ভূরাজনৈতিক ‘রেড লাইন’ এবং এ সীমা অতিক্রমের ফলাফল সম্পর্কে বোঝা বৈদেশিক নীতি পরিচালনা এবং বিশ্বশান্তি বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘রেড লাইন’ সাধারণত একটি দেশের আনুষ্ঠানিক পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়। ভূরাজনীতিতে একটি ‘রেড লাইন’ বলতে প্রতিপক্ষের এমন এক অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের সীমা বোঝায়, যা অতিক্রম করা হলে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক যেকোনো ধরনের গুরুতর পরিণতি ঘটতে পারে। একটি দেশ মূলত বিদ্যমান অবস্থা বজায় রাখতে এবং কোনো নেতিবাচক পরিবর্তন রোধ করতে একটি রেড লাইন টানে।
ভূরাজনীতিতে রেড লাইন কেবল কথার হুঁশিয়ারি নয়, বরং এটি এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি, যার সুদূরপ্রসারী পরিণতি হতে পারে। সংকটকালে যে আচরণগুলো একেবারেই অগ্রহণযোগ্য—তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়ার জন্য ভূরাজনৈতিক রেড লাইন নির্ধারণ করা হয়, যা গ্রহণযোগ্য আচরণের সীমা নির্ধারণ করে। কোনো প্রতিপক্ষ (যেমন বেলারুশ) বলতে এমন আরেকটি দেশকে বোঝায়, যে তার নীতি বা আচরণের মাধ্যমে প্রথম দেশের (যেমন পোল্যান্ড) স্বার্থের ক্ষতি করার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। রেড লাইন টানা প্রথম দেশের শক্তি প্রদর্শনের একটি বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হয়। কোন রেড লাইন অতিক্রম করলে কী ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া হবে, তা সাধারণত আগে থেকেই খুব সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়।
ভূরাজনীতিতে রেড লাইনের ঐতিহাসিক উদাহরণ
যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা: ১৯৬২ সালে প্রেসিডেন্ট কেনেডি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সম্ভাবনাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এ ঘটনাই ‘কিউবান মিসাইল সংকট’ নামে পরিচিত। টানা ১৩ দিনের উত্তেজনাপূর্ণ অচলাবস্থার পর যুক্তরাষ্ট্র কিউবার চারপাশে নৌ-অবরোধ ও সামরিক পদক্ষেপের হুমকি ঘোষণা করে। ফলে অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এ ঘটনা পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকাতে সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণের গুরুত্বকে আরো জোরালো করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্র-সিরিয়া: ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা করেন যে সিরিয়ার আসাদ সরকারের দ্বারা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক রেড লাইন হিসেবে গণ্য হবে। এই রেড লাইন অতিক্রম করা হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপে যেতে পারে বলা হয়। ২০১৭ সালে রাসায়নিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যা এমন রেড লাইনের কাছাকাছি যাওয়ার কতটা ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে তা প্রদর্শন করে।
রাশিয়া-ইউক্রেন: প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবার ইউক্রেনে ন্যাটো সম্প্রসারণ এবং সামরিক সহায়তা নিয়ে রাশিয়ার একাধিক রেড লাইনের কথা উল্লেখ করেছেন। পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে উন্নত অস্ত্রসহ সামরিক সহায়তা বাড়িয়েই গেছে, আর রাশিয়া এসব পদক্ষেপকে নিজস্ব রেড লাইন অতিক্রমের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করেছে। ইউক্রেন ইস্যুতে এসব রেড লাইন অতিক্রম হয়েছে বলে মনে করেই রাশিয়া ২০২২ সালে ইউক্রেনে আগ্রাসন চালায়।
রাশিয়া-পশ্চিমা বিশ্ব: অন্যদিকে পশ্চিমা নেতারা বারবার রাশিয়াকে সতর্ক করেছিলেন যে ইউক্রেন আক্রমণ করলে কঠোর কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। রাশিয়া যখন ২০২২ সালে এ রেড লাইন অতিক্রম করে (অর্থাৎ ইউক্রেন আক্রমণ করে), তখন নজিরবিহীন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূচনা করে যা ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করেছে।
চীন-তাইওয়ান: চীনা সরকার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে তাইওয়ানের সরকার স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিলে তা চীনের জন্য একটি রেড লাইন অতিক্রমের নামান্তর হবে। চীন তাইওয়ানের স্বাধীনতা প্রশ্নটি একেবারেই অ-আলোচনাযোগ্য রেড লাইন হিসেবে বিবেচনা করে। বিদেশী শক্তি যদি এ ইস্যুতে সামরিক বা রাজনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করে, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাইওয়ান যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার চেষ্টা করে, তবে সেটাকে চীন রেড লাইন অতিক্রম করার মতো গণ্য করবে। সেক্ষেত্রে দ্বীপটিতে সামরিক আক্রমণ চালিয়ে একে মূল ভূখণ্ড চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সংযুক্ত করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না
সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাত: ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সৌদি আরব ইয়েমেনের হাদরামাউতে একটি ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালায়। এর পাশাপাশি সৌদি সরকার সতর্ক করে জানায় যে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের বাহিনীর কার্যক্রম সৌদি আরব সীমান্তের কাছে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও ইয়েমেন প্রজাতন্ত্রের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। সৌদি আরব ইয়েমেন সরকারের অনুরোধ মেনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন থেকে আমিরাতি বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। সৌদি আরব ঘোষণা করে, এর জাতীয় নিরাপত্তার কোনো হুমকি আমাদের জন্য রেড লাইন এবং এ ধরনের যেকোনো হুমকি মোকাবেলা ও নিষ্ক্রিয় করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে সৌদি সরকার দ্বিধা করবে না। প্রতিক্রিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেন থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ইয়েমেনে অস্ত্র পরিবহনের অভিযোগ অস্বীকার করে। এটি সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে এবং পুরো অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা এড়াতে স্পষ্ট রেড লাইনের গুরুত্বকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে।
দুর্ভাগ্যবশত, এমন প্রমাণ রয়েছে যে ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করার বিষয়টি একটি মিথ্যা অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ২০২০ সালের মার্চে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ‘হাজার হাজার টন’ কোকেন পরিবহনের অভিযোগকে একটি ‘রেড লাইন’ লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করেছিল এবং এ বিষয়ে তথ্যের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একটি সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে বন্দি করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেল কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং দেশটির অবকাঠামোতে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে বলেন। সময় বলে দেবে মাদুরোর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ কি মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ছিল, নাকি ভেনিজুয়েলার তেল দখল করার জন্য।
আরেকটি উদাহরণ হলো, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ঘোষণা করেছিলেন যে ইরাকের সাদ্দাম সরকার কর্তৃক গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করা একটি ‘রেড লাইন’। এ সীমা অতিক্রম করলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপে বাধ্য হবে। ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইরাক আক্রমণ করে। কিন্তু ২০০৩ সালের জানুয়ারিতেই জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকরা রিপোর্ট করেছিলেন যে ইরাকের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র বা এ-সংক্রান্ত কোনো সক্রিয় কর্মসূচি থাকার কোনো আলামত তারা পাননি। ২০০৩ সালের ১৭ জুলাই, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে বলেছিলেন যে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বিষয়ে তারা ভুল প্রমাণিত হলেও ইতিহাস সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে ক্ষমা করে দেবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘রেড লাইন’: পারস্পরিক সম্মান এবং গঠনমূলক সহযোগিতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে ভারত, মিয়ানমার ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য জরুরি। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর হাসিনা সরকারের পতনের কারণে বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গভীর অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের এক পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বহুমুখীকরণের চেষ্টা করে।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ হাসিনা সরকারের প্রতি ভারতের অন্ধ সমর্থনকে তার কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমর্থন হিসেবে দেখে। ফলে জুলাই অভ্যুত্থান কেবল দেশীয়ভাবে এক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ছিল না, বরং ভারতের সেই সমর্থনের কারণে আন্দোলনে এক ধরনের প্রবল ভারতবিরোধী আবেগও যুক্ত হয়। বিশেষ করে হাসিনা সরকারের অধীনে হওয়া তিনটি বিতর্কিত ও অংশগ্রহণহীন নির্বাচনে দিল্লির নীরব সমর্থনকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের জনগণের সাম্প্রতিক ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব সহকারে শোনা এবং এ ধরনের ভারতবিরোধী বক্তব্যের পেছনের যুক্তিগুলো ভারত সরকারকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।
বর্তমানে উভয় দেশই একে অন্যকে দোষারোপ করছে এবং একে অন্যের বিরুদ্ধে রেড লাইন আঁকছে, কিন্তু সেই রেড লাইন ভঙ্গের সম্ভাব্য পরিণতি প্রকাশ্যে অন্তত স্পষ্ট করে বলছে না। কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের বিষয়ে জোরালো সতর্কবার্তা রেড লাইনের মতোই কার্যকর হতে পারে। কঠোর ভাষা, আক্রমণাত্মক বক্তব্য, বৈরী গণমাধ্যম প্রচার, পারস্পরিকভাবে রাষ্ট্রদূত তলব, কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভ, ভিসা স্থগিতের মতো পদক্ষেপ, ক্রিকেটের মতো অরাজনৈতিক বিষয়গুলো সংকটে—এসব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে পর্যবেক্ষকদের কাছে মনে হবে যেন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই একটি রেড লাইন টানা হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভে যোগ দেয়ার জন্য ভারত সফর করেন এবং সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয় এবং উভয় পক্ষই সম্ভবত তাদের নিজ নিজ রেড লাইনগুলো তুলে ধরেছেন। যদিও প্রকাশ্যভাবে কোনো রেড লাইন ঘোষণা করা হয়নি, কিন্তু বাস্তবে একটি রেড লাইন বিদ্যমান বলে অনুমান করা যায়। এ ধারণাভিত্তিক রেড লাইনের ঝুঁকি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করা অপরিহার্য। বাংলাদেশকে তার নিজস্ব রেড লাইনগুলো অঙ্কন করতে হবে এবং তা প্রতিপক্ষকে (এক্ষেত্রে ভারতকে) স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। একই সঙ্গে ভারত আমাদের বিরুদ্ধে যে রেড লাইনগুলো টানতে পারে, সেগুলোও বাংলাদেশের সরকারকে বিচক্ষণতার সঙ্গে সামলাতে হবে।
বাংলাদেশের কাছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনার অবস্থান এবং ভারতে থেকে তার দেয়া বক্তব্যগুলোকে একটি ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে এমন রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশের ভেতরে গোপনে সক্রিয় ভারতীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ড, যা প্রশাসনকে অস্থিতিশীল করতে এবং অশান্তি সৃষ্টি করতে ব্যবহৃত হতে পারে—তা একটি তাৎক্ষণিক রেড লাইন। ভারত বড় ও শক্তিশালী দেশ হলেও ভারতের নিজস্ব কৌশলগত ও নিরাপত্তার স্বার্থেই বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা থাকা জরুরি। কারণ উভয় দেশ একটি দীর্ঘ ও উন্মুক্ত সীমান্ত শেয়ার করে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক শীতল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং অবকাঠামো উদ্যোগে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সম্পৃক্ততা ভারতে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। ভারতের মনে বঙ্গোপসাগর এবং তাদের উত্তর‑পূর্বাঞ্চলে (সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত রাজ্যগুলো) যাওয়ার স্থলপথের ওপর প্রভাব হারানোর আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের সম্পৃক্ততা ভারতের জন্য শিলিগুড়ি করিডোরের (ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করা সরু স্থলপথ) বা ‘চিকেন’স নেক’-এর নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখা হতে পারে, যা ভারতের কাছে একটি আপসহীন রেড লাইন হিসেবে বিবেচিত করতে পারে।
এ মুহূর্তে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে ভারতের কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। তবুও ভারত অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যদি কোনো সময় কোনো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় (কেপিআই) ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বা ঝটিকা হামলা চালানোর চেষ্টা করে, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশেরও প্রয়োজন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কতটা আছে তা মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনে আরো শক্তিশালী করা।
জুলাই বিপ্লবের পর গত কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করে একটি নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে তখন বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততার মাধ্যমে উভয় দেশই ধীরে ধীরে আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ পাবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ পুনরায় সক্রিয় হবে এবং এর মাধ্যমে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে, যদি ভারতীয় আধিপত্যবাদী আচরণ না থাকে।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার এ সাদিকসহ দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায়/শেষকৃত্যে অংশ নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এ সমাবেশ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) দেশগুলোকে আঞ্চলিক শান্তির জন্য আরো কাছাকাছি আনতে সহায়ক হবে এবং এর ফলে তারা একে অন্যের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আর কোনো নতুন রেড লাইন টানবে না।
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন: প্রফেসর (প্রফেসর সিনিয়র), কেজ বিজনেস স্কুল, প্রধান, জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাব (ফ্রান্স)। তিনি পূর্বে বাংলাদেশ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।










