বাংলাদেশের এফএমসিজি (ফাস্ট মুভিং কনজিউমার গুডস) খাতটি বর্তমানে বহু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। ক্রমবর্ধমান কাঁচামালের মূল্য, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলারের অপ্রতুলতা এবং উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে এ শিল্পের ওপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের উচিত প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। এফএমসিজি শিল্প এমন একটি খাত যা সরাসরি ভোক্তা চাহিদা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও ডলারের ঘাটতির কারণে খাতটি তীব্র চাপের মুখোমুখি, ফলে বাজেটে বাস্তবভিত্তিক ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা অত্যন্ত জরুরি।
কাঁচামাল আমদানিতে নীতিগত সহায়তা: এফএমসিজি শিল্পের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অপরিহার্য কাঁচামালের প্রাপ্তি। কাঁচামালের আমদানি পর্যায়ে উচ্চ শুল্ক, ভ্যাট এবং এলসি প্রক্রিয়ার জটিলতা আমাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যের মূল্যের ওপর। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাজেটে শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক হ্রাস, কাস্টমস ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন এবং দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ শুধু ব্যবসার গতি বাড়াবে না, বরং বাজারে পণ্যের প্রাপ্যতা ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা প্রণয়ন করলে এফএমসিজি প্রতিষ্ঠানগুলো আরো কার্যকরভাবে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করতে পারবে।
মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট সহায়তা: বর্তমান অর্থনৈতিক চাপে ভোক্তার জন্য পণ্যের দাম সহনীয় রাখা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একদিকে উৎপাদন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বাজেটের মাধ্যমে কিছু কাঠামোগত সহায়তা প্রত্যাশা করছে।
ইউনিলিভারের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো পণ্য এমন দামে পৌঁছে দেয়া, যা সাধারণ মানুষ সহজে কিনতে পারে। কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি ও শুল্কের কারণে এ লক্ষ্য অর্জন দিনদিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বাজেটে কাঁচামালের ওপর শুল্ক হ্রাস, টাকার মান নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির সমন্বয় এবং উৎপাদনে করছাড়ের ব্যবস্থা থাকলে আমাদের উৎপাদন খরচ কমবে। ফলে আমরা পণ্যের মূল্য মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে পারব, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে এবং একই সঙ্গে ভোক্তাদের বিশ্বমানের পণ্য পৌঁছে দেয়া সহজ হবে। এমন পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সুসমন্বিত আর্থিক ও মুদ্রানীতির মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে আর্থিক চাপ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া চাই।
করনীতি সহজীকরণ ও প্রণোদনা কাঠামো: এফএমসিজি শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখতে করনীতির ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। প্রতি বছর হঠাৎ করে কর কাঠামো পরিবর্তনের ফলে আমাদের মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা বিঘ্নিত হয়। বাজেটে আমরা তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল করনীতি প্রত্যাশা করি। গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে করছাড়, উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কর রেয়াত এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ করছাড়ের মতো বাস্তবসম্মত প্রণোদনা শিল্পের আর্থিক চাপ কমাবে। এটি অর্থনীতিকে আরো উদ্ভাবনী, গতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব করে তুলবে।
ভোক্তাবান্ধব সাবসিডি ও এসএমই এক্সপানশন: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাত এফএমসিজি শিল্পের সাপ্লাই চেইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করে। এসএমই উদ্যোক্তারা মূলত সাপ্লায়ার ও ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে ছোট (যেমন মুদি দোকান) এবং মাঝারি ব্যবসা পরিচালনা করেন, যা স্থানীয় বাজারে পণ্য সরবরাহ এবং বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের ছাড়া এফএমসিজি পণ্যের সহজলভ্যতা এবং ভোক্তাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এফএমসিজি খাতের বিকাশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা অপরিহার্য। এ উদ্যোক্তারা যেন সহজ শর্তে ঋণ পান, তাদের ব্যবসায়িক মুনাফার ওপর করের চাপ কম থাকে এবং তারা বিনিয়োগে বিভিন্ন সুবিধা পান—এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এসএমই ব্যবসায়ীরা যেন সহজেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাদের ব্যবসা নিবন্ধন করতে পারেন, লাইসেন্স পেতে ঝামেলা পোহাতে না হয় এবং কর দেয়া ও নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকে—এ উদ্যোগগুলো তাদের কাজকে সহজ করবে।
এসব উদ্যোগ শুধু স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সহায়ক হবে। কারণ এসএমই খাত শক্তিশালী হলে স্থানীয়ভাবে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ সহজ হবে, যা পণ্যের খরচ কমাতে সাহায্য করবে। ফলে এফএমসিজি খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে।
প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: আগামী দু-তিন বছরে এফএমসিজি খাতে প্রযুক্তি ও ডাটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা আরো বাড়বে। ই-কমার্স, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং ডাটা অ্যানালিটিকসের ব্যবহার ভোক্তা চাহিদা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনবে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফাইন্যান্স টিমকে আরো কৌশলগত, স্মার্ট ও সিদ্ধান্তভিত্তিক হতে হবে।
সরকারের সহযোগিতা ছাড়া এ রূপান্তর সম্ভব নয়। এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) অধীনে কাস্টমস, আমদানি-রফতানি খাত ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় ডিজিটালাইজেশন আনলে এফএমসিজি খাত আরো দক্ষ হবে। সহজ ও স্বচ্ছ নীতি, ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেম এবং দ্রুত লাইসেন্স প্রক্রিয়া উদ্যোক্তাদের সাশ্রয়ী ও স্বচ্ছভাবে ব্যবসা পরিচালনায় সহায়তা করবে। প্রযুক্তিনির্ভর এ রূপান্তর শুধু খরচ কমাবে না, বরং বাজারে প্রতিযোগিতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।
টেকসই প্রবৃদ্ধিতে বাজেটের ভূমিকা: বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রবৃদ্ধি আর শুধু অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি হতে হবে পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতির সমন্বয়ে গঠিত এক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন। আমরা চাই, এ বাজেট শুধু প্রবৃদ্ধিকে নয়, বরং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহ দিক।
আমি মনে করি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে করছাড়, রিসাইক্লিং ও সার্কুলার ইকোনমি-ভিত্তিক উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা উচিত। এ ধরনের সহায়তা শিল্পের টেকসই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বাস্থ্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলবে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও বাজেট সংলাপ: বাজেট প্রণয়ন আরো কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক করতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সংলাপ ও অংশীদারত্ব বাড়ানো প্রয়োজন। ইউনিলিভার বাংলাদেশ নিয়মিতভাবে সরকার, শিল্প সংগঠন এবং বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেয়। এ আলোচনার মাধ্যমে আমরা বাজেট প্রণয়নের আগে বাজার বিশ্লেষণ, ব্যয় কাঠামো এবং করনীতির বাস্তবতা তুলে ধরি, যাতে সরকার একটি তথ্যভিত্তিক, ব্যবসাবান্ধব এবং বাস্তবমুখী বাজেট তৈরি করতে পারে। ভবিষ্যতে এ অংশীদারত্ব আরো জোরদার হওয়া উচিত। যেমন প্রাক-বাজেট নিয়মিত আলোচনা, রোডম্যাপ শেয়ার এবং প্রাইভেট সেক্টরের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়া। এ ধরনের সহযোগিতা বাজেটকে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, কার্যকর এবং দেশের অর্থনীতির জন্য উপযোগী করে তুলবে।
বছরজুড়ে বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণ নিয়মিতভাবে উপস্থাপন করা উচিত। এতে সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য এটি স্পষ্ট হবে—কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে এবং সেই ব্যয়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব তাদের জীবনে কীভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
দক্ষ নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা: একটি প্রতিষ্ঠানের টেকসই অগ্রগতির পেছনে শক্তিশালী নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎমুখী টিমই মূল চালিকাশক্তি—এ বিশ্বাসে এগিয়ে চলেছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। আমরা একটি ‘ফিউচার-ফিট ফাইন্যান্স’ মডেল অনুসরণ করি, যেখানে ডাটা সক্ষমতা, বিজনেস পার্টনারশিপ এবং নেতৃত্ব বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। টিমের সদস্যদের জন্য আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করি, যাতে তারা শুধুই হিসাববিদ না থেকে কৌশলগত চিন্তায় পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে।
জিনিয়া তানজিনা হক: চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও), ইউনিলিভার বাংলাদেশ










