২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সময় থেকে ফ্যাসিবাদ শব্দটা প্রায় সবার কাছেই পরিচিতি পেয়েছে। আওয়ামী লীগকে একটা ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে একটা সমস্যা হয়েছে। তা হলো আওয়ামী লীগ যা করেছে, মানুষ সেটাকেই ফ্যাসিবাদ বলে ভাবতে শুরু করেছে। যেমন ঘুস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ভোট ডাকাতি—এ সবকিছুকেই সাধারণ মানুষ মোটা দাগে ফ্যাসিবাদ বলে ধরে নিয়েছে। সেই সুযোগে অনেকে বলার চেষ্টা করেছে, এমন কাজ তো এর আগেও কিছু দল করেছে। কাজেই তারাও ফ্যাসিবাদী দল। কিন্তু এসব কাজই কি আসলে ফ্যাসিবাদ? ফ্যাসিবাদ বলতে কী বোঝায়?

আমাদের দেশের বামপন্থী রাজনীতিবিদদের কাছেই ফ্যাসিবাদ শব্দটা বেশি শুনেছি। কারণ বামপন্থীদের সঙ্গেই ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক ও দার্শনিক দ্বন্দ্ব সবচেয়ে বেশি ছিল। অথচ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই বামদেরই একটা বড় অংশ ফ্যাসিবাদের দোসর হয়েছে। কমিউনিজম আদতে একটি আন্তর্জাতিক মতবাদ, অর্থাৎ দেশের সীমাকে অতিক্রম করে সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করা ছিল এর উদ্দেশ্য। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদ একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী মতবাদ। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জাতীয়তাবাদের নিবিড় সম্পর্ক থাকায় এবং সেখানে মস্কোপন্থী বামপন্থীদের ঘনিষ্ঠ অংশগ্রহণ থাকায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশেও তাদের বড় অংশকে আমরা ফ্যাসিবাদের অংশীদার হিসেবে দেখতে পেয়েছি।

ফ্যাসিবাদ শব্দটির উৎপত্তি মূলত ইতালি থেকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯১৯ সালে বেনিতো মুসোলিনি ইতালিতে ফাসচো দি কমবাত্তিমেন্তো (Fasci di Combattimento) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন, যা পরবর্তী সময়ে ১৯২২ সালে ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে পরিণত হয় এবং ইতালি ফ্যাসিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা হয়। মুসোলিনিই প্রথম ফ্যাসিবাদী শাসক। মুসোলিনির শাসনের আদর্শ ও প্রভাবেই পরে জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি পার্টি, স্পেনে ফ্রাংকোর শাসন ইত্যাদিতে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ ছড়িয়ে পড়ে।

‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ ‘ফাসেস’ থেকে। ফাসেস ছিল প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে ব্যবহৃত একটি গুচ্ছ কাঠি, যার চারপাশে কুড়াল বাঁধা থাকত। এটি শক্তি, ঐক্য এবং কর্তৃত্বের প্রতীক ছিল। মুসোলিনি এ প্রতীককে নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শের চিহ্ন হিসেবে গ্রহণ করেন, যাতে বোঝানো হয়—ব্যক্তির বদলে সমষ্টিগত একতা ও কর্তৃত্ব। এখান থেকেই ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দের উৎপত্তি।

ফ্যাসিবাদ বলতে প্রধানত এমন একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ বোঝায়, যেখানে দলের আদর্শ ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর স্থান পায়, একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্ব, চরম জাতীয়তাবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বিরোধী দল দমন এবং সামাজিক বা রাজনৈতিক বিরুদ্ধতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফ্যাসিবাদ সাধারণত জাতিগত পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব দেয় এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করে।

ফ্যাসিবাদের উল্লিখিত সংজ্ঞা বা বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকালেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এ মিল কাকতালীয়ভাবে দেখা দেয়নি, বরং আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান যখন স্বাধীন হয়েছিল, সেটাও এ অঞ্চলের মানুষ আশা ও উদ্দীপনার সঙ্গে উদযাপন করেছিল। আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি সেই আবেগের বিপরীতে এক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আবেগ জনমানসে সঞ্চার করে। এর জন্য তারা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতের মানুষকে মোক্ষমভাবে কাজে লাগায়। ধীরে ধীরে এ মনোভাব এ দেশের মানুষের মনে শেকড় গাড়তে শুরু করলে মানুষকে এক যুদ্ধংদেহী আদর্শে দীক্ষিত করার প্রয়োজন পড়ে। এছাড়া যে দেশ স্বাধীন করার উপায় ছিল না! আর এমন যুদ্ধংদেহী আদর্শ, যা আবার জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সংযুক্ত, তা কেবল ফ্যাসিবাদ নামক মতবাদের দ্বারাই সম্ভব। তাই আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সঙ্গে ফ্যাসিবাদী আদর্শের সংযোগ অনেকটা দুধ ও পানির মতোই অবিভাজ্য।

তবে আওয়ামী লীগের সব কাজ বা বৈশিষ্ট্যই ফ্যাসিবাদ নয়। এমন অনেক কাজ আওয়ামী লীগ করেছে যা অত্যন্ত গর্হিত, তা সত্ত্বেও সেসব কাজ ফ্যাসিবাদ নয়। যেমন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অর্থ পাচার, বিদেশী শক্তির তাঁবেদারি—এমন অনেক ক্ষতিকর কাজের উদাহরণ দেয়া যায় যেগুলোকে সরাসরি ফ্যাসিবাদ বলা যায় না। এসব কাজ রাষ্ট্রের দুর্বলতার সুযোগে তারা সংঘটিত করেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, নিজ আদর্শের স্বার্থে বিরোধী মতকে দমন করা, ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করে দলকে দেশের ওপরে স্থান দেয়া, অত্যাচার বা বল প্রয়োগ করা। আওয়ামী লীগের এ ধরনের কাজগুলো, যেমন ভুয়া নির্বাচন, দলীয়করণ, গুম, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর জুলুম, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ ইত্যাদিকে ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে।

আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার আগেও দেশে নানা দল শাসন করেছে। দেশের শাসন কাঠামো এবং সমাজ কাঠামোতে ত্রুটি থাকায় সেসব দলও যে সুশাসন উপহার দিতে পেরেছে তা নয়। কিন্তু সেসব দলকে হরে দরে ফ্যাসিবাদী বলা চলে না। বিশেষ করে তাদের দুর্নীতি ও অপশাসনকে তো নয়ই। বিএনপির কথাই ধরা যাক। বিভিন্ন সময়, বিশেষ করে ১৯৯০-এর পর, দেশের ক্ষমতা পেয়ে তারা বিদ্যমান দুর্বল রাষ্ট্র কাঠামোর সুযোগ গ্রহণ করেছে। নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়েও তারা বিভিন্ন সময় অপরাজনীতি করেছে। কিন্তু গায়ের জোরে, শতসহস্র মানুষকে হত্যা করে হলেও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার প্রবৃত্তি তাদের কখনো হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং জানমালের ক্ষতি হবে এ আশঙ্কায় তারা তড়িঘড়ি করে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নিজেরাই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এর মূল কারণ হলো, দলটির নানা ত্রুটি থাকতে পারে, তবে দলটি আওয়ামী লীগের মতো ফ্যাসিবাদী চরিত্রের নয়।

এবার দেখা যাক, সমসাময়িক কোন কোন দলের কোন কর্মকাণ্ডগুলো ফ্যাসিবাদের লক্ষণ প্রকাশ করে। আবারো মিলিয়ে দেখা যাক ওপরে বর্ণিত ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে। কোন দলের মধ্যে সমষ্টিগত একতার আধিক্য দেখা যায়? অনেকে বলতে পারেন, দলের মধ্যে একতা থাকাটা তো ভালো। সেটা ওই দলের জন্য ভালো হতে পারে, কিন্তু তা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে। যেমন ধরুন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার নাগরিকের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। আর সেই চাকরি পাওয়ার অধিকারী হবে দেশের যোগ্য নাগরিক। এখন যদি একটা রাজনৈতিক দল পরিকল্পিতভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং সেখানে নিজ দলের সদস্যদের অগ্রাধিকার দেয়, আপাতদৃষ্টিতে তা ভালো মনে হলেও এটা রাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে। যে রাষ্ট্রে এমন দল থাকে, সেই দল রাষ্ট্রের চেয়েও শক্তিশালী একটা কাল্টে পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন দলকে বহিরঙ্গে যতই ভালো দেখাক, তাকে গণতন্ত্রের লেবাস পরা ফ্যাসিবাদী দল, অন্তত ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনাযুক্ত দল বলে সন্দেহ করার কারণ আছে।

আবার ধরুন, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখন একটা দল যদি মব সংস্কৃতিকে নিজের ডিএনএতে ধারণ করে, তার পক্ষেও ফ্যাসিবাদে পরিণত হওয়ার শক্ত আশঙ্কা থেকে যায়। এ দলগুলো নিজেরা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেও দেশকে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি থেকে মুক্ত করতে পারে না, কিন্তু আশা করে অন্য একটি দল তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণ করবে। এমন প্রত্যাশা তারা করতে পারে, কারণ তাদের চিন্তা-চেতনায় রাষ্ট্রকে অতিক্রম করে যাওয়াটাকে স্বাভাবিকীকরণের ত্রুটিপূর্ণ জিন রয়েছে। জেনেটিক মিউটেশন মাঝে মাঝে অনেক বিস্ময় আমাদের সামনে এনে উপস্থাপন করে। গণপ্রত্যাশার জঠরে জন্ম নেয়া কোনো দলের এমন মিউটেশন বা ত্রুটিপূর্ণ বিকাশ অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও অসম্ভব নয়।

যেসব দল পরিচয়বাদী রাজনীতি করে, তাদের পক্ষে ফ্যাসিবাদে স্লাইড-ইন করাটা সহজ ও সম্ভাবনাময়। সেটা যেমন হতে পারে আওয়ামী লীগের মতো জাতিগত পরিচয়, তেমনই হতে পারে ধর্মীয় পরিচয়। ভারতীয় জনতা পার্টিকে পরিচয়বাদী রাজনীতির সূত্রে ফ্যাসিবাদী ভাবধারা ধারণের নিকট উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। নিজেকে প্রশ্ন করুন, বাংলাদেশে এমন পরিচয়বাদী রাজনীতি কারা করছে? জানবেন, তাদেরই ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনরঞ্জনবাদী রাজনীতিকেও আজকাল ফ্যাসিবাদের পূর্বগামী হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইতালির জিওরজিয়া মেলোনি, হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবান, ব্রাজিলের জাইর বোলসোনারো, ফ্রান্সের মারিন ল্যো পেন, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পও জনরঞ্জনবাদী রাজনীতির সূত্রে ফ্যাসিবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত। তাদের অভিবাসনবিরোধী, জাতীয়তাবাদী (ধর্মীয় অথবা জাতিগত), প্রতিষ্ঠানবিরোধী, সংখ্যালঘু বিদ্বেষী (বাংলাদেশে মিলিয়ে দেখুন হিন্দু ও মাজারপন্থীদের ওপর হামলা), গণতন্ত্রের বিপরীতে ব্যক্তিপূজা (বাংলাদেশে মিলিয়ে দেখুন প্রফেসর ইউনূসকে পাঁচ বছর রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া, নির্বাচন বিরোধিতা)—ইত্যাদি অবস্থান ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এ কারণে সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের নজর রাখতে হবে কোন কোন দলের মধ্যে পরিচয়াদী রাজনীতি কিংবা জনরঞ্জনবাদী রাজনীতি করার প্রবণতা রয়েছে। এসব দলেরই কালক্রমে ফ্যাসিবাদী দলে পর্যবসিত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি আমরা দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসের ইতিহাস আছে এমন দলকে প্রশ্রয় দেব? আমরা কি এমন দলকে সমর্থন দেব যাদের নিজের দলের কর্মীদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই? উত্তর হলো দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক দলের কাজ নয়। যেমন কাজ নয় দলের সদস্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা কিংবা মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়া। দল হলো একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে সমাজের নানা বৈচিত্র্যের মানুষের সমাবেশ ঘটে। তারা একত্র হয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু রাজনৈতিক দল কোনো সাধুসংঘ কিংবা সৎকর্মশীলদের আশ্রম নয়, অবশ্য ক্রিমিনাল গ্যাংও সে নয়। একটা সমাজে ভালো-মন্দ মিলিয়ে জনমানুষের যে বিন্যাস থাকে, সুস্থ একটা রাজনৈতিক দলে পরিসংখ্যানের স্বাভাবিক বণ্টন বক্ররেখা অনুযায়ী তেমনই সদস্য-বিন্যাস থাকে।

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কী এবং রাষ্ট্র ও দলের মাঝে প্রভেদরেখা কী? দলকে একজন সিইওর সঙ্গে তুলনা করতে পারেন যেকোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। পার্থক্য একটা আছে, তা হলো সিইও একজন ব্যক্তি। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল একটা দল। এভাবে ভাবতে পারেন, এটা একজন সিইওর প্রতি অনুগত মানুষদের দল যারা সিইওর প্রতি আস্থা রেখে, তার দেখানো পথে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে প্রস্তুত। রাষ্ট্রের একটা প্রশাসনিক বিভাগ আছে যারা স্থায়ী ও অরাজনৈতিক। কিন্তু নির্বাচনের মাধ্যমে যে দল ক্ষমতা গ্রহণ করে, তারা প্রশাসনকে নীতি বা পলিসিগত নির্দেশনা প্রদান করে। দলের পক্ষ থেকে মূলত নির্বাহী বিভাগ গঠন করা হয়, যারা এ কাজ করে থাকে। নির্বাহী বিভাগে থাকেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ। বাংলাদেশের মতো ওয়েস্টমিনস্টার ডেমোক্রেসিতে প্রধানমন্ত্রীই হলেন সেই সিইও, যার একটা অনুগত দলীয় কাঠামো থাকে। এ কাঠামো যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়, তখন তাদের দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণে কাজ করার কথা। কিন্তু ফ্যাসিবাদী দলগুলোর কাছে নিজেদের দল এতটাই প্রিয়, এতটাই আপস-অযোগ্য যে তারা দলকে দেশের ওপর স্থান দেয়। এভাবে আওয়ামী লীগের মতো কাঠামো তৈরি হয়, যাকে গণ-অভ্যুত্থান ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। চিন্তা করে দেখুন তো, এমন দল আর কোনটা আছে যা দলের সদস্যদের কাছে প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রত্যাশা করে এবং দলের সদস্যরাও মরণপণ শপথ নিয়ে দলীয় আদর্শ মেনে চলে। একটা পরাধীন দেশে এমন মিলিট্যান্ট আনুগত্যের প্রয়োজন আছে দেশকে সামরিক উপায়ে স্বাধীন করার জন্য। কিন্তু একটা স্বাধীন দেশে এমন দলের অস্তিত্ব গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে, দেশের ভবিষ্যৎকে নষ্ট করে, রক্তপাতবিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরকে অসম্ভব করে তোলে। এমন শাসনকেই আমরা বলি ফ্যাসিবাদী শাসন।

এমন প্রশ্নহীন আনুগত্য মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কেড়ে নেয়। সে তার সব এজেন্সি রাষ্ট্রের ওপর নয় বরং দলের ওপর ন্যস্ত করে দেয়। ফলে দল যা বলে তাই তার কাছে সঠিক বলে মনে হয়। এখানে মানবিক ন্যায্যতার প্রশ্ন অবান্তর হয়ে ওঠে। এ কারণেই আমরা দেখি, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে গুম-খুন করে এবং মাত্র এক মাসে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করার পরও আওয়ামী লীগের সমর্থকের মাঝে কোনো অনুশোচনা নেই। থাকবে কেন? তারা তো ব্যক্তিগত ন্যয়বোধকে দলের কাছে জিম্মা রেখেছে। এমন অনুতাপহীনতা আর কোন দলের মাঝে দেখা যায়, চিন্তা করে বলুন তো? জামায়াতে ইসলামী কি আজ পর্যন্ত তাদের ১৯৭১ সালের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়েছে বা প্রকৃত ক্ষমা চেয়েছে?

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সবলের অত্যাচার থেকে দুর্বলকে রক্ষা করা। রুশোর সোশ্যাল কনট্রাক্ট গ্রন্থে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষ হিসেবে জন্ম থেকে আমাদের যে পূর্ণ স্বাধীনতা, রাষ্ট্রের কাছে আমরা তার কিয়দংশ জিম্মা রাখি এ প্রত্যাশা থেকে যে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র আমাদেরকে সবলের অত্যাচার থেকে রক্ষা করবে। যে ‘পাবলিক গুড’ অন্য কেউ জোগান দেবে না, রাষ্ট্র তার জোগান দেবে, যেমন প্রাথমিক স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা, নির্মল পরিবেশ, নিরাপত্তা ইত্যাদি। এ কারণেই নাগরিকরা রাষ্ট্রকে কর দেয়, রাষ্ট্রের বিধিবিধান মেনে চলে, ইচ্ছামতো মব সন্ত্রাস করে না। যে সেবা বা সুবিধা রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশিত, তা যদি ব্যক্তি বা দল দেয়া শুরু করে, তাহলে রাষ্ট্র ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ে। এমন রাষ্ট্রই ফ্যাসিবাদের বড় লক্ষ্যবস্তু, শিকারের নিমিত্তে। দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী—এদেরকে আমরা প্রশ্রয় দেব না ঠিকই, কিন্তু গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারই যেন এসব নিয়ন্ত্রণ করে, তার জন্যও সচেষ্ট হব। নিজের দলের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে যেসব দলের ফ্যাসিবাদে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে, তেমন দলগুলোকে আমরা সন্দেহের চোখে দেখব। যেসব দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পাশ কাটিয়ে মব সৃষ্টির দিকে বেশি আগ্রহী থাকে, তাদেরও আমরা সন্দেহের চোখে দেখব। বিশেষ করে এমন দলগুলোকে যারা নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার মধ্য দিয়ে দেশের টেকসই গণতন্ত্রে উত্তরণের পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। অথবা এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে যারা সিস্টেমের ওপর ব্যক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অনির্বাচিত ব্যক্তিকে অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় দেখতে চায়। এরাই নব্য ফ্যাসিবাদের ফেরিওয়ালা, এরাই ঈশপের গল্পের সেই প্রবাদপ্রতিম ভেড়ার চামড়ায় ঢাকা নেকড়ে।

ড. তৌফিক জোয়ার্দার: সহযোগী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর