২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অর্থনীতিতে একটি ঐতিহাসিক বাঁক তৈরি করেছে। বহু বছর ধরে চলে আসা আর্থসামাজিক বৈষম্য, মজুরির অসামঞ্জস্য এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার খরচের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন মানুষকে ন্যায্যতা, জবাবদিহিতা এবং অংশীদারত্বের সমৃদ্ধির জন্য ঐক্যবদ্ধ করেছিল। বিদ্রোহের ফলে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এমন একটি প্রশাসন এসেছে যা অবিচার-বৈষ্যম্য দূর করে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি স্থাপনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

এ প্রেক্ষাপটে সিটি ব্যাংক বাংলাদেশের কর্মচারীদের মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামলাতে মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত একটি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে প্রতীয়মান। এটি কেবল কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় একটি দৃষ্টান্তই নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব পালনের প্রতিফলন। তবে সরকারি-বেসরকারি এবং ব্যষ্টিক-সামষ্টিক পর্যায়ে সমন্বিত না হলে এ রকম অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষাপটে মজুরি বাড়ানোর বৃহত্তর সামষ্টিক অর্থনীতিতে জটিল প্রভাব ফেলতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলার জন্য যখন নতুন নীতিমালা তৈরি হচ্ছে, তখন করপোরেট সিদ্ধান্তগুলো দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং এ ক্রান্তিলগ্নে ব্যষ্টিক পর্যায়ে হলেও ব্যাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মজীবীদের প্রয়োজন এবং কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবে এটাই স্বাভাবিক।

অভ্যুত্থান ও করপোরেট জবাবদিহির পুনর্মূল্যায়ন: ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান যেসব সিস্টেমিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল, তার মধ্যে দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যমুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য ছিল, তেমনি ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ ছিল মূলত মজুরির বৈষম্য, আয়ের অসম বণ্টন এবং একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের জিনি সহগ (কোএফিসিয়েন্ট), যা আয়ের বৈষম্য পরিমাপ করে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ০.৪৮-এ পৌঁছে যায়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। উল্লেখ্য এই সহগ যত বড় হয়, তা অধিকতর বৈষম্যের মাত্রা নির্দেশ করে। এ বৈষম্যের সবচেয়ে কষ্টদায়ক উদাহরণ ছিল তৈরি পোশাক শিল্পে, যেখানে শ্রমিকরা মাসে মাত্র ১০ হাজার ৪০০ টাকা উপার্জন করলেও কারখানার মালিকরা লাখ-কোটি টাকার সম্পদ তৈরি করছেন।

এমন একটি পটভূমিতে সিটি ব্যাংকের মজুরি সমন্বয় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি কর্মচারীদের সুরক্ষা প্রদান এবং তাদের প্রয়োজনীয়তা মেটানোর এক আন্তরিক প্রচেষ্টা। এ ধরনের পদক্ষেপ সরকারের ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য আকাঙ্ক্ষিত সংস্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং চেতনাকে প্রতিফলিত করে। এটি দেখায় যে বাংলাদেশে করপোরেট চর্চার নতুন মানদণ্ড তৈরি হচ্ছে এবং অন্যান্য আরো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের সমন্বিত ধারায় এগিয়ে এলে বড় রকমের ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে।

মজুরি বৃদ্ধি দায়িত্বশীল করপোরেট সিদ্ধান্ত: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মুদ্রাস্ফীতি ৯ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অসহনীয় করে তোলে। চাল, ভোজ্যতেল এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বছরে মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যায়, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মজুরি স্থবিরতা এ সংকটকে আরো গভীর করে তোলে এবং কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এ রকম মুদ্রাস্ফীতির কারণে জনগণের, বিশেষ করে নিম্নমধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য জীবনটা দুঃসহ হয়ে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে সিটি ব্যাংকের মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে শুধু দায়িত্বশীল করপোরেট আচরণই নয়, বরং একটি সময়োপযোগী প্রয়োজন হিসেবে দেখা যায়। এটি কর্মীদের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করতে সহায়ক এবং একই সঙ্গে সংস্থার ভেতরে আস্থা ও আনুগত্য বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ। সিটিব্যাংকের সিদ্ধান্তের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, মজুরি বৃদ্ধি আনুপাতিক দিক থেকে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এ সুবিধা যারা পাবে তাদের মধ্যে সব সংশ্লিষ্ট জনশক্তি (নিয়মিত, চুক্তিভিত্তিক, আউটসোর্সড, এমনকি ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণার্থী) অন্তর্ভুক্ত।

সিটি ব্যাংকের বেতন বৃদ্ধির পদক্ষেপটি এ তাৎক্ষণিক প্রয়োজনটি পূরণ করে, যা কর্মীদের মুদ্রাস্ফীতির কঠিন প্রভাব থেকে রক্ষা করে। বিশ্বব্যাপী অনুরূপ উদাহরণের মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মুদ্রাস্ফীতির চাপে অ্যামাজনের বেতন বৃদ্ধি, যা কর্মীদের আর্থিক চাপ কমানোর লক্ষ্য নিয়েছিল। এমন পদক্ষেপ কেবল আর্থিক সুরাহাই নয়, বরং কর্মীদের আস্থা ও আনুগত্যও বৃদ্ধি করে, যা কঠিন সময়ে ব্যবসার কর্মক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যতের করপোরেট লক্ষ্য অভ্যন্তরীণ বৈষম্য হ্রাস: বিদ্রোহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে আয়বৈষম্য হ্রাসের দাবি। বাংলাদেশের বেশির ভাগ করপোরেশনে শীর্ষ নির্বাহীদের জন্য বিশাল বেতন-ভাতার ব্যবধান কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষের প্রধান কারণ।

এক্ষেত্রে সিটি ব্যাংকের মজুরি সমন্বয় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে এ পদক্ষেপ যেন একটি দীর্ঘমেয়াদি ন্যায়সংগত মজুরি কাঠামোর অংশ হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ইউনিলিভার ও ড্যানোনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের ন্যায্য মজুরি প্রদানের ক্ষেত্রে যে উদাহরণ তৈরি করেছে, তা অনুসরণযোগ্য। ইউনিলিভার যেমন তাদের কর্মচারীদের লিভিং মজুরি নিশ্চিত করেছে, তেমনি ড্যানোন শীর্ষ নির্বাহীদের বেতন সীমিত করার মাধ্যমে বৈষম্য হ্রাসে ভূমিকা রেখেছে।

ক্ষুদ্র বা ব্যষ্টিক নীতির প্রভাব বনাম সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: যদিও মজুরি বৃদ্ধি কর্মচারীদের জন্য তাৎক্ষণিক উপকার বয়ে আনে, এটি বৃহত্তর অর্থনীতিতে একটি চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করে। উচ্চ মজুরি মানে উচ্চ ব্যয়, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে অথবা মুদ্রাস্ফীতিকেই স্থিতিশীল করতে পারে। বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি অনেকটাই কাঠামোগত সমস্যার কারণে হয়, যেমন সরবরাহ চেইনের অকার্যকারিতা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং দুর্বল বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার এরই মধ্যে দুর্নীতি হ্রাস, বাজার দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে কাঠামোগত সমস্যার সমাধানের পরিকল্পনা করেছে। তবে করপোরেশনগুলো শুধু লক্ষণগুলো মোকাবেলা করতে পারে, কারণ মূল সমস্যাগুলো সমাধানে তাদের যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

করপোরেট নেতৃত্ব ও সামাজিক দায়িত্ব: বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। সিটি ব্যাংকের মজুরি নীতি এর একটি উদাহরণ, কিন্তু এর সঙ্গে কর্মচারীদের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে বিনিয়োগও প্রয়োজন। সেই সঙ্গে অ-আর্থিক সুবিধা, যেমন কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং কর্মস্থলে কর্মজীবীদের জন্য কল্যাণমুখী নীতিমালা এ দায়িত্ববোধকে আরো সুসংহত করতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবে গুগলের কর্মচারী কল্যাণ কর্মসূচি এবং সেলসফোর্সের শিক্ষাসহায়তা উদ্যোগ করপোরেট নেতৃত্বের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জন্য এমন নীতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পে, যেখানে প্রত্যক্ষ মজুরি বৃদ্ধি প্রায়ই ব্যয়-সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাফল্যের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুদ্রাস্ফীতি ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সংযুক্ত একটি ন্যায্য মজুরি সূচক প্রবর্তন করলে করপোরেট বেতন নীতিগুলো মানসম্মত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী আইন কার্যকর করা এবং করপোরেট স্বচ্ছতা বাড়ানো একটি বিভক্ত সমাজে জনসাধারণের বিশ্বাস ও আস্থা পুনর্গঠনের জন্য অত্যাবশ্যক।

ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার নীতিমালার প্রতি জোর দেয়া টেকসই অর্থনৈতিক চর্চার একটি দিকনির্দেশনা প্রদান করে। সামাজিক ব্যবসা, যা মুনাফা সর্বাধিকীকরণের পরিবর্তে সামাজিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়, ঐতিহ্যবাহী করপোরেশনগুলোকে আরো ন্যায্য মডেল গ্রহণে অনুপ্রাণিত করতে পারে। সিটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এ নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, যা অন্যদের জন্য একটি উদাহরণ স্থাপন করেছে।

সমষ্টিগত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা: সিটি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পদক্ষেপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ব্যবসাগুলো সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়তে, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে কাজ করতে হবে।

একটি প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার প্রবর্তন, শ্রমিক অধিকারের উন্নয়ন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগের মাধ্যমে সমাজের বৈষম্য দূর করা সম্ভব। একই সঙ্গে করপোরেশনগুলোকে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা ও অংশীদারত্বের নীতিগুলোকে তাদের চর্চার অংশ করতে হবে।

তাই সিটি ব্যাংকের মজুরি সমন্বয় অভ্যুত্থান-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি শুধু একটি সংবেদনশীল করপোরেট সিদ্ধান্ত নয়, বরং কর্মচারীদের প্রতি একটি দায়িত্বশীল অঙ্গীকার। আরো অনেক ভালো ভালো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারাও কি এগিয়ে আসবে? জাতি তো তাই আশা করে এবং এ রকম নীতি বা স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে দেশের যেমন উন্নতি হয়, সে উন্নতি আসে ব্যবসা-বাণিজ্য খাতের সমৃদ্ধির মাধ্যমেই।

তবে এটি সমন্বিতভাবে একটি বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেও দৃষ্টি দেয়। সরকারের কার্যকর নীতি এবং করপোরেট নেতৃত্বের যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যৎ গড়তে সক্ষম হবে। এ সংকটময় সময়ে করপোরেশনগুলো নেতৃত্ব প্রদানের যে উদাহরণ তৈরি করছে, তা দেশের জন্য একটি টেকসই উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।

ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি বিভাগ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি