কর্মস্থলে রাসায়নিক নিরাপত্তা বলতে বোঝায় এমন একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শ্রমিকদের রাসায়নিকজনিত ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা হয়। এটি কেবল দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে শ্রমিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার একটি অপরিহার্য উপাদান। বাংলাদেশে বহু শ্রমিক বছরের পর বছর বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থেকে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন, কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে সেই অসুস্থতার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা হয় না। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা আর নিরাময়যোগ্য থাকে না।

বাংলাদেশে কর্মস্থলে রাসায়নিক দুর্ঘটনা একটি গুরুতর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা, যা শিল্পায়নের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে রাসায়নিক দুর্ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ২০১০ সালের পুরান ঢাকার নিমতলী অগ্নিকাণ্ড। যদিও এটি মূলত একটি অগ্নিকাণ্ড হিসেবে পরিচিত, তবে এর মূল কারণ ছিল একটি কেমিক্যাল গুদামে সংরক্ষিত দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ। পুরান ঢাকার আবাসিক এলাকায় অবৈধভাবে কেমিক্যাল মজুদ করার ফলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এ দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ গুরুতরভাবে আহত হন। তদন্তে দেখা যায়, কোনো ধরনের রাসায়নিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লেবেলিং বা জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা সেখানে ছিল না। এ ঘটনা বাংলাদেশের কর্মস্থলে রাসায়নিক নিরাপত্তার চরম অবহেলার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ যেখানে শিল্পায়ন, নগরায়ণ এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্প, চামড়া শিল্প, ওষুধ শিল্প, কৃষি খাত, নির্মাণ শিল্প, শিপ ব্রেকিং, রঙ ও কেমিক্যাল কারখানা, এমনকি হাসপাতাল ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব রাসায়নিক দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও কর্মস্থলে রাসায়নিক নিরাপত্তার অভাব একটি গুরুতর জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এ নিরাপত্তাহীনতার কারণে হাজার হাজার শ্রমিক নীরবে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন, যা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক রোগ, অকাল মৃত্যু এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাসায়নিক পদার্থ এমন সব উপাদান যেগুলো মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে যদি সেগুলো সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করা হয়। কিছু রাসায়নিক ত্বকের সংস্পর্শে এলে পোড়া বা ক্ষতের সৃষ্টি করে, কিছু চোখের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং অনেক রাসায়নিক শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত অনেক রাসায়নিক আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত হলেও বাস্তবে সেগুলোর ব্যবহার, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। এর প্রধান কারণ হলো প্রশিক্ষণের অভাব, শ্রমিকদের দারিদ্র্য, মালিক পক্ষের অবহেলা এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের কৃষি খাতে রাসায়নিক নিরাপত্তার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কীটনাশক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য উপাদান। আগাছা, ছত্রাক ও ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনের উদ্দেশ্যে সারা বিশ্বে নিয়মিতভাবে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্যের তুলনায় কীটনাশক ভিন্ন, কারণ এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং এগুলো জৈবিকভাবে সক্রিয় ও বিষাক্ত। যদিও কীটনাশকের ব্যবহার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তবে এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করছে। দেশের অধিকাংশ কৃষক কীটনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের সময় কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ ব্যবহার করেন না। খালি হাতে বিষাক্ত তরল মেশানো, মুখে কাপড় বা মাস্ক ছাড়া স্প্রে করা এবং ব্যবহারের পর খালি বোতল পুকুর, নদী বা খোলা মাঠে ফেলে দেয়া একটি সাধারণ চিত্র। ২০১৫ সালে রাজশাহী ও নাটোর অঞ্চলে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, বহু কৃষক নিয়মিত মাথা ঘোরা, বমি, চোখ জ্বালা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন, যার প্রধান কারণ হিসেবে কীটনাশকের অনিরাপদ ব্যবহার চিহ্নিত করা হয়। অনেক কৃষক এ উপসর্গগুলোকে সাধারণ অসুস্থতা হিসেবে ধরে নিয়ে চিকিৎসা নেন না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শিল্প খাতে রাসায়নিক নিরাপত্তার অবস্থা আরো ভয়াবহ। টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় ব্যবহৃত বিভিন্ন রঙ, অ্যাসিড, ক্ষার ও ফিক্সিং কেমিক্যাল থেকে নির্গত বাষ্প শ্রমিকদের শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। ২০১৯ সালে গাজীপুরের একটি ডাইং কারখানায় অ্যাসিড ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতরভাবে আহত হন। তদন্তে দেখা যায়, রাসায়নিক সংরক্ষণ ও ব্যবহারে চরম অবহেলা ছিল এবং শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়নি। একইভাবে নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বহু কারখানায় শ্রমিকরা দিনের পর দিন বিষাক্ত বাষ্প শ্বাস নিয়ে কাজ করছেন, যা তাদের ফুসফুস ও চোখের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হচ্ছে।

চামড়া শিল্প বাংলাদেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, যেখানে রাসায়নিক নিরাপত্তার অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কাজ করা বহু শ্রমিক ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকেন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ট্যানারি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ত্বকের রোগ, শ্বাসকষ্ট ও হজমজনিত সমস্যায় ভুগছেন। অনেক শ্রমিক খালি পায়ে এবং গ্লাভস ছাড়া রাসায়নিকযুক্ত পানিতে কাজ করেন, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এ শ্রমিকদের বেশির ভাগই দরিদ্র হওয়ায় তারা ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও কাজ ছাড়তে পারেন না।

বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প খাত হিসেবে পরিচিত। দেশের অর্থনীতিতে এ শিল্পের অবদান উল্লেখযোগ্য। কারণ এটি বিপুল পরিমাণ লৌহ ও ইস্পাত সরবরাহ করে, বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। তবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে গুরুতর রাসায়নিক ঝুঁকি, যা শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করছে। জাহাজ ভাঙা শিল্পে রাসায়নিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাংলাদেশে টেকসই শিল্পায়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বের অধিকাংশ পুরনো ও বাতিল জাহাজ ভাঙার জন্য বাংলাদেশে আনা হয়। এসব জাহাজ বহু বছর সমুদ্রে চলাচলের সময় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ, জ্বালানি তেল, ভারী ধাতু ও বিষাক্ত উপাদান ধারণ করে। জাহাজ ভাঙার সময় এসব রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি শ্রমিক ও পরিবেশের সংস্পর্শে আসে। পুরনো জাহাজে অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, তেল, গ্রিস, অ্যাসিডিক ও ক্ষারীয় রাসায়নিকসহ অসংখ্য বিপজ্জনক পদার্থ থাকে। এসব রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত নিঃসরণ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজে নিযুক্ত হন। রাসায়নিক পদার্থের ঝুঁকি, নিরাপদ ব্যবস্থাপনা কিংবা ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের বিষয়ে তাদের সচেতনতা খুবই কম। অনেক সময় শ্রমিকরা খালি হাতে বা অপর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে অ্যাসবেস্টস, তেল ও ভারী ধাতুর সঙ্গে কাজ করেন। ফলে তারা শ্বাসতন্ত্রের রোগ, চর্মরোগ, চোখের সমস্যা, স্নায়বিক জটিলতা এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েন।

অ্যাসবেস্টস জাহাজ ভাঙা শিল্পে অন্যতম বিপজ্জনক রাসায়নিক উপাদান। এটি পুরনো জাহাজের ইনসুলেশন, পাইপ, বয়লার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। জাহাজ ভাঙার সময় অ্যাসবেস্টসের সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং শ্বাসের সঙ্গে শ্রমিকদের শরীরে প্রবেশ করে। দীর্ঘমেয়াদে এ কণা ফুসফুসে জমে অ্যাসবেস্টোসিস, ফুসফুস ক্যান্সার ও মেসোথেলিওমার মতো প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে অ্যাসবেস্টস ব্যবস্থাপনার কোনো কার্যকর ও নিরাপদ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত ছিল। ভারী ধাতু যেমন সিসা, পারদ ও ক্যাডমিয়াম জাহাজের রঙ, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ ও ধাতব কাঠামোতে থাকে। এসব ধাতু পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে মাটি ও পানিকে দূষিত করে এবং খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। সিসা স্নায়ুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। পারদ কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করে এবং ক্যাডমিয়াম হাড় ক্ষয় ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। জাহাজ ভাঙা এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এসব রোগের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্প দীর্ঘদিন ধরে একটি অনানুষ্ঠানিক ও দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত খাত হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকার কিছু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। রাসায়নিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী জাহাজ থেকে বিপজ্জনক পদার্থ অপসারণ, সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বাস্তবে অনেক জাহাজ কোনো প্রকার প্রি-ক্লিনিং ছাড়াই ভাঙার জন্য আনা হয়, ফলে সব ধরনের রাসায়নিক ঝুঁকি সরাসরি জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে স্থানান্তরিত হয়। শ্রমিকদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম যেমন হেলমেট, গ্লাভস, রেসপিরেটর, বুট ও সুরক্ষিত পোশাক অপরিহার্য হলেও তা পর্যাপ্তভাবে সরবরাহ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা গরম, অস্বস্তি বা সচেতনতার অভাবে এসব সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করতে অনিচ্ছুক। ফলে রাসায়নিক দুর্ঘটনা, বিষক্রিয়া ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। জাহাজভাঙা এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটে, যার পেছনে দাহ্য রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে

বাংলাদেশে রাসায়নিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে অন্যতম বড় বাধা হলো সচেতনতার অভাব। অনেক শ্রমিকই জানেন না কোন রাসায়নিক কতটা বিপজ্জনক এবং কীভাবে তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে তারা জানলেও দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য হন। মালিকপক্ষও অনেক সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে দেখে এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে গৌণ মনে করে। ফলে একটি অনিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে ওঠে, যেখানে দুর্ঘটনা ও অসুস্থতা যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। আইনগতভাবে বাংলাদেশে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য শ্রম আইন থাকলেও রাসায়নিক নিরাপত্তা বিষয়ে তা পর্যাপ্ত নয়। পরিদর্শন ব্যবস্থা দুর্বল, জনবল সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বহু প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভঙ্গ করেও শাস্তির আওতায় আসে না। বড় কোনো দুর্ঘটনার পর সাময়িকভাবে নজরদারি বাড়লেও ধীরে ধীরে তা শিথিল হয়ে যায়, যা সমস্যাকে স্থায়ীভাবে সমাধান করতে ব্যর্থ হয়।

রাসায়নিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন সঠিক ঝুঁকি মূল্যায়ন। প্রতিটি কর্মস্থলে ব্যবহৃত রাসায়নিকের ধরন, মাত্রা ও সম্ভাব্য ক্ষতি চিহ্নিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সঠিক লেবেলিং, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। বহু দুর্ঘটনার পেছনে ভুল লেবেল বা খোলা পাত্রে রাসায়নিক সংরক্ষণের ভূমিকা রয়েছে। প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রশিক্ষণ রাসায়নিক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ ব্যবহার পদ্ধতি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণের ব্যবহার এবং জরুরি অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা গেলে দুর্ঘটনা ও অসুস্থতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। ব্যক্তিগত সুরক্ষা উপকরণ যেমন গ্লাভস, মাস্ক, রেসপিরেটর ও সুরক্ষা পোশাক ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও বাংলাদেশে এসব সরঞ্জামের ব্যবহার এখনো সীমিত। কর্মস্থলে রাসায়নিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। অসুস্থ শ্রমিক মানে কম উৎপাদনশীলতা, বেশি অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বৃদ্ধি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ শ্রমিকদের মনোবল ও দক্ষতা বাড়ায়, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠান ও দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।

সবশেষে বলা যায়, কর্মস্থলে রাসায়নিক নিরাপত্তা বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত বিষয়। শিল্পায়নের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা না হয়, তবে উন্নয়নের সুফল নষ্ট হয়ে যাবে অসংখ্য শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্যের বিনিময়ে। একটি নিরাপদ ও মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। রাসায়নিক নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাংলাদেশ একটি স্বাস্থ্যকর, উৎপাদনশীল ও মানবিক কর্মসংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।

ড. শফি মুহাম্মদ তারেক: অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; ফেলো, রয়্যাল কেমিক্যাল সোসাইটি এবং চার্টার্ড পরিবেশবিদ, যুক্তরাজ্য