দেশের অর্থনীতির আকার ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে যেকোনো প্রকল্প নেয়া যেতে পারে। তবে প্রকল্প নেয়া বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা জরুরি হলো এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা। আর্থসামাজিকভাবে যদি প্রকল্প থেকে জনগণ উপকৃত না হতে পারে তবে সে প্রকল্প একসময় শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়। আবার সেই প্রকল্প যদি আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থে বাস্তবায়ন করা হয় তাতে দিন দিন ঋণের বোঝা বাড়ে। আর ঋণ পরিশোধের চাপ এসে পড়ে সাধারণ জনগণের ওপর। জনগণের করের টাকায় দিনশেষে সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়। এতে স্বাভাবিকভাবেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।

সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কোনো প্রকল্প নেয়ার আগে তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এজন্য জনসম্মুখে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতাগুলো তুলে ধরা আবশ্যক। একই সঙ্গে জনমত ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বহু মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছে, যার অনেকগুলোর কাজ শেষ হয়েছে, অনেকগুলোর কার্যক্রম এখনো চলমান। কিন্তু সেগুলোর মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে কেবল। তাতে জনজীবনের প্রতিফলন কদাচিৎ পাওয়া যায়। অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক নয় সেসব প্রকল্প। যেমন সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। বাস্তবায়িত যোগাযোগ অবকাঠামোগুলোর মধ্যে অন্যতম কক্সবাজারে নতুন রেলপথ, ঢাকায় মেট্রোরেল, চট্টগ্রামে টানেল ও পদ্মা সেতু সংযোগ রেলপথ। এসব প্রকল্প যোগাযোগের ক্ষেত্রে কিছুটা গতিশীলতা আনলেও অর্থনৈতিকভাবে তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি। উল্টো প্রকল্পগুলোর আয় দিয়ে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের সংস্থান করা যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। উপরন্তু উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের টাকায় বাস্তবায়িত এসব প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ করতে সরকারকে দিতে হচ্ছে ভর্তুকি।

মূলত দেশীয় স্বার্থান্বেষী মহলের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র ও বিদেশী ঠিকাদারদের প্রভাবে অতি ব্যয়বহুল এবং কম উপযোগী বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা জনগণের প্রকৃত চাহিদাভিত্তিক সমাধানের সঙ্গে অনেক সময়ই ছিল সম্পৃক্ততাবিহীন। বরং এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিপর্যয়ও বয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে এসব প্রকল্প ছিল পতিত বিগত সরকারের নেতৃস্থানীয়সহ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর অর্থ লোপাটের অন্যতম মাধ্যম। অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত অর্থনীতিবিষয়ক শ্বেতপত্রে দেখা গেছে, বিগত সরকারের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে প্রায় পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা অপচয় বা নষ্ট হয়েছে। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাধ্যমে খরচ করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা লুটপাট করা হয়েছে। জনবিমুখ ও ব্যয়বহুল এসব প্রকল্প দেশের অর্থনীতির জন্য কালক্রমে বিষফোড়ায় পরিণত হয়েছে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবে প্রকল্পগুলো আর্থিক লোকসানের কারণ হয়ে উঠেছে এবং অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।

এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের আমলে নেয়া প্রকল্পগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করবে এবং জনবিমুখ ও ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্প থেকে সড়ে দাঁড়াবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে একাধিকবার এ নিয়ে আশ্বস্তও করা হয়েছে যে তারা বড় মেগা প্রকল্পের পথে হাঁটবে না। জনজীবনের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ছোট প্রকল্প নেবে ও বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক সভায় অনুমোদন দেয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার ‘‌বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি)’। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয়া হচ্ছে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। বাকি ৪ হাজার ১৯২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচ হবে সরকারি তহবিল থেকে। এছাড়া ভোলা-বরিশালে ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের আরেকটি প্রকল্পও নিতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রস্তাবিত এ সেতু নির্মাণে ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা।

যদিও বর্তমান পরিকল্পনা উপদেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার অনেক আগে থেকে বলে আসছিলেন যে ঋণ করে অবকাঠামো নির্মাণ সক্ষমতার প্রমাণ নয়। এতে বরং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার বিষয়ে তিনি জোরারোপ করেছিলেন। বর্তমান প্রকল্পের সপক্ষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, এরই মধ্যে যেসব বড় প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেগুলো দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ। যদিও অর্থনীতিবিদরা এ নিয়ে নানা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। প্রথমত, এসব বড় প্রকল্প বর্তমান সরকারের মেয়াদে সম্পন্ন হবে না বলেই জোর সম্ভাবনা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এগুলোর যাচাই-বাছাই ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগও উঠেছে। আগের সরকারের অতিমূল্যায়িত ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দেয়ার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। আবার নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা, পুরনো প্রকল্প কোনটা থাকবে, কোনটা থাকবে না সেটার ব্যাপারেও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদদের এ শঙ্কা উপেক্ষা করা কঠিন। সরকারি পরিকল্পনা ও কার্যকলাপের মধ্যে যখন পার্থক্য তৈরি হয় তা রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে ভবিষ্যতের জন্য দায় তৈরি না করে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তারা নিজেদের নীতির বিপরীতে হেঁটে ভবিষ্যতের সরকার ও জনগণের কাঁধে বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। নীতি-কৌশলের স্পষ্টতায় ঘাটতি রয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হয়নি। সেই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদিত বড় প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, এসব প্রকল্পে সম্ভাব্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়ে উঠতে পারে এ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এগুলো ফলপ্রসূ না হলে দেশের অর্থনীতিতে আরো চাপ বাড়বে, যার ভার বহন করতে হবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার ও দেশের আপামর জনসাধারণকে।