সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষা খাতের পরিস্থিতি অসন্তোষজনক। কলেবরে বাড়লেও কোনো স্তরেই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি। বরং সময়ের পরিক্রমায় নানামুখী সংকট ঘিরে ধরেছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে। এসব সংকটের মুখে সবচেয়ে বেশি অবনমন ঘটেছে মাধ্যমিক শিক্ষার। প্রায় সব সূচকেই এ শিক্ষা স্তর পিছিয়ে আছে বলে ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’-এ উঠে এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিকে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে গড় উপস্থিতির হার ৮৪ দশমিক ৩ শতাংশ এবং এর মধ্যে ৮৩ দশমিক ৭ শতাংশই এ স্তর সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও স্তর সম্পন্ন করতে পারার হার তুলনামূলক কম। বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তর (নবম-দশম) সম্পন্ন করতে পারে মাত্র ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী এ স্তর সম্পন্ন করতে পারে না।

সরকারের পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাবে মাধ্যমিক শিক্ষা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। মাধ্যমিক শিক্ষার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভাব। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ২১ হাজারের বেশি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ দশমিক ৭ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আবার মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত প্রায় ৯৪ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৮৭ লাখের বেশি পড়ছে বেসরকারি বিদ্যালয়ে। যে কারণে এ স্তরের শিক্ষা ব্যয় তুলনামূলক বেশি। এমনকি অনেক বেসরকারি বিদ্যালয়কে এমপিওভুক্ত করা হলেও দেশের বিদ্যমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অনেকেই আর্থিক চাপের কারণে বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে। বর্তমানে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার ৩৫ শতাংশের ওপর। এভাবে মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর বেসরকারিনির্ভর ও ব্যয়বহুল হওয়াটা সরকারের মনোযোগ ঘাটতিরই প্রতিফলন। মাধ্যমিক শিক্ষার এরূপ চিত্র স্পষ্ট করে যে দেশের শিক্ষা খাত মোটেও সর্বজনীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে গড়ে তোলা যায়নি। যদিও জাতিসংঘের নেয়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং সংস্থাটির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভাব ও উচ্চ ব্যয়ের বাইরেও আরো সংকট রয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরে, যার মধ্যে অন্যতম দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০ করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলেও সেটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এছাড়া গতানুগতিক পাঠ্যক্রম, সেকেলে পাঠদান পদ্ধতি, শ্রেণীকক্ষ, আসন, টয়লেট, পানীয়জল ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিও রয়েছে। এসব কারণেও এ স্তরে বেসরকারি বিদ্যালয়নির্ভরতা বেড়েছে। যদিও বেসরকারি বিদ্যালয়ের অধিকাংশও মানসম্মত নয়। যে কারণে কোচিংয়ের প্রচার-প্রসারও ক্রমেই বেড়েছে। এছাড়া এ স্তরের শিক্ষাধারা একমুখী নয়। সরকারি, বেসরকারিসহ কারিগরি, মাদ্রাসা, ইংরেজি মাধ্যম ও কওমি মাদ্রাসা বিভিন্ন ধারার মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম, শিক্ষার মান ও ব্যয়ের পরিমাণের ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে। এতে দেখা যায় একই বয়সী শিশু ভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন মানের শিক্ষা পাচ্ছে। অভিভাবক যত বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারছেন, তাদের সন্তান তত বেশি মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কেবল মাধ্যমিকেই নয়, সব শিক্ষা স্তরের অবস্থা কমবেশি একই রকম। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত পাঁচ রকমের কারিকুলাম চালু আছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। আবার বেশির ভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দক্ষ শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ শিক্ষার পাঠ্যক্রমও সময়োপযোগী নয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। এখানেও দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিটি স্তরেই গুণগত শিক্ষার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।

নানা সময়ে বিভিন্ন সরকার দেশের শাসন ক্ষমতায় বসে নানা খাতের উন্নয়ন-অগ্রগতির কথা বলেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু শিক্ষা খাতের বর্তমান চিত্র বলে দিচ্ছে যে শিক্ষা খাত উপেক্ষিত রয়ে গেছে। যদিও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা ছাড়া টেকসই অগ্রগতি কখনো নিশ্চিত করা যায় না।

আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে শিক্ষা খাতের অবকাঠামোর সম্প্রসারণ ঘটলেও শিক্ষার গুণগত মানের ক্রমে অধঃপতন ঘটেছে। যে কারণে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জনগণের সর্বাধিক প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে। কেননা এ অভ্যুত্থানের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল শিক্ষার্থীরা। দুঃখজনকভাবে এ সরকারও শিক্ষা খাতের সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

শিক্ষা খাতে বিদ্যমান সব সমস্যার সমাধান করতে হলে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। আগামীতে নির্বাচিত সরকারের উচিত হবে শিক্ষায় পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়া। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যাসহ সব সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে বিদ্যমান অবকাঠামোমূলক সংকট দূর করা দরকার। এর বাইরে পাঠ্যক্রম নিয়েও ভাবনা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধারা থেকে মাধ্যমিক শিক্ষাকে একমুখী করে গড়ে তোলা কঠিন। তবে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতে অন্তত কয়েকটি মৌলিক বিষয় পড়ানো হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নে কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও অন্যান্য সহায়তা সময়োপযোগী করা দরকার, যাতে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। এজন্য শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি আবশ্যক।

দেশের শিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ এখনো জিডিপির ২ শতাংশেরও নিচে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী শিক্ষায় ন্যূনতম ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ প্রয়োজন। বরাদ্দ কম থাকায় নতুন সরকারি স্কুল স্থাপন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সংযোজন—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষার মানোন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ছে এবং শিক্ষা হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল। সরকারের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া শিক্ষা খাতকে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের করা কঠিন হবে।