতে শুরু করেছে। শঙ্কা রয়েছে এ পরিস্থিতি আরো দীর্ঘায়িত হলে পুরো অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।

দেশের রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা এমনিতে দুর্বল। প্রতি বছরই রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা এনবিআরকে দেয়া হয় তা পূরণে ব্যর্থ হয় সংস্থাটি। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পরে রাজস্ব আহরণের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থেকে বের হতে না পেরে মাঝপথে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত এনবিআর রাজস্ব আহরণ করেছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো ঘাটতি রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এভাবে ক্রমাগত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকার জন্য সংস্থাটির অদক্ষতা, কাঠামোগত দুর্বলতা বিশেষভাবে দায়ী।

এনবিআরের এসব অভ্যন্তরীণ সংকট দূর করতেই সংস্থাটিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পৃথকের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিতের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেটি তখনই সম্ভব যখন দুই বিভাগের নেতৃত্বে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া হবে। তবে সবার আগে প্রয়োজন যত দ্রুত সম্ভব এনবিআরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। নিয়োগের পাশাপাশি বর্তমানে অন্য যে দাবি নিয়ে এনবিআরের কর্মকর্তারা আন্দোলন করছেন তা সরকারকে আন্তরিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। তাদের দাবির যৌক্তিকতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সমঝোতার পথ খুঁজতে হবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থের কথা আন্দোলনরত কর্মকর্তাদেরও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কমপ্লিট শাটডাউনের পথে হাঁটা আগে থেকে সংকটে থাকা অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি বয়ে আনবে।

সম্প্রতি চলমান সংকট সমাধানের জন্য একটি বৈঠক আয়োজিত হলেও কোনো ফলপ্রসূ সমাধান আসেনি। আগামী সপ্তাহে আরেকটি সভার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা। প্রত্যাশা রয়েছে সে সিদ্ধান্ত এনবিআরের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সহায়ক হবে। সেই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণের প্রতিবন্ধকতাগুলোও ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

এনবিআরের বিদ্যমান কাঠামোয় রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না বলেই এটিকে পৃথক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি নানা সময়ে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এমনকি ১৯৭৯ সালের ট্যাক্সেশন এনকোয়ারি কমিশনের রিপোর্টেও এনবিআরকে বিভক্ত করার সুপারিশ উঠে এসেছিল। যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ অনেক দেশ এরই মধ্যে এ পথেই হেঁটেছে। কিন্তু দেশে যখন আরো একবার এ পথে হাঁটার উদ্যোগ নেয়া হলো সেটি নতুন সংকটে রূপ নিল, যা মোটেও প্রত্যাশিত নয়। বর্তমান এনবিআর কাঠামোয় নীতি ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম একসঙ্গে থাকায় স্বার্থগত দ্বন্দ্বের বিষয়টিও সময়ে সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এ ধরনের সংকট থেকে বের হতে হলে নীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ যেমন জরুরি, তেমনি দক্ষ হাতে নেতৃত্ব থাকাটাও আবশ্যক।

বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পাশাপাশি গ্রহণযোগ্যতাকেও প্রাধান্য দিতে হবে। তবে সর্বাগ্রে থাকতে হবে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ। রাজস্ব আহরণ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হতে থাকলে অর্থনীতির আকার সংকুচিত হয়ে আসবে। সরকারের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি মেটাতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতি কারো কাম্য নয়।