সব ধরনের কনটেন্টেই পড়তে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝড়ের প্রভাব। হোক সেটা বিজ্ঞাপন, কিংবা উপন্যাস বা সিনেমা ও সাংবাদিকতা। এআইয়ের প্রভাব একসঙ্গে ভয়াবহ, বিস্ময়কর, হতাশাজনক ও রোমাঞ্চকর হবে। এখানে শুধু ‘সৃজনশীল ধ্বংস’ নয়, পুরনো অর্থে সত্যিকারের ধ্বংসও হবে প্রচুর।

জীবনের বড় অংশ আমি গবেষণা, সাংবাদিকতা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে কাটিয়েছি; পাশাপাশি পালানোর জন্য বহু উপন্যাস ও সিনেমা উপভোগ করেছি। তাই নির্মাতাদের প্রতি আমার গভীর সহানুভূতি আছে। তিন বছর ধরে আমি এআই খাতে বিনিয়োগকারী ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট। এ অভিজ্ঞতা সাংবাদিকতা, প্রকাশনা, সংগীত, বিজ্ঞাপন ও হলিউডে জড়িত সবার জন্য আমার বার্তাকে স্পষ্ট করেছে: এ প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করলে তার মূল্য আপনাকেই চুকাতে হবে।

প্রযুক্তির প্রলয়ঙ্কারী ঝড়: প্রথমেই হলিউডের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা যাক। ইন্টারনেট, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট ও মোবাইল ফোনের হাত ধরে স্ট্রিমিংয়ের মতো নতুন মাধ্যম আসায় চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্প বহু বছর ধরেই সংকুচিত হচ্ছে। কেবল টিভি ও ডিভিডির পতনের পেছনে রয়েছে নানা কারণ—ভিডিও স্ট্রিমিং, ব্যবহারকারীসৃষ্ট কনটেন্টের উত্থান, কম খরচের ক্যামেরা ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাণের গণতান্ত্রীকরণ এবং ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকের মতো প্লাটফর্মের সঙ্গে দর্শকের মনোযোগের প্রতিযোগিতা। তবু এ দশকের যন্ত্রণাদায়ক সংকোচনের মধ্যেও ভিডিও নির্মাণের মৌলিক কৌশল খুব একটা বদলায়নি। বাস্তব মানুষ ও বস্তু ধারণ করতে এখনো বাস্তব ক্যামেরাই ব্যবহার করা হয়েছে।

কিন্তু শিগগিরই এসব বাস্তব ইনপুট অচল হয়ে পড়বে; তাদের জায়গা নেবে এআই। এ নতুন জগতের পথিকৃৎ হবে—ব্যতিক্রম ছাড়াই—স্টার্টআপগুলো, যাদের অনেকের বয়স এক বছরেরও কম। এআই-ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ বা বিতরণে কোনো ঐতিহ্যবাহী স্টুডিও, প্রযোজক বা পরিবেশক অগ্রভাগে নেই। প্রথম দিককার এমন একটি স্টার্টআপ রানওয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় আট বছর আগে; এরপর যুক্ত হয়েছে আর্কানা, ফ্লিক, কোয়াল, জিংগ্রোলসহ আরো অনেকে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আমি এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং সবার কাছে একই প্রশ্ন রেখেছি: প্রযুক্তি দুনিয়ার বাইরের কোনো ব্যক্তি কবে নাগাদ হলিউডের গড়পড়তা প্রডাকশনের সমমানের চরিত্র ও প্রডাকশন ভ্যালু নিয়ে পূর্ণদৈর্ঘ্যের এআই সিনেমা বানাতে পারবেন? উত্তরগুলো এক থেকে তিন বছরের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে—গড়ে প্রায় দুই বছর। সহজতর স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে আমরা এরই মধ্যে সেই পর্যায়ে পৌঁছে গেছি।

২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউক্রেনীয় স্টার্টআপ হলিওয়াটার এআই ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ টেক্সট গল্প তৈরি করে; কোন গল্প জনপ্রিয় হচ্ছে তার ভিত্তিতেই ফোনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ‘ভার্টিক্যাল’ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাতে যে কাউকে সক্ষম করে। প্রতিষ্ঠানটির আয় এরই মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং বছরে দ্বিগুণেরও বেশি হারে বাড়ছে। একইভাবে ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ওয়াইড ওয়ার্ল্ডস ভক্তদের তাদের পছন্দের ফ্যান-ফিকশনাল ইউনিভার্স থেকে উপাদান নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানানোর সুযোগ দেয়।

পরের ধাক্কা আসবে ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন শিল্পে। এআই বিজ্ঞাপনে শীর্ষস্থানীয় স্টার্টআপ হিগসফিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয় মাত্র ২০২৩ সালে; কিন্তু তাদের ব্যবসা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে—আয় প্রতি মাসে দ্বিগুণ হচ্ছে এবং এ বছরই ১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ানোর পথে। দীর্ঘ ও জটিল ধারাবাহিক কিংবা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তবে এর অগ্রগতি অত্যন্ত দ্রুত। এক দশকের মধ্যেই মানব অভিনেতারা ইতিহাসের নিদর্শনে পরিণত হবেন—ঠিক যেমন হবেন সিনেমাটোগ্রাফার, স্টান্ট পারফর্মার, আর্ট ডিরেক্টর, কস্টিউম ডিজাইনার, লাইন প্রডিউসার কিংবা লোকেশন স্কাউটরা। কিছু স্টুডিও নীরবে বিপুল মাত্রায় এআই ব্যবহার করছে (লায়ন্সগেটের নাম প্রায়ই শোনা যায়), কিন্তু হলিউডের বড় অংশই আসন্ন এ সুনামির মুখে কার্যত কিছুই না করে বসে আছে। স্টুডিও, প্রযোজক, পরিবেশক ও এজেন্সিগুলো স্বপ্ন দেখছে বা দেখানোর ভান করছে যে এআই নাকি কেবল আরেকটি প্রযুক্তিগত ঢেউ, কেবল টিভি, সিজিআই, ডিভিডি কিংবা স্ট্রিমিংয়ের মতোই, যেটার ওপর ভেসে থাকা যাবে। এর বিপরীতে অভিনেতা, লেখক, আর্ট ডিরেক্টরসহ শিল্পের বিভিন্ন পেশাজীবীর প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়নগুলো আতঙ্কিত। তাদের প্রতিক্রিয়া—অন্ধভাবে এআইয়ের সব ধরনের ব্যবহার বিরোধিতা করা—সর্বোচ্চ বিচারে নিষ্ফল। তবু তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। প্রযুক্তি এত দ্রুত এগোচ্ছে যে বাস্তব থেকে এআই-নির্ভর ভিডিও উৎপাদনে রূপান্তর সম্ভবত হবে নির্মম ও সংক্ষিপ্ত—এক রাতের মধ্যে হাজার হাজার পেশা ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমি এরই মধ্যে বন্ধুদের শিল্প ছেড়ে যেতে দেখেছি।

হলিউড কেবল একটি উদাহরণ। মানবিক ও সতর্ক ব্যবস্থাপনা ছাড়া এআই বিপ্লব সমাজে ব্যাপক যন্ত্রণা ডেকে আনবে—এমন লক্ষণ খুব কমই দেখা যাচ্ছে। একই কথা প্রযোজ্য কল্পকাহিনী রচনা, বাণিজ্যিক আলোকচিত্র, রেডিও এবং সর্বোপরি সংগীত শিল্পের ক্ষেত্রে। সেখানে ‘ইউডিও’, ‘শুনো’ ও ‘মোজার্ট’সহ একাধিক দ্রুত বর্ধনশীল এআই স্টার্টআপ অপেশাদার লোকজনকে সংগীত সৃষ্টির ক্ষমতা দিচ্ছে। নিশ্চয়ই ‘ইউডিও’ ও ‘শুনো’ ব্যাপক মেধাস্বত্ব চুরিতে জড়িয়েছিল, মামলা হয়েছিল এবং সম্প্রতি বড় সংগীত লেবেলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। কিন্তু মামলা ঠোকার বাইরে এআইয়ের অগ্রভাগে কোনো ঐতিহ্যবাহী সংগীত কোম্পানিকে দেখা যায় না।

আগামীর পৃথিবী: শিল্পকলায় যেহেতু এআই বিপ্লব আসছেই ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোতে তার ধ্বাংসাত্মক প্রভাব হবে ভয়াবহ। তবে আগামীর দুনিয়া কেমন হবে সে প্রশ্নের উত্তর অনেক বেশি জটিল। ব্যক্তিগতভাবে একসময়ের ও ভবিষ্যতের চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে এআই চলচ্চিত্রায়ণ আমাকে রোমাঞ্চিত করে। আমি চাইব ট্রিটমেন্ট ও চিত্রনাট্য লিখে সেগুলো আমার এআই ‘স্টুডিওতে’ ঢুকিয়ে দিতে; সেখান থেকে একটি ভালো রাফ কাট ফিরে পেতে; তারপর এআইয়ের সঙ্গে ঘষেমেজে এমন একটি চলচ্চিত্র দাঁড় করাতে—যেখানে প্রতিটি চরিত্র, সেটিং, গতি, সংলাপ আর ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল হবে নিখুঁত। অর্থায়নের জন্য ধর্ণা দিতে হবে না, কোনো প্রযোজকের বান্ধবীকে কাজ দিতে হবে না, আত্মমুগ্ধ তারকার খেয়াল সামলাতে হবে না কিংবা শুটিং সেটে কেউ ভুল করে আসল গুলি ভরে দিয়েছে কিনা সেই দুশ্চিন্তাও থাকবে না। তবে মেধাস্বত্ব ও নির্মাতাদের সুরক্ষায় নতুন আইন, ব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জরুরি প্রয়োজন আছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত পূর্ববর্তী কাজের জন্য ঐতিহ্যবাহী নির্মাতাদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে এআই নির্মাতা ও এআই নির্মিত কাজের সুরক্ষাও প্রয়োজন।

এআই-সৃষ্ট শিল্পকর্ম সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য নয় এমন ধারণা ভ্রান্ত। মানবশিল্পীরা—লেখক, আলোকচিত্রী, চলচ্চিত্র নির্মাতা—যখন এআই ব্যবহার করে নতুন কাজ সৃষ্টি করেন, তখন প্রচলিত যন্ত্র ব্যবহারকারী মানবশিল্পীদের মতোই তারা সুরক্ষার অধিকারী। বরং আমার ধারণা, এআই একেবারে নতুন ধারার শিল্প ও প্রতিভাবান শিল্পীদের উত্থানের পরিবেশ তৈরি করবে। এর আভাস পেতে রানওয়ে এআই ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, বিশেষ করে গ্র্যান্ড প্রাইজ বিজয়ী টোটাল পিক্সেল স্পেস দেখাই যথেষ্ট। এমন কাজই দেখায়—কেন আমি শিল্পসৃষ্টিতে এআই যুগকে স্বাগত জানাই, যদিও এর বড় নেতিবাচক দিকগুলোও স্বীকার করি। দুঃখজনক হলেও অনেক দক্ষ কর্মী, এমনকি তা কয়েক লাখ বা কোটি হতে পারে যারা স্বল্প নোটিসে কর্মহীন হবেন। অনেকেই হয়তো তার ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন। একই সঙ্গে তৈরি হবে এআই ‘আবর্জনার’ মহাসাগর। প্রতি বছর লাখ লাখ নতুন উপন্যাস, গান ও চলচ্চিত্র—যার ভিড়ে প্রতিভাবান নতুন শিল্পীদের আলাদা হয়ে ওঠা কঠিন হবে। আর অবশ্যই থাকবে আরো বেশি এআই বান্ধবী ও এআই পর্নোগ্রাফি, সঙ্গে নাৎসিদের পুনরুত্থান থেকে শুরু করে শিশু নির্যাতনের চিত্রায়ণের মতো ভয়ংকর সৃষ্টিও।

প্রহেলিকার জীবন: আমার কাছে সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো সংবাদ, তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স সেবার মতো নন-ফিকশনের জগতে কী ঘটছে। এখানে আমরা এরই মধ্যে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে সত্য ও বানানো তথ্যের সীমানা ঝাপসা হয়ে প্রায় অচেনা হয়ে যাচ্ছে। শিল্পকলায় এআইয়ের যুগ আমাকে যতটা রোমাঞ্চিত করে, সত্য ও বাস্তবতার ক্ষেত্রে ভারসাম্যটা ততটাই ভিন্ন। উদযাপনের মতো অনেক কিছু থাকলেও এআই কী আনতে পারে তা ভেবে আমি আতঙ্কিত।

হলিউডের মতো সাংবাদিকতাও আগেই সংকুচিত হয়েছে। দৈনিক পত্রিকা, সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন, রেডিও ও টেলিভিশন সংবাদ—সবকিছুকে এক বাজারে ঠেলে দিয়েছে ইন্টারনেট। পত্রিকার নির্ভরযোগ্য ক্ল্যাসিফায়েড বিজ্ঞাপনের আয় ধ্বংস করেছে; আর নিম্নমানের হাজারো নতুন প্রবেশকারীর জন্ম দিয়েছে। নিউজউইক ও টাইম ম্যাগাজিনের মতো সাময়িকী কিংবা নেটওয়ার্ক টিভি নিউজ যে সংবাদমাধ্যমগুলোর ওপর আগে মানুষ নির্ভর করত সেগুলো ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাপটে বিধ্বস্ত। এসব প্লাটফর্মে এমনভাবে সারসংক্ষেপ শেয়ার করা হয় যা কপিরাইট লঙ্ঘনের কাছাকাছি হলেও তাদের ধরা যায় না। জাঙ্ক (আবর্জনা) ও মিথ্যা ছড়িয়ে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগ করা সংবাদের মান ভয়াবহভাবে নিচে নেমে গেছে।

এদিকে ব্যতিক্রমী ঘটনাও কিছু ঘটেছে গণমাধ্যমের দুনিয়ায়। প্রায় ‘মৃত্যুপথযাত্রা’ পার হয়ে অল্প কয়েকটি উচ্চমানের ইংরেজি সংবাদমাধ্যম আরো শক্ত হয়ে, আগের চেয়ে বড় বৈশ্বিক পাঠকগোষ্ঠী নিয়ে টিকে আছে। তাদের মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, গার্ডিয়ান, ব্লুমবার্গ নিউজ, ইকোনমিস্ট, পলিটিকো, বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপি। কিন্তু এগুলো জনসংখ্যার খুব ছোট একটি অংশেই পৌঁছায়। এগুলো তৈরি করাও ব্যয়বহুল, আর তাদের আর্থিক ভিত্তি নাজুক। এআই শুধু মানসম্মত সাংবাদিকতার অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেই হুমকির মুখে ফেলছে না; আরো মৌলিকভাবে, সত্য তথ্য পৌঁছে দেয়ার ক্ষমতা এবং যুক্তিবোধসম্পন্ন, অবহিত জনসমাজ টিকিয়ে রাখার সামর্থ্যকেও ক্ষয় করছে।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় সবচেয়ে জটিল ও বহুল আলোচিত সমস্যা হিসেবে দাঁড়িয়েছে এআই ডিপফেক। ইউটিউব, ফেসবুক, স্ন্যাপ, এক্স ও টিকটকের সত্যতা বা নির্ভুলতা রক্ষার বাধ্যবাধকতা খুবই সীমিত—এ বাস্তবতায় ডিপফেক ভয়ংকর সমস্যা। অ্যালেক্স জোনসের মতো ষড়যন্ত্রতত্ত্ববাদীরা যত ক্ষতিই করুক, অন্তত আমরা জানতাম যে আমরা আসল অ্যালেক্স জোনসকেই শুনছি। সামনের দিনগুলোয় এমন ঘটনা ঘটবে যে কোনো ব্যক্তি ও ঘটনার নকল উপস্থাপনা করা সম্ভব হবে এবং তা সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরতে পারা কঠিন হবে। এমনকি সবচেয়ে যত্নে প্রশিক্ষিত এআই মডেলও অপব্যবহার করা যায়, আর কিছু ওপেন-সোর্স মডেলে কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই। সবার জন্য উন্মুক্ত এসব মডেলকে ‘প্রশিক্ষণ’ দিয়ে প্রায় যেকোনো ধরনের লেখা বা ভিডিও বানানো যায়—খুব মানসম্মত (সতর্কভাবে যাচাইকৃত) থেকে শুরু করে সম্পূর্ণ বিকৃত ও উন্মত্ত কনটেন্ট পর্যন্ত।

কিছুটা আশার কথা হলো, জনসাধারণের জন্য উপলভ্য সংবাদ ও তথ্যের মান এআই উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নতও করেছে। অবশ্য যারা ভালো করে খোঁজ নিতে পারে তাদের জন্য। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও গুগলের মতো প্রধান মডেলগুলো তাদের ওপর দাঁড়ানো বহু ভ্যালু-অ্যাডেড সেবা বেশ দক্ষতার সঙ্গে দিচ্ছে। তাদের মধ্যেও যে ‘হ্যালুসিনেশন’ হচ্ছে না, এমন নয়। তবে এক বছর আগের তুলনায় তা অনেক কমেছে। এসব মডেল কিছু প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কিছু গোপন, কিছু প্রকাশ্য চুক্তিও করেছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের ওপেনএআইয়ের সঙ্গে চুক্তি আছে, নিউইয়র্ক টাইমসের অ্যামাজনের সঙ্গে, আর বার্তা সংস্থা এপির রয়েছে ওপেনএআই ও গুগলের সঙ্গে সমঝোতা।

এরই মধ্যে ১ বিলিয়নের বেশি ব্যবহারকারীর জন্য এআই জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশের এক বিস্ময়কর দরজা খুলে দিয়েছে। আমি প্রতিদিন অন্তত এক ডজন বার পারপ্লেক্সিটি ব্যবহার করি এবং এ প্রবন্ধ লেখার সময়ও বারবার করেছি—পুরনো প্রকাশনার (বা গুগল সার্চ) চেয়ে অনেক বেশি। একইভাবে বিশেষায়িত এআই সেবার বিস্ফোরণ ঘটেছে—আইনজীবী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও রোগীদের জন্য রেফারেন্স রিসোর্স; এমনকি অ্যাশ ও লোভনের মতো প্রদানকারীর মাধ্যমে এআই থেরাপিস্টও। চাইলে একে হালকা করে দেখতেই পারেন, কিন্তু কয়েকজন বন্ধু আমাকে বলেছেন—প্রয়োজনের সময়ে অ্যাশ, লোভন এমনকি চ্যাটজিপিটিও আশ্চর্যজনকভাবে সহায়ক হয়েছে; অনেক মানব থেরাপিস্টের তুলনায় কম নয়।

পিচ্ছিল পথ সামনে: অন্য সব উদ্ভাবনের মতো এআইয়েরও অন্ধকার দিক আছে। এআই মডেল নিজে থেকে জ্ঞান সৃষ্টি করে না। তারা অন্যের তৈরি জ্ঞান দক্ষতার সঙ্গে সংগ্রহ ও বিতরণ করে, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল থাকে বাইরের তথ্যের ওপর। আমরা—এবং এআই মডেলও—এখনো পলিটিকো, নিউইয়র্ক টাইমস, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, কিয়েভ ইনডিপেনডেন্ট, ইকাথিমেরিনি, গার্ডিয়ান, লে মঁদ, আসাহি শিম্বুন, এল পাইস, ডের শপিগেল, এপি, রয়টার্স, প্রোপাবলিকা—এবং বিশ্বজুড়ে থাকা অসংখ্য সংবাদপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। কারণ একমাত্র তারাই কমিশনিং এডিটর, পূর্ণকালীন সাংবাদিক, ফ্যাক্ট-চেকার এবং মাঠপর্যায়ে থাকা স্ট্রিংগার, ফিক্সার ও সূত্রের নেটওয়ার্ক ধরে রাখে। এআই মডেল অনুসন্ধানী সাংবাদিক বা ঝুঁকি নিয়ে সত্য উদ্ঘাটনে নামা যুদ্ধমাঠের সংবাদদাতাকে নিয়োগ করে না।

প্রথাগত সাংবাদিকতার ওপর এআই মডেলের নির্ভরতা যত গভীর, তাদের জন্য হুমকিও ততটাই গুরুতর—অন্তত দুই দিক থেকে। হলিউডের ক্ষেত্রের মতোই এ হুমকি আরো তীব্র হয়েছে এ কারণে যে পুরনো শিল্পের বিষয়টি প্রায় উপেক্ষাই করছে। প্রথম সমস্যা হলো সরাসরি প্রতিযোগিতা। কোনো নির্দিষ্ট বিষয় জানতে চাইলে বা কোনো ইস্যুতে হালনাগাদ থাকতে চাইলে এখন আর সংবাদমাধ্যমের দরকার পড়ে না; মডেলকে প্রশ্ন করলেই চলে। আপনি ঠিক যে প্রশ্নের উত্তর চান, ঠিক যে মাত্রার বিস্তারিত চান—সেভাবেই জানতে পারেন। এমনকি আপনার প্রিয় পত্রিকার খবরের পাতা বা হোমপেজের সমতুল্য সারসংক্ষেপও চাইতে পারেন। তার ওপর বর্তমানে থাকা মডেলগুলো এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, যেগুলো সংবাদপ্রতিষ্ঠান দিতে পারে না। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি মেরামত থেকে শুরু করে মনোচিকিৎসা ও চিকিৎসা পরামর্শ পর্যন্ত। সবচেয়ে খারাপ দিক হলো এগুলো অনেক সস্তা। ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীর জন্য মাসে সাধারণত ১০ ডলার, যেখানে নিউইয়র্ক টাইমসের খরচ প্রায় ২৫ ডলার, আর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বা ব্লুমবার্গ নিউজ আরো ব্যয়বহুল।

এআই মডেলগুলোর খরচের সুবিধা আসে আংশিকভাবে এ কারণে যে তারা বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর মধ্যে স্থায়ী ব্যয় ভাগ করে নিতে পারে। কিন্তু বড় সুবিধা হলো—তারা যে তথ্য ব্যবহার করে, তার বেশির ভাগের জন্যই মূল্য দেয় না। প্রধান এআই বিক্রেতারা বই ও সংবাদ সাময়িকীসহ মূল্যবান প্রকাশনা ব্যবহার করে তাদের সিস্টেম প্রশিক্ষণে ব্যতিক্রমীভাবে নির্মম ও নৈতিকতাবিবর্জিত আচরণ করেছে—সাধারণত লেখক বা প্রকাশককে খুব সামান্য বা কোনো পারিশ্রমিক না দিয়েই।

প্রধান মডেলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচিত অ্যানথ্রপিক সম্প্রতি লেখক সংঘের সমর্থনে হওয়া একটি মামলা দেড় বিলিয়ন ডলারে মীমাংসা করেছে। নিউইয়র্ক টাইমস ২০২৩ সালে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে মামলা করে (দুই বিবাদীই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে)। আর আমি পারপ্লেক্সিটির সহায়তায় এ প্রবন্ধ শেষ করার অল্প সময় আগেই নিউইয়র্ক টাইমস ও শিকাগো ট্রিবিউন সেই কোম্পানির বিরুদ্ধেও মামলা করেছে।

মডেল নির্মাতাদের ন্যায্যভাবে নির্মাতাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করার পক্ষে শক্ত নৈতিক ও ব্যবহারিক যুক্তি আছে। তবে এর জন্য সম্ভবত নতুন আদালত রায় বা নতুন আইন প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে যদি সংবাদপ্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক, লেখক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতারা পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক না পান, তাহলে খুব বাস্তব ঝুঁকি আছে। এআই শিল্প শেষ পর্যন্ত সেই উৎসগুলোকেই ধ্বংস করবে যেগুলোর ওপর নির্ভর করেই সে সঠিক ফলাফল দেয়।

এতেই আসে এআই-সৃষ্ট দ্বিতীয় বড় সমস্যা: এআই আবর্জনা ও প্রতারণার সয়লাবে বিশ্বাসযোগ্য সংবাদসূত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। অসংখ্য এআই সেবা গড়ে উঠবে এবং এমনকি প্রধান ফাউন্ডেশন মডেল কিংবা সবচেয়ে সতর্ক সংবাদপ্রতিষ্ঠানও এমন দক্ষ এআই জালিয়াতিতে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে, যা বাস্তব থেকে আলাদা করা যাবে না। এখন পর্যন্ত মডেলগুলো বাস্তব তথ্যের ওপর প্রশিক্ষিত; কিন্তু শিগগিরই অধিকাংশ প্রশিক্ষণ ‘কনটেন্ট’ই হবে এআই উৎপাদিত।

বালিতে মাথা গুঁজলেই কি মিলবে মুক্তি: আসন্ন এ সংকটের দায় আংশিকভাবে ঐতিহ্যবাহী শিল্প নিজেকেই নিতে হবে। এআইয়ের আসন্ন হুমকির মুখে হলিউডের মতো বড় বড় সংবাদপ্রতিষ্ঠানও কার্যত কিছুই করেনি। নিউইয়র্ক টাইমস ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এআই শিল্প নিয়ে তুলনামূলকভাবে ভালো কাভারেজ দেয়, এ বিষয়ে জানেন—এমন রিপোর্টারও নিয়োগ করে। কিন্তু তাদের কি এমন কোনো চ্যাট ইন্টারফেস আছে, যেখানে গ্রাহকরা প্রশ্ন করতে পারেন? না, নেই। নিউইয়র্ক টাইমস বা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, গার্ডিয়ান, পলিটিকোর সার্চ ফিচার ব্যবহার করে দেখুন, তারপর সেটিকে চ্যাটজিপিটি বা এমনকি প্রচলিত গুগল সার্চের সঙ্গে তুলনা করুন। পার্থক্য আকাশ-পাতাল—আর আমরা কিন্তু একই প্রকাশনার ভেতরের তথ্য খোঁজার কথাই বলছি।

বেশির ভাগ সংবাদপ্রতিষ্ঠানই এআইকে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করছে না। সাংবাদিকরা হয়তো চ্যাট সেবা ব্যবহার করেন, কিন্তু আরো অনেক কিছু করা সম্ভব। তারা এমন এআই সিস্টেম মোতায়েন করতে পারত, যা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সংবাদ উন্নয়নের ধারাবাহিক স্ক্যান দেবে, প্রথম খসড়া লেখা স্বয়ংক্রিয় করবে, প্রতিবেদনের সঙ্গে উদ্ধৃতি ও ফুটনোট যুক্ত করবে (পারপ্লেক্সিটি যেমন করে), ফ্যাক্ট-চেকিং ও কপি এডিটিং সহজ করবে। এরপর আছে ভাষা অনুবাদ। নিউইয়র্ক টাইমস চীনা ও স্প্যানিশে সীমিত সেবা দেয়। কিন্তু আপনি যদি কেবল আরবি, জাপানি, পোলিশ, ইউক্রেনীয় বা ভিয়েতনামি পড়েন—তাহলে আপনার কপালে কিছুই নেই। বর্তমান এআই অনুবাদের মানের প্রেক্ষাপটে এটা হাস্যকর।

ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনাগুলো এখনো মূলত ফাউন্ডেশন এআই মডেলগুলোর জন্য তাদের কনটেন্টের দরজা বন্ধ রেখেছে। কিন্তু তারা যদি ভাবে এতে গতি কমবে, তবে তারা বিভ্রান্ত। ডিজিটাল বিশ্ব কোনো একক প্রকাশনার তুলনায় অসীম বড়, আর এআই মডেল ও তাদের টুলগুলো প্রয়োজনীয় সবকিছু খুঁজে পেতে ক্রমেই দক্ষ হয়ে উঠছে। সমষ্টিগতভাবেও সংবাদ শিল্প যে শক্তিগুলোর মুখে পড়েছে—এবং যেসব কোম্পানি সেই শক্তি উন্মুক্ত করছে—তাদের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার ক্ষমতা তার নেই।

এ শেষ কথাটিই সবচেয়ে কম বুঝতে পারছি আমরা। ২০২৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমস কোম্পানির আয় ছিল ৩ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এদিকে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, গার্ডিয়ান ও ইকোনমিস্ট—এ তিনের সম্মিলিত আয় ২ বিলিয়ন ডলারেরও কম। প্রকৃত আর্থিক শক্তি আছে কেবল ব্লুমবার্গের। এমনকি বৈশ্বিক বই ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা শিল্প—যার নিয়ন্ত্রণ বার্টেলসম্যান, স্প্রিংগার ও এলসেভিয়ারের হাতে—সব মিলিয়েও মোট আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের কম। এর বিপরীতে গুগলের বার্ষিক আয় প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার; মাইক্রোসফটের ৩০০ বিলিয়ন; মেটার ২০০ বিলিয়ন; অ্যামাজনের ৭০০ বিলিয়ন; অ্যাপলের ৪০০ বিলিয়ন ডলার। শুধু গুগলের মুনাফাই বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এমনকি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের আয়ও এরই মধ্যে ব্লুমবার্গ ছাড়া যেকোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড়। নিউইয়র্ক টাইমসের আয় বছরে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে পড়ে তাহলে পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণের লড়াইয়ে কে জিতবে বলে মনে হয়।

আমরা আশা করতেই পারি, সংবাদমাধ্যমগুলো ঘুম থেকে জাগবে এবং আদালত, আইনসভা ও জনচাপ এআই কোম্পানিগুলোকে সাংবাদিক ও গবেষকদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করবে। এআই উচ্চমানের সাংবাদিকতার একটি নতুন দরজা হয়তো খুলে দেবে। আবার একই সঙ্গে আমার মতো আরো অনেকেরই সংশয়, এসবের কোনোটাই হয়তো ঘটছে না।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

চার্লস ফার্গুসন: প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের এআই সম্পাদক, বিনিয়োগকারী ও সিনেমা নির্মাতা; অস্কারজয়ী প্রামাণ্যচিত্র ইনসাইড জব-এর পরিচালক; তার সরাসরি বিনিয়োগের মধ্যে আছে অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও এনভিডিয়া এবং পারপ্লেক্সিটি, এচড, কোপাইলটকিট, প্যারাডাইম, ব্রাউজার ইউজ, ফিউজএআই ও প্যালির মতো বহু এআই স্টার্টআপ