স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস সংস্কার নিয়ে বহু আলোচনা, কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠিত হয়েছে। সুপারিশের অভাব নেই। কিন্তু সিভিল সার্ভিসে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার প্রশাসনকে আধুনিক, দক্ষ ও জনমুখী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই লক্ষ্যে গঠিত হয়েছে অন্তত ২০টি সংস্কার কমিশন ও টাস্কফোর্স। নিয়োগ ব্যবস্থা, পদোন্নতি নীতি, প্রশাসনিক কাঠামো, বিকেন্দ্রীকরণ ও সেবার মানোন্নয়ন—সব বিষয়েই এসেছে বিশদ সুপারিশ। কিন্তু বাস্তবে এসব উদ্যোগের বড় অংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকেছে। নিয়মিতভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে মূলত পে-কমিশনের সুপারিশ। এ পর্যন্ত আটটি পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। সর্বশেষ নবম পে-কমিশন বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেও তা এখনো কার্যকর হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেতন বৃদ্ধি ও দুর্নীতি কমার মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। ২০১৫ সালে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার সময় সরকারি কর্মচারীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তখন আশা করা হয়েছিল, এতে সরকারি কর্মচারীদের ঘুস, দুর্নীতি ও অনিয়ম কমবে। কিন্তু গত এক দশকেই সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তার সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। দুর্নীতি বন্ধে তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
কোনো রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠান হলো রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র। রাজনৈতিক নেতারা সৎ, শুদ্ধাচারী, জনবান্ধব, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল হলে এবং আমলাতন্ত্রের সদস্যরা মেধাবী, দক্ষ, সৎ, কর্মযোগী, সাহসী, সেবাবান্ধব ও সিদ্ধান্ত প্রদানে চৌকস হলে রাষ্ট্র সামনে হাঁটে। রাজনীতিক ও আমলাদের উদ্দেশ্য অসৎ হলে এবং জবাবদিহিতা না থাকলে রাষ্ট্রের পক্ষে সঠিক পথে হাঁটা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের কোনোটাকেই সঠিক পথ দেখানো যায়নি। তখন আমাদের রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল উদার গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আমলাদের হওয়ার কথা ছিল প্রজ্ঞাসম্পন্ন, চৌকস, সেবাবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক। কিন্তু রাজনীতিকে এক ব্যক্তিবাদী এবং আমলাতন্ত্রকে মেধাবিরোধী ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফেলে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতিবিদরা আমলাতন্ত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। এ সুযোগকে কিছু আমলা ব্যক্তিস্বার্থে কাজে লাগিয়েছে। আমলারাও রাজনীতিবিদের ব্যবহার করেছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা আমলাদের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করবে না এবং আমলাদের দক্ষ, সৎ ও পেশাদার সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পদেক্ষপ নেয়া হবে।
সিভিল সার্ভিস সংস্কারের লক্ষ্যে সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠিত হয় এবং সেই কমিশন ২০৮টি সুপারিশসহ সরকারের কাছে প্রতিবেদন পেশ করে। তবে সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। এর মধ্যে আশু বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ১৮টি সুপারিশ। পরে তার মধ্য থেকে অপেক্ষাকৃত সহজে বাস্তবায়নযোগ্য আটটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু এর মধ্যে মাত্র তিনটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। দেশের জনপ্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংকটে জর্জরিত। বিশেষ করে বিগত দেড় দশকের শাসনামলে এর অতিমাত্রায় রাজনৈতিকীকরণের ফলে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, তাতে জনগণের সেবাদানে এর কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সেই সঙ্গে এ সিভিল সার্ভিসের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তীব্র হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এ সরকারের একটি ব্রত হলো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জনবান্ধব সংস্কার সাধন করা। এমন প্রেক্ষাপটে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও গঠন করেছিল। জনপ্রশাসনকে গতিশীল করতে সংস্কার কমিশনের দেয়া প্রতিবেদনের ইতিবাচক সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে দ্রুত দৃশ্যমান বা কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
জনপ্রশাসনে পেশাদারত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দ্রুত সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে জোর দেয়া উচিত ছিল। যদিও এখন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। আগামী নির্বাচিত সরকারকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের মতোই মাথাভারী প্রশাসন (যেখানে শীর্ষ পর্যায়ে অতিরিক্ত জনবল আর নিচের দিকের পদগুলোয় লোকবল ঘাটতি), পুরনো আমলাদের ওপর নির্ভরতা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আধিক্য ও সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এতে বিশৃঙ্খলা আরো বাড়ছে, কাজেও এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতে জনপ্রশাসন সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক। জনপ্রশাসনের কার্যকারিতা শুধু রাষ্ট্রের ভিতকে মজবুত করে না, বরং নাগরিকদের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতাও নিশ্চিত করে। একটি দলীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত, পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন কখনই জনগণের সেবা নিশ্চিত করতে পারে না, যা বিগত বিভিন্ন সরকারের শাসনামলে দেখা গেছে। তাই জনপ্রশাসন সংস্কার কেবল প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারের বিষয় নয়, এটি গণতন্ত্র ও সুশাসনের ভিতকেও মজবুত করবে। গণতান্ত্রিক ধারার পুনরুদ্ধার ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতিতে আগামীতে যে সরকার দায়িত্ব নেবে তাদের কাছে প্রত্যাশা সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব না করে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। জনপ্রশাসনের মতো জায়গায় যাচাই-বাছাই করে নিয়োগ দেয়া হবে, পদায়ন করা ও ভারসাম্য বজায় রাখা হবে—সেটিই কাম্য। সরকারকে এদিকে মনোযোগ দিতে হবে। জনপ্রশাসনের কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট থাকা প্রয়োজন।
সিভিল সার্ভিস সংস্কারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি সামরিক ও বেসামরিক সরকারই সময়োপযোগী কিছু প্রস্তাব পেয়েছিল। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে একক ও শ্রেণীহীন গ্রেডিং কাঠামো, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও আধুনিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সুপারিশ এসেছিল। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলেও প্রশাসন পুনর্গঠন, মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমানো, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও সিভিল সার্ভিস ডাউনসাইজিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘মুভিং অ্যাহেড’ কৌশলগত দলিল কিংবা আকবর আলি খানের নেতৃত্বাধীন রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনের সুপারিশগুলোও ছিল সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী। সেসব প্রস্তাব সময়োপযোগী হলেও বেশির ভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আমলাদের বিরোধিতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের প্রবণতায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগেই থেমে গেছে। মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমার বদলে সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে বেড়েছে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সরকারি কর্মচারীদের যোগ্যতা ও সততার ভিত্তিতে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। এসব নিশ্চিত না হলে বেতন যতই বাড়ানো হোক দুর্নীতি, ঘুস ও অনিয়ম কমবে না। সুতরাং দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে সরকারি কর্মচারীদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রশাসনকে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি প্রশাসনকে নিজেদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তবে কখনই প্রশাসন দুর্নীতিমুক্ত হবে না। বরং দুর্নীতি আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। মানুষকে সিস্টেমে আনা, ভালো কাজের স্বীকৃতি দেয়া, দুর্নীতি ও অনিয়মের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এ চার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েই হতে পারে কার্যকর সিভিল সার্ভিস সংস্কার।










