(বাইনারি বিভাজন ও বাহাদুরি বয়ানের বিপরীতে গ্রামীণ নিম্নবর্গের জীবন থেকে নেয়া কিছু প্রমাণ)

বাংলাদেশ এক জটিল ভূগোল। প্রকৃতি ও সংস্কৃতির বহু গ্রন্থি মিশেছে পরস্পর। তবে এই ‘মেশামেশি’ সর্বদা আকর্ষণ না বিকর্ষণ তা নিয়ে বিস্তর বাহাস আছে। এ বাহাস ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক। তবে এ বাহাসের চামড়ায় দাসখত এবং নিওলিবারেল দস্তখত সবই আছে। আছে বাইনারি বিভাজনের খাঁজলি-চুলকানি। নানা মাত্রার কর্তৃত্ববাদের আছর ও আঁচড়। এ ভূগোলের মানুষেরা নদীর বিস্তার দিয়ে নিজেদের পরিচয় নির্ঘন্ট রচনা করেছিলেন একসময়। কেউ ব্রহ্মপুত্র, কেউ তিস্তা, কেউ যমুনা, কেউ সিমসাং, কেউ রংদী, কেউ লংলা, কেউ সুরমা, কেউ যাদুকাটা, কেউ কর্ণফুলী, কেউ হালদা, কেউ করতোয়া, কেউ সাঙ্গু, কেউ শীতলক্ষ্যা অববাহিকার। আমাদের গানের সুর, বস্ত্রবয়নের নকশা, মাটির চুলার ধরন, রন্ধনপ্রণালি কিংবা কৃষি ও জুম আবাদ সবকিছুই নদীগন্ধময়। আমরা সবাই নদীর গন্ধম গিলেছি। চিগেলবাড়িওয়ারিখুট্টির চারধারে ছিল জলপ্রবাহ, যেখান থেকে প্রাণের বিস্তার ঘটেছে, জলের ঘূর্ণিতেই মাথা তুলেছিল পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুঢ়হি কিংবা কুম্ভীরানী। কিন্তু আমাদের সেই নদী-পরিচয় লণ্ডভণ্ড ওলটপালট করে দেয়া হয়েছে। আমরা তাই এখন আমাদের চিনতে পারি না। আমাদের রক্তবিন্দুতে নদীকুসুম আমরা আর টের পাচ্ছি না। আমরা তাই হন্তারক, ধর্ষক, লুটেরা কিংবা কৃতঘ্ন হয়ে উঠছি অবলীলায়। আমাদের নদীপ্রবাহ এক নয়; তাই আমাদের সংস্কৃতির ডালপালাও নানাভাবে ছড়ানো। নদী যেমন আবার নানা নদীজীবনে জলবিন্দু দিয়ে মিশেছে, মানুষের সমাজেও সেই মিশ্রণ আছে। বিদ্যায়তনে একে অনেকেই বলেন ‘সাংস্কৃতিক লেনদেন বা সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া’। আমরা বহু বিনিময়ের গল্প-গাঁথুনিতে বড় হয়েছি। বাংলাদেশের হাওর ও বিলাঞ্চলে এই সেদিনও ধান দিয়ে লবণ, মাটির পাতিল, গামছা, গুড় বিনিময় হয়েছে। পাহাড়ে এখনো ধান বা জুমের ফসল দিয়ে কাপড়, কেরোসিন, লবন, নাপ্পি শুঁটকি বিনিময়ের চল আছে। চলতি আলাপটি একখান অতি সরল আলাপ। নির্মেদ। মেকাপহীন। রগড় ও বাগাড়ম্বরবিহীন। আদিবাসী-বাঙালি সাংস্কৃতিক বিনিময় নিয়ে আমরা আলাপ তুলছি। আমি ঠিক জানি না ছয়-সাতশ বছর আগে সুলতানি আমলে এ আলাপ ছিল কিনা, কিংবা তারপরের মুঘল আমলে। প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের যেসব নথি ও দলিল বিজ্ঞজনেরা হাজির করেন সেখানে আবার মানুষের জাতিগত পরিচয় স্পষ্ট না। যেমন ওয়ারী-বটেশ্বর, লালমাই, চাকলাপুঞ্জি, রাঙামাটি, বরেন্দ্র, মধুপুর, রামু কিংবা পাহাড়পুরে কোন জাতিসত্তার বসবাস ছিল এটা কেউ জানায়নি। তারা কি কোল, মুন্ডা, সাঁওতাল, লালেং, খাসি, মান্দি, ওঁরাও, কোচ, হাজং, বাঙালি, পাহাড়িয়া, ম্রো, চাকমা, রাখাইন নাকি ত্রিপুরা? জাতিগত পরিচয় না জানালেও ইতিহাসবিদেরা হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম আমল নামে আশ্চর্য সব ভাগ-বিভাগ হাজির করতে পেরেছেন। যা হোক ব্রিটিশ উপনিবেশকালে আমাদের সামনে বহু মৌখিক ও মুদ্রিত প্রমাণ আছে আদিবাসী-বাঙালি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের।

হাতিখেদা বিরোধী বিদ্রোহের কথাই ধরা যাক। মুঘল আমলে, ১৮৩০ সালে এ বিদ্রোহ একটা পরিণতি পায়। সুলতানি বা মুঘল আমলে রাজা-বাদশাহর শান-শওকত কীভাবে ঠিকরে পড়ত? নিরীহ বন্যপ্রাণী খুনখারাবি করে। গরিব মানুষ আর বন্যপ্রাণীর ওপর তারা হেডম দেখাত। বন-পাহাড় থেকে প্রজাদের দিয়ে জোর করে হাতি ধরাত এবং এই হাতি বিক্রি হতো চড়া দামে, কখনো হতো যুদ্ধের উপঢৌকন। বর্তমান নেত্রকোনা-শেরপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর-সুনামগঞ্জ সীমান্তবর্তী এলাকা ছিল হাতির বিচরণস্থল। হাজং-কোচ-মান্দি-ডালু-হদি আদিবাসীরা ছিল এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা। তাদের হাতি ধরে দিতে হতো। হাতির খেদায় কাজ না করলে রাজা চাবকে চাবকে মেরে ফেলত। সুসং দুর্গাপুরে হাজংরা বিদ্রোহ করল। বনের অবলা হাতি ধরে বাণিজ্য করার বিরুদ্ধে। রাজা তাদের পিষে মেরে ফেলল। শহীদ হলেন হাজং মনা সর্দার। হাজংরা হাতি বাঁচাতে জীবন বাজি রেখে দাঁড়ালেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর হাজংদের বিদ্রোহ জয়ী হলো। হাতিখেদা নিষিদ্ধ করা হলো। হাতি বাণিজ্য নিরোধ হলো। আজ হাতি সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও এজেন্সির কত শোরগোল, কত উচাটন। কিছুই সম্ভব হতো না যদি হাতিখেদার বিরুদ্ধে হাজংরা জান বাজি রেখে না দাঁড়াতেন। এ ঘটনা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কাঠামোয় বন্যপ্রাণী সুরক্ষা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও দাবিকে যুক্ত করার জন্য শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রমাণ তৈরি করেছিল। এমনকি এ বিদ্রোহ ক্ষমতাকাঠামোর জুলুমের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের বিদ্রোহের জরুরত ও জমিনও তৈরি করে দিয়েছিল। যার ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাই সেই একই সময়ে একই অঞ্চলে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক পাগলপন্থী বিদ্রোহ। বাঙালিরা এ বিদ্রোহে জান বাজি রেখে লড়েছিল, লড়েছিল ডালু, হাজং, হদি, কোচ, মান্দিরাও। পাগলপন্থী বিদ্রোহে এই যে বাঙালি-আদিবাসী মিথস্ক্রিয়া তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল শ্রেণীবিপ্লবের বইয়ের মলাট কিংবা বর্গীকরণের রাজনৈতিক দরবার দিয়ে এ বোঝা সম্ভব না। ১৮৫৫ সালের হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহ এ ধারাবাহিকতায় এক দুর্দান্ত মাইলফলক। সাঁওতাল আদিবাসীদের ভেতর দিয়ে সংগঠিত একটি গণলড়াই কীভাবে অপরাপর প্রান্তিক জাতিসত্তা এবং গরিব বাঙালিদের একত্র করতে পারল সেখান থেকেই আমরা বাঙালি-আদিবাসী পারস্পরিক বিনিময় ও আদানপ্রদানের দিশাগুলি ঠাহর করতে পারি। সাঁওতালরা লড়াই শুরু করেছিলেন দিকুদের অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে। দিকু মানেই বাঙালি নয়, দিকু মানে অত্যাচারী লুটেরা অধিপতি ক্ষমতাবর্গ। হুল শ্রেণীশত্রু চিহ্নিতকরণের রাজনৈতিক পাঠের বিস্তার ঘটাতে পেরেছিল এক বিস্তীর্ণ গ্রাম জনপদে। যার কয়েক বছর পরেই গ্রামের পর গ্রাম বাঙালি-আদিবাসী কৃষকেরা ঐতিহাসিক নীল বিদ্রোহ সংগঠিত করে। ঔপনিবেশিক জুলুমবাজদের শ্রেণীশত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে এবং সংগ্রামের দীক্ষা আরো বেশি সম্প্রসারিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ১৯০০ সালে আমরা দেখি বীরসা মুন্ডার নেতৃত্বে উলগুলান বা মুন্ডা বিদ্রোহ। লড়াকু পাঠপ্রক্রিয়ার সংস্কৃতি ধারণ করে বিকশিত হয় বহু গ্রাম জনপদ। বইয়ের ভাষায় আমরা বলতে পারি পলিটিক্যাল স্কুল। তারপরের কৃষক আন্দোলনগুলোতে আমরা আদিবাসী ও বাঙালিদের একটা সমন্বয় এবং যৌথ লড়াই দেখতে পাই। তেভাগা, টংক থেকে নানকার বিদ্রোহ কিংবা মুক্তিযুদ্ধ। যদিও পরবর্তী সময়ে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রে নিম্নবর্গের এ পলিটিক্যাল স্কুলগুলা চালু থাকে নাই। এদের রাখা হয় নাই। চুরমার কইরা ফানাফানা মিশাইয়া দেয়া হইছে। কোনো রক্তদাগের চিহ্ন রাখা হয় নাই। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রে জুলুম ঠিকই টিকে থাকলে, অন্য চেহারায়, অন্য মাত্রায়, অন্য ভঙ্গিতে। নিম্নবর্গ বারবার এই জুলুম-যন্ত্রণারে প্রশ্ন কইরা দাঁড়ায়। রাষ্ট্র যদিও কোনো পাত্তা দেয় না, সবকিছু গোপন কইরা ফেলতে চায়। সমকালে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি আন্দোলন আরেক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, যেখানে বাঙালি-আদিবাসী কণ্ঠস্বর সব একত্র হইছিল। তো, আদিবাসী-বাঙালি সাংস্কৃতিক বিনিময় কোনো উটপাখির ডিম বা আসমান থেকে পড়া উল্কাপিণ্ড না। এই ঐতিহাসিক পরম্পরা ছিন্নভিন্ন হইলেও এখনো নানাভাবে বহমান, তাই গ্রাম জেগে আছে, দেশ বেঁচে আছে। আমরা এখন কিছু উদাহরণের ভেতর দিয়া বাঙালি-আদিবাসী সাংস্কৃতিক বিনিময় বোঝার চেষ্টা করব।

জুম আবাদ ও লাঙলভিত্তিক চাষ

কেবল আদিবাসী-বাঙালি নয়; সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের অধিপতি আলাপগুলান উৎপাদন সম্পর্ক নিয়া কোনো বিবরণ হাজির করে না। একটা কারণ হইতে পারে দেশে বিজ্ঞ ও বিশিষ্টজন বনে যাওয়া এলিটরা জুম ও কৃষিজীবন সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না কিংবা তারা এই মৌলিক ডিসকোর্সরে ভয় পায়। বাংলাদেশ এক বৈচিত্র্যময় বহুমুখী কৃষিসংস্কৃতির দেশ। বহু সমাজের কারিগরি, প্রাণসম্পদ, বিজ্ঞানের মিথস্ক্রিয়ায় এই ভূগোলের কৃষিজগৎ বিস্তৃত হয়েছিল। আমন, আউশ ও বোরো মৌসুমের ভেতর আমন ও বোরো মৌসুমে এই মিথস্ক্রিয়া বেশি ঘটেছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো মৌসুমে ধানের রোয়া লাগানোর কাজটি মূলত আদিবাসী নারীরাই করেন। এছাড়া সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা কিংবা উত্তরাঞ্চলে হাজং, মান্দি, কোচ, বানাই, মুন্ডা, ওঁরাও, সাঁওতাল নারীরা রোয়া লাগানো, নিড়ানি ও মাড়াইয়ের কাজ করেন।

কৃষিকাজসহ গ্রামীণ জীবনে কুলা-ডালা-ঝাড়-ডলই-মটকা বাঁশের তৈজস মূলত আদিবাসী নারীদের উদ্ভাবন ও অবদান। পাহাড়-জঙ্গলের জুম-আবাদ থেকে কৃষিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন যুক্ত হয়েছে। প্রথমত মিশ্র ফসল চাষ এবং শস্য আবর্তন। শুকনো ঝরাপাতা ডালপালা পোড়ানোর মাধ্যমে মাটিতে কার্বন-সঞ্চয় করার পদ্ধতিও জুমচাষ থেকে সমতলের লাঙলভিত্তিক কৃষিকাজে সংযোজিত হয়েছে। চাষের জমির কাছাকাছি বন-জঙ্গল থাকার গুরুত্ব জুম চাষ থেকে সমতল কৃষিতে গুরুত্ব পেয়েছে। কাছাকাছি বসবাসের ফলে ধান, আদা, হলুদ, কচু, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, তিল, তিসি, কাউন, তুলা, যব, ভুট্টাসহ ফসলের বীজ বাছাই ও বীজ সংরক্ষণের নানা লোকায়ত পদ্ধতি আদিবাসী ও বাঙালি কৃষক সমাজের ভেতর লেনদেন হয়েছে। বহু কৃষিজ উপকরণ ও যন্ত্রপাতি বিকশিত হয়েছে আদিবাসী ও বাঙালি কৃষক-জুমিয়া সমাজের ধারাবাহিক মিথস্ক্রিয়ায়। এই মিথস্ক্রিয়ায় জরবদস্তি আছে, জাত্যভিমান আছে, আবার কখনো পরস্পরনির্ভরশীলতাও আছে। বিভিন্ন আদিবাসী জাতিসত্তার মাছ ধরার লোকায়ত প্রযুক্তি ও ফাঁদ বৃহত্তর বাঙালি জীবনে উল্লেখযোগ্যভাবেই সংযোজিত হয়েছে। গোটা, ডালি, ডালা, ডোবা, ঢের, ঢ্যাঙা, বাদাড়, ঝিল, ঝাটা, ঝপঝপ, ছাঁকনি, ছাল, উন্দারা, কল, খলুই, খুন্তি, ঘানি, জাংলা, মাচা, চারা, চালা, ডোল, করাত, দা, লাঙল, হাল, হুড়কা, টিকলি, শাবল এ রকমের বহু সাঁওতালি শব্দ বাংলা ভাষায় আত্তীকৃত হয়েছে। হাজং ও রাজবংশী ভাষার বহু কৃষিজ শব্দ বাংলা ভাষায় যুক্ত হয়েছে। আবার বাংলা বহু শব্দও চাকমা, কোচ ও বর্মণ-ক্ষত্রিয়দের ভাষায় যুক্ত হয়েছে। শেরপুরের ডালু, মৌলভীবাজারের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, সিলেটের লালেং/পাত্র, নেত্রকোনার লেঙাম, কক্সবাজারের তঞ্চংগ্যা, বৃহত্তর ময়মনসিংহের মান্দিদের বর্তমানের চলমান ভাষায় বহু স্থানীয় আঞ্চলিক বাংলা (চাঁটগাইয়া, সিলেটি, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ইত্যাদি) শব্দ আত্তীকৃত হয়েছে এবং তাদের কৃষিজীবনে সেসব ব্যবহৃত হচ্ছে। পাশাপাশি এটিও ঠিক আদিবাসীসহ বাঙালিদের বহু আঞ্চলিক বৈচিত্র্য কেবল চাষাবাদ ও উৎপাদন সম্পর্ক বদলে যাওয়ার কারণে নিদারুণভাবে বদলেছে বা বদলে যেতে বাধ্য হয়েছে। নেত্রকোনার হাজং ও মান্দিদের ভেতর জাইট/ঝুপরি/বুর নামের এক পদ্ধতিতে মাছ ধরা হয়। শেওড়া, বনডুমুর, হিজল গাছের ডাল পানিতে পুঁতে রেখে পরে এখান থেকে মাছ ধরা হয়। এলাকার বাঙালিরা এ পদ্ধতি গ্রহণ করলেও বুর থেকে মাছ তোলার ক্ষেত্রে তারা সাধারণত ঠেলা জাল ব্যবহার করে।

বিনি ধান, আনারস, ঝিঙ্গা, মারফা, জুমতিল কিংবা শিদল

বিনি, বিন্নি, বিরন বা আঠালো ভাতের ধানের বড় জোগানদার আদিবাসী জুম। কালাবিনি, লালবিনি, সাদাবিনির আজ যে রমরমা শহুরে চাহিদা তার জোগান আসে নির্যাতিত পাহাড় থেকেই। আদিবাসীদের সংরক্ষিত বহু ধান ও ফসলের জাত বৃহত্তর বাঙালি কৃষিসমাজ গ্রহণ করেছে। এসব বহু ধান ও ফসল এই অঞ্চলের ভৌগৌলিক মহিমাও বটে। টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (জিআই) বিতর্ক আমরা জানি। টাঙ্গাইল শাড়ি বাঙালি তাঁতিরা বোনেন। কিন্তু এ শাড়ির এক অন্যতম উপাদানের জোগান হয়েছে আদিবাসীদের মাধ্যমে, ঐতিহাসিকভাবেই। পোড়াবিনি নামের এক মূলত জুমধানের খইয়ের মাড় এই শাড়ি বুননে লাগে। শেরপুরের সীমান্তবর্তী শালবন টিলায় কোচ, মান্দিরা এই ধান আবাদ করতেন। একই সঙ্গে এ এলাকার আদিবাসীরা যেমন উপহার দিয়েছেন সুগন্ধি তুলসিমালা ধান, এটিও বাংলাদেশে জিআই নিবন্ধন পেয়েছে। বাংলাদেশের এক মহান কৃষি গবেষকের এক প্রাণডাকাতি স্টাইলের একটি গবেষণা দেখার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল। বাংলাদেশ ও আফ্রিকার কিছু ধানজাত নিয়ে তিনি গবেষণা করে দেখতে চেয়েছেন খরাসহিষ্ণু জাত কোনগুলো। সেখানে মধুপুর শালবনের মান্দিদের মিসারাং ও মিমিদ্দিম জুম ধানগুলোও ছিল। মান্দি কৃষকদের অনুমতি ছাড়াই এসব জাত ব্যবহার হয়েছিল। এমন উদাহরণ কত লাখো কোটি আছে। যা হোক কুষ্টিয়ার তিলের খাজা নামের বিখ্যাত খাবারে পাহাড়ের জুমতিল/প্রেমতিল ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের বিখ্যাত আনারস জাত কোনগুলো? ‘জলঢুপি আনারস’ ও ‘মধুপুরের আনারস’। সিলেট-মৌলভীবাজারের বিয়ানীবাজার-বড়লেখা এবং টাঙ্গাইলের মধুপুর ঐতিহাসিকভাবে আদিবাসী খাসি, লুসাই, নাগা, ত্রিপুরা, লালেং, হালাম জাতিসত্তা অধ্যুষিত অঞ্চল। আর এ এলাকার আদিবাসী জনগণই এসব আনারস জাত সংরক্ষণ করেছে। ১৯৫০ সালের কথা মনে আছে? মধুপুর শালবনে জোর করে জুম আবাদ নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্র। মান্দিদের জীবনে এ ছিল চরম সাংস্কৃতিক আঘাত। ইদিলপুরের মিজি মৃ তখন আনারসসহ মিশ্র ফসল চাষাবাদের ব্যাপক প্রচলন ঘটান। ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে মধুপুরের আনারস। শসা জাতীয় ফল জুমের মারফা, পাহাড়ি আদা-হলুদ, মাশরুম, বাঁশ কোড়ল, বিন্দু মরিচ, আদা জামির, কাটা জামির, পঞ্চমুখী কচু, কাসাভা, বনআলুর মতো বহু ফসল ও খাদ্য বাঙালি পাবলিক পরিসরে আত্তীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশে লোকায়ত মাছ এবং শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স নিয়ে গবেষণা কাজ নেই। উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও হাওরাঞ্চলে প্রচলিত হিদল, উত্তরাঞ্চলের শিদল, বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসীদের নাখাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নাপ্পির ভেতর নানামুখী মিল-অমিল আছে। কক্সবাজারের চৌফলদণ্ডী এবং কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর, নাপ্পি ও হিদল তৈরির দুটি প্রাচীন অঞ্চলের ভেতর কোনো ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়া ঘটেছিল কিনা আমি জানি না। দেশের প্রথিতযশা ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ, নৃবিজ্ঞানী, প্রতিবেশবিদ বা সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে নিম্নবর্গের যাপিত জীবনের এসব সাক্ষ্য কোনো গুরুত্ব বহন করে কিনা আমরা জানি না।

স্থান-নামগুলো জরুরি দলিল

দুই পাতা পড়াশোনা আর কোনো একটা ডিগ্রির দেমাগে আমরা নিম্নবর্গের লোকায়ত জ্ঞান অস্বীকার করি এবং গায়ের জোরে জনইতিহাসের আখ্যান গায়েব করতে থাকি। স্থান-নামগুলো খুব জরুরি, কারণ গণইতিহাস ও গণইশতেহারের ভেতর দিয়ে এসব নাম গড়ে ওঠে। ক্ষমতা, পরিবারতন্ত্র, কলোনিয়াল লিগ্যাসি, অপরায়ণ, কর্তৃত্ব দিয়ে কোনো পাবলিক স্থান-নাম গড়ে ওঠে না। রাজনীতি, ক্ষমতা ও মুনাফার জোরে যখন জোর করে নাম পাল্টানো হয়, তখন মূলত ক্ষমতাকাঠামো গণমানুষকে অস্বীকার করে, পায়ে ঠেলে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়, মহামান্য একাডেমিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকেরা এসব নিয়ে আলাপ করেন না। মানুষের জবানবন্দিকে তারা ভয় পান কিংবা তা বোঝার দায় ও দরদ তাদের নেই। দেশের মানুষের বয়ান ও বিবরণকে একবিন্দু পাঠ না করে; এক বিঘৎ কোনো রেফারেন্স, জাতিসংঘ বা কোনো এজেন্সিকে উদ্ধৃত করে এবং অহেতুক কিছু বাইনারির বলয়ে প্রশ্নহীনভাবে বন্দি থাকে আমাদের ‘জাতীয় ইতিহাস’। স্বাধীনতার পর থেকে এটি সবচেয়ে বেশি ঘটেছে ‘আদিবাসী আত্মপরিচয় বিতর্ক’ নিয়ে, আর সর্বাধিক ঘটেছে বাঙালিদের মাধ্যমে। ‘কে আগে এসেছে আর কে পরে এসেছে’ কিংবা ‘আদিবাসী, আদিবাসিন্দা এবং আদিম অধিবাসী পরিচয়গুলোকে গুলিয়ে ফেলার’ ভেতর দিয়ে তথাকথিত বিশেষজ্ঞ কী হামলাকারীরা মূলত প্রবলভাবে প্রমাণ করেছেন আদিবাসী এবং বাঙালি গ্রামীণ নিম্নবর্গের সঙ্গে এদের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই। এরা জনগণের ধারাবাহিক যাপিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এবং জনইতিহাস বিরোধী। যা হোক দেশের বহু স্থান-নাম আদিবাসী ভাষার। এমন বহু অঞ্চল আছে, যেখানে এখন কোনো আদিবাসী জাতিসত্তা নেই, কিন্তু তাদের দেয়া সেই প্রাচীন স্থান-নাম রয়ে গেছে। বাংলাদেশের উঁচু দুই পাহাড় তজিংডং এবং কেওক্রাডং মারমা ভাষার। বাংলাদেশের অধিকাংশ পাহাড়, টিলা, অরণ্য, পাহাড়ি ছড়া, গিরিখাত, ঝরনার নাম নানান আদিবাসী ভাষার। সিমসাং, লংলা, চেঙ্গী, সুতাং, কাসালং, মহাদেও, রংদী বহু নদীর নাম আদিবাসী ভাষার। দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম বানিয়াচং খাসি ভাষার শব্দ। বাংলায় মানে হলো কারবারিদের গ্রাম। বাংলাদেশের দুটি প্রধান স্থাপনা তৈরি হয়েছে দুই আদিবাসী বসতিতে। মণিপুরিপাড়ায় সংসদ ভবন আর কুর্মিটোলায় প্রথম বিমানবন্দর। কুর্মি, সাঁওতাল, মুন্ডারী ভাষায় গ্রাম/পাড়াকে টোলা বলে। বিস্ময়করভাবে ঢাকায় নয়াটোলা, আরমানিটোলা, টোলারবাগ এ রকম বহু নাম এখনো টিকে আছে। সাঁওতালি ভাষায় বন-জঙ্গলকে বলে ‘বির’। বনের ভেতরের গ্রাম মানে বিরটোলা। বৃহত্তর দিনাজপুরে এখনো শালবনের সাঁওতালি স্মৃতি নিয়ে টিকে আছে বীরগঞ্জ, বিরল কিংবা বিরামপুর। নামের শেষে ‘ইল’ যুক্ত হওয়া মুন্ডা রীতি। শ্রীহাইল, পুবাইল, নড়াইল, ঘাটাইল নামের সঙ্গে মুন্ডা সম্পর্ক খোঁজা জরুরি। লালেং/পাত্র আদিবাসীদের ভেতর প্রথাগত সামাজিক শাসনকাঠামোকে বলে ‘দলই’। সিলেটে দলইপাড়া নামে এখনো এক আদি লালেং গ্রাম টিকে আছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি, নামটি কুকি-নাগা-লুসাই আদিবাসীদের। সুলতানি আমলের আগ থেকেই আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে যখনই বাইরে থেকে আসা বাঙালিদের অভিবাসন ঘটেছে, তখন নানামুখী ক্ষমতা ও চাপে স্থান-নাম বদলে গেছে। নয়াবসতি স্থাপনকারী বাঙালি বসতগুলোর নাম হয়েছে হঠাৎপাড়া, আতকাপাড়া, ফারমপাড়া, আবাদিপাড়া, রিফ্যুজিপাড়া, আসামপাড়া, খৃষ্টানপাড়া, মুসলিমপাড়া ইত্যাদি। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রান্তে মেঘালয় সীমান্তে এক মান্দি গ্রামের নাম ‘বাঙ্গালভিটা’। যদিও এলাকাটি এখনো হাজং, মান্দি, বানাই, লেঙাম আদিবাসী অধ্যুষিত।

মুদ্রা, ভঙ্গি, বয়নশৈলী, নকশা, ভেষজ চিকিৎসা ও পরিবেশনা

মণিপুরি নাচের আলাপ দিয়েই নিশ্চিতভাবে এ ডিসকোর্স শুরু হবে মূলধারার পরিসরে। ঝুমুর, কাঠিনাচ, বোতলনৃত্য এসবও আসবে পরস্পর। বাংলাদেশের নৃত্য, সংগীত, চিত্রকলায় আদিবাসী শিল্পভুবনের অবদান অপরিসীম। বহু নাচের মুদ্রা, গানের সুর তাল, নাট্য পরিবেশন আঙ্গিক আদিবাসী পরিসর থেকে বিকশিত হয়েছে। সাঁওতালি বাদ্যযন্ত্র মাদল কিংবা মান্দি বাদ্যযন্ত্র আমবাঙ্গি ও খ্রাম ঢোল ও সানাই বাঁশিকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁতবস্ত্র ও বয়নশৈলীর ক্ষেত্রে বহু নকশা-মোটিফ বাঙালি তাঁতশিল্পে আত্তীকৃত হয়েছে। মন্দির বা টেম্পেল নকশা এবং কড়া উজ্জ্বল রঙের কনট্রাস্ট ব্যবহার বিশেষ করে মণিপুরি শাড়ি ও ইনাফির ডিজাইন থেকে বাংলা তাঁত-ফ্যাশনে যুক্ত হয়েছে। রাখাইনদের ভেতর মুন্ডি নামের একধরনের স্যুপি নুডলস খাবারের প্রচলন আছে, নুডলসকে ঝোল ঝোল স্যুপি করে খাবারের রেওয়াজ বহু আদিবাসীদের ভেতর আছে। বাঙালিরা মূলত শুকনো ঝরঝরে নুডলস খেলেও, স্যুপি নুডলসও এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী এলাকায় বাঙালিদের নুডলস এবং শুঁটকি রান্না খেয়াল করেছি। যেখানে স্থানীয় আদিবাসী রান্নার মিথস্ক্রিয়া দেখেছি। আবার আদিবাসী ছেলেমেয়েরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় বা পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছেড়ে বৃহত্তর বাঙালি এলাকায় থাকছেন এবং এমনকি কাজের প্রয়োজনে বাঙালিদের ভেতর থাকছেন, সেখানে বাঙালি রান্নার বহু কারিগরি ও উপকরণ আদিবাসীদের ভেতর আত্তীকৃত হচ্ছে। এ আদিবাসী ছেলে, মেয়ে ও তরুণেরা যখন নিজ বাড়ি ও গ্রামে যাচ্ছেন তখন একটা বাঙালি কায়দার রান্নাই অনেকের ক্ষেত্রে একটা সামাজিক পাতানো স্ট্যাটাস তৈরি করছে এবং দেখা যায় ধীরে ধীরে সেই রান্নার ধরন আরো বহু পরিবারে গৃহীত হচ্ছে। ঢাকার নর্দ্দা-কালাচাঁদপুর, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া এলাকায় ‘নয়াবসতি স্থাপনকারী (যদিও কোনো জবরদখল বা রাজনৈতিক অভিবাসন নয়, কাজের প্রয়োজনে ভাড়া বাসা/মেসে থাকা)’ আদিবাসীদের ক্ষেত্রে দেখেছি অনেকেই রান্নায় তেল ব্যবহার করছেন এবং বেশকিছু মসলা যেমন জিরা-ধনের গুঁড়া, পাঁচফোঁড়ন। আলু ভর্তা ও মুরগির মাংস রান্নার ক্ষেত্রে বাঙালি রান্নার ধরন প্রবলভাবে শহর এলাকার আদিবাসীদের ভেতর আত্তীকৃত হচ্ছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে খাসি এবং চা-বাগানের আদিবাসীরা পান-সুপারি খাওয়ার জন্য একধরনের দ্বিমুখী কৌটা ব্যবহার করে। একদিকে চুন এবং একদিকে তামাক পাতার গুঁড়া থাকে। এই দ্বিমুখী কৌটার প্রসার স্থানীয় বাঙালিদের ভেতর এত বেশি হয়েছে যে ধাতব টিনের কৌটার পরে এখন বাণিজ্যিকভাবে প্লাস্টিকের কৌটা তৈরি হচ্ছে। রামায়ণ ও মহাভারতের আখ্যান, চরিত্র এবং কাহিনীর বিস্তারের সঙ্গে আমি মান্দিদের দি-বান্দি, নুসি-দেমসি, আনাল-গুনাল, শেরানজিং কাহিনীর বহু মিল খুঁজে পাই। আদিবাসী সমাজ থেকে বহু লোকায়ত ভেষজ চিকিৎসাজ্ঞান এবং ভেষজ উপকরণ মূলধারার চিকিৎসা পরিসরে আত্তীকৃত হয়েছে। যদিও প্রায় ক্ষেত্রেই তথাকথিত গবেষণা এবং বায়াপ্রসপেক্টিংয়ের নামে মূলত ‘প্রাণডাকাতি’ এবং ‘মেধাস্বত্বের অধিকার’ লঙ্ঘিত হয়েছে।

প্রকৃতির দর্শন ও কলোনিয়াল লিগ্যাসি

বাংলাদেশে কিছু ‘সবজান্তা’ অতি শিল্পদরদি ‘উদ্যোক্তা’ আছেন। তারা আবার শহুরে এলিট। মূলত তারা মুনাফা-কাতর কারবারি। সৃজনশীলতা এবং হিউম্যানিস্ট স্ট্যাটাস হারাবে বলে একটা পাতানো ছদ্মবেশ ধরে থাকেন। আদিবাসী-বাঙালি গ্রামীণ প্রান্তিক শিল্পজীবনের প্রতি তারা অতি গদগদ হয়ে থাকেন। তাদের ভান ও ভণিতা সব উসকে ওঠে তাদের নিজেদের ‘শিল্প-উদ্যোগে’। তারা অবশ্য মনে করেন এইটা ‘ফিউশন’, তারা কোনো অবলা আদিবাসী শিল্পরে দয়া কইরা ‘জাতে’ তোলার চেষ্টা করছেন। আর এমনি কঠোর কঠিন প্রবল চেষ্টা, যা মূলত এক ঠগবাজি অন্যায় বাণিজ্যকেই কেবল সামনে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত করে তোলে। একটা রোমহর্ষক উদাহরণ টেনে শুরু করা যাক। মান্দিদের ঐতিহ্যগত পানীয় চু তৈরির জন্য একধরনের বিশেষ পবিত্র পাত্র ব্যবহার করা হয়। যাকে দেক্কা/দিক্কা বলে। সাংসারেক ধর্মবিশ্বাসীরা মনে করেন দিক্কায় জীবন প্রস্তুত হতে থাকে সর্বদা, আর তাই এটি জীবন্ত ও পবিত্র। এ পবিত্র পাত্রকে বহু বাঙালি দোকানদার ‘টেবিল ল্যাম্প’, ‘ল্যাম্প-শেড’ এমনকি ডাস্টবিন পর্যন্ত বানিয়ে বিক্রি করেছেন। কী অন্যায়, কী দুঃসাহস। কত কী হইছে। দকমান্দা, পাথিন, ইনাফি, পিনন জানালার পর্দা কিংবা টেবিল ম্যাট ও ডাইনিং টেবিলের রানার হইছে। নিওলিবারেল ক্ষমতায় এর নাম আবার ‘ভ্যালু এড’ এবং ফুটানি শিল্পে এরই নাম ‘ফিউশন’ কিংবা ‘কমিউনিটি আর্ট’। এমনকি বাঙালি শিল্পীরা প্রায় সর্বদা একটা স্টেরিওটাইপ ইমেজ খাড়া করান তাদের শিল্পকর্মে। যেমন আদিবাসী জনপদের যন্ত্রণা কিংবা প্রান্তিকতা বোঝাতে প্রায়ই ফং/রাও/তুইয়া (পাহাড়ি লাউয়ের খোল) নামক পাত্রে রক্তের দাগ কিংবা তাকে আগুনে পুড়িয়ে ক্ষতবিক্ষত করা। কিংবা মাথার দুমি, পাগড়ি, পালক, অলংকার পুড়িয়ে বা রক্তাক্ত করে ব্যবহার। অধিপতি বাঙালি শিল্প-মনন খুব উপরিতলের কিছু চিহ্ন ও ইমেজ থেকে ‘আদিবাসী ন্যারেটিভ’ দাঁড় করাতে চায়, যা একইভাবে ‘আদিবাসীদের নাক চ্যাপ্টা কিংবা তারা চ্যাং ব্যাং ভাষায় কথা বলে’ এমন কলোনিয়াল লিগ্যাসিকেই বৈধতা দেয়। জারি রাখে।

তবে বাংলাদেশের সর্বাধিক অক্সিজেন কারখানা এখনো বাঁচিয়ে রেখেছেন আদিবাসীরাই। সবচেয়ে প্রবীণ এবং দীর্ঘ ক্যানোপি এবং ঝোপালো অক্সিজেন কারখানাগুলো বেঁচেই আছে মূলত আদিবাসীদের জন্য। গাছকে ‘অক্সিজেন কারখানা’ বলাটাও, জানি, একটা একপেশে কলোনিয়াল দৃষ্টিভঙ্গি, প্রবল এথনোপোসেন্ট্রিক চিন্তা। যেন অক্সিজেন পয়দা করে মানুষসহ জীবজন্তুরে বাঁচাইয়া রাখা ছাড়া গাছের আর কোনো কাজ নাই। আমরা যে খাইয়া-দাইয়া-পইরা বাঁইচ্যা থাকি তার সবই গাছ জোগান দেয়। কোনো বেতন নেয় না। গাছের সঙ্গে আমাদের কোনো শর্ত, দস্তখত বা কারাগার নাই। যা হোক সিলেট, পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, বরেন্দ্র, উত্তরাঞ্চল, হাওর, সুন্দররবন বা সীমান্ত অঞ্চল এখনো বন-জঙ্গল, পাহাড় টিলা, গাছপালা বাঁচাইয়া রাখছে আদিবাসীরাই। বন-পাহাড়ে একটা কথা প্রচলিত যে যেখানেই আদিবাসী সেখানেই গাছ আর সেখানেই জঙ্গল। এখনো দেশের চা-বাগান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বাধিক বেশি পবিত্র কুঞ্জবন আছে, যা কেবল আদিবাসীরাই লোকায়ত প্রথা এবং ধর্মকৃত্যের মাধ্যমে সংরক্ষণ করছেন। দেশের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী আদিবাসী জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র এক ভাগ হলেও এই মাত্র এক ভাগই দেশের প্রায় আশি ভাগ প্রাকৃতিক বন, পাহাড়, টিলা, পাহাড়ি ছড়া ও প্রাণসম্পদ সংরক্ষণ করছেন। রাষ্ট্র, এজেন্সি বা নিওলিবারেল ক্ষমতা আদিবাসীদের এ দায়িত্ব দেয়নি। এটি আদিবাসী সমাজের প্রথাগত সংস্কৃতি, আত্মপরিচয়ের সীমানা। কিন্তু রাষ্ট্র, এজেন্সি ও নিওলিবারেল বাহাদুরি এ ঐতিহাসিক আত্মপরিচয় মানে না। তাই পাহাড় পাথর বন টিলা ঝিরি গাছপালা কেটে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করা হয়। প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষায় আদিবাসী জাতিসত্তাগুলোর (বাংলাদেশে ৫০ বা তার কমবেশি আদিবাসী জাতি আছেন) এ প্রথাগত বীক্ষাই ‘আদিবাসী প্রকৃতি-দর্শন’। বাঙালি জাত্যভিমান এ দর্শন চুরমার করছে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকেই, আবার একই সঙ্গে বলছে ‘আদিবাসীরা প্রকৃতি পূজারি’। এ কলোনিয়াল স্টেরিওটাইপ উদাহরণকে ব্যাখ্যা করে চলতি আলাপখানির শেষের দিকে যাওয়া যাক। যারা এ ন্যারেটিভ দেন, তারা প্রকৃতি-পূজা বলতে কী বোঝাতে চান তা অস্পষ্ট। তারা কখনো কোনোদিন আদিবাসী (জাতিসত্তা এবং ভৌগোলিক ও গোত্র ভিন্নতাসহ) জাতিগুলোর ‘প্রকৃতি-পূজা’ দেখেছেন কিনা সন্দেহ। আদিবাসীদের ভেতর মুসলিম আছেন। সনাতন হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, গুরুসত্য, বৈষ্ণব নানা ধর্মীয় তরিকার বিশ্বাসী মানুষজন আছেন। এত বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও আদিবাসীরা কেন বারবার মূলধারার ন্যারেটিভে ‘প্রকৃতি-পূজার’ নস্টালজিক রোমান্টিসিজমে বন্দি হবেন? নাকি এটা রাষ্ট্র ও এজেন্সির তরফ থেকে আরেক কাউন্টার হেজিমনি? ‘প্রকৃতি-পূজারি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা রেখে, কেন আদিবাসীরা প্রকৃতি-পূজা করতে পারছে না সেই অতিজরুরি মৌলিক রাজনৈতিক জিজ্ঞাসারে সবার সামনে হাজির রাখতে চায়? আদিবাসী সমাজে বিশাল বটগাছ, ডুমুর, তেঁতুল, অশ্বত্থ, শ্যাওড়া, ছাতিম, আগাচি, শাল, শিমূল, গিলা, বনাক, হিজল কত সহস্র গাছপালা, প্রাণী, পাথর, পানিপ্রবাহ পবিত্র হিসেবে পূজা করা হয়। প্রাণসত্তা ও বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ করা হয়। একটা মসজিদ বা মন্দির ভাঙলে আমরা কত উতলা হই, মিছিল করি, ন্যায়বিচার চাই। তাহলে আদিবাসীদের পূজার জায়গা ধর্মস্থল যখন উন্নয়ন বা বলপ্রয়োগ দিয়া বাঙালিরা দখল, লুণ্ঠন ও চুরমার করে তখন আমরা কেন নিশ্চুপ থাকি? তাহলে অধিপতি বিদ্যাজগৎ ‘প্রকৃতি-পূজারি’ হিসেবে আমাদের মনে আদিবাসীদের কী ইমেজ প্রতিষ্ঠা করাতে চায়?

আমরা সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান নিয়ে আলাপ শুরু করছিলাম। কিন্তু নিদারুণভাবে এতে বৈষম্য আর বলপ্রয়োগের ফিনকি ঢুকে গেল। আমরা একটা নয়া সম্ভাবনা দেখতেছি। বহু তরুণ ছেলে-মেয়েরা বন-পাহাড়-জঙ্গলে আদিবাসী এলাকায় ঘুরতে যাইতেছে প্রতিদিন। তারা ক্যাম্প করতেছে, ব্লগ-ভ্লগ বানাইতেছে। কিছুটা হলেও তাদের সঙ্গে আদিবাসী জীবনসংগ্রামের সাক্ষাৎ ঘটতেছে। এই বৃহত্তর নতুন প্রজন্মের তরুণ বাঙালি সমাজের মনে আদিবাসী জীবনজগৎ নিয়া এক আলাদা ন্যারেটিভ তৈরি হইতেছে। এরা কখনই পাঠ্যপুস্তকে লিখবে না, ‘সাঁওতালদের প্রধান খাদ্য হলো ভাত, পিঁপড়া ও মদ’। আদিবাসী-বাঙালি নতুন প্রজন্মের ভেতর দিয়ে বিকশিত হবে নতুন সমাজ। যে সমাজ আদিবাসী-বাঙালি সাংস্কৃতিক বিনিময়কে একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও প্রতিবেশগত বিকাশমানতা হিসেবে পাঠ করবে। জারি রাখার জন্য লড়বে। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আমরা দেখেছি দেশব্যাপী গ্রাফিতিতে জনআকাঙ্ক্ষার বয়ান। আদিবাসী-বাঙালি বহুত্ববাদ এবং সাংস্কৃতিক ইনক্লুসন। আবার আমরা গ্রাফিতির বিরুদ্ধে সেই কলোনিয়াল কর্তৃত্ববাদী হামলাও দেখেছি। কিন্তু হামলা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। জনআকাঙ্ক্ষাই জয়ী হয়েছে। জনতার আকাঙ্ক্ষা ও আখ্যানের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষার ভেতর দিয়েই আমরা সাংস্কৃতিক বিনিময়ের একটা হারানো সূত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারি। আমি প্রস্তুত, আমরা প্রস্তুত। আপনি প্রস্তুত তো?

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক