অর্থাৎ একজন শ্রমিক তার শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে যে পরিমাণ গুণগত মানসম্পন্ন দ্রব্য বা সেবা উৎপাদন করতে পারে, তার পরিমাণই হলো শ্রমের দক্ষতা। শ্রমের দক্ষতা প্রধানত নির্ভর করে শ্রমিকের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক সামর্থ্য, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং কাজের প্রতি আগ্রহের ওপর। বাংলাদেশে যুবসমাজের কর্মদক্ষতা বা উৎপাদনশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নিম্ন পর্যায়ের। এরূপ উৎপাদনশীলতা দিয়ে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা প্রায় অসম্ভব।

বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে (আরএমজি) ঘণ্টাপ্রতি শ্রম উৎপাদনশীলতা মাত্র ৩ দশমিক ৪০ ডলার। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ চীনে এ হার ১১ দশমিক ১০ ডলার। কম্বোডিয়া ছাড়া এশিয়ার অন্য সাতটি প্রধান পোশাক উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রতি ঘণ্টার পোশাক উৎপাদনশীলতা এখনো কম। বাংলাদেশের বার্ষিক মাথাপিছু উৎপাদনশীলতা যেখানে ১০ হাজার ৪০০ ডলার, সেখানে ভারতে তা ১৫ হাজার ৮০০ ও চীনে ২৩ হাজার ৮০০ ডলার।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এশিয়া প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে বার্ষিক শ্রম উৎপাদনশীলতা ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের কম উৎপাদনশীলতার কারণ আধুনিক প্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার, শ্রমিকদের পেশাগত দক্ষতার অভাব, মানসম্মত প্রশিক্ষণের অভাব ও দুর্বল কর্মপরিবেশ।

প্রতি বছর ১৫ জুলাই বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস পালিত হয়। তরুণ সমাজকে কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়া এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতার মাধ্যমে প্রস্তুত করার গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের মূল তাৎপর্য। বাংলাদেশে কেবল গতানুগতিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ওপর নির্ভর না করে, ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়াতে হবে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে। প্রযুক্তি ও অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল ও সবুজ প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোয় দক্ষ করে তুলতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে বের করে এনে উদ্যোক্তা হতে এবং নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কর্মক্ষম যুবসমাজকে দক্ষ করে তুললে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, যা দারিদ্র্য দূর করে জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়তা করবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং নতুন ফ্রেমওয়ার্ক চালুর মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ লক্ষ্যে গৃহীত প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—

জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) গঠন: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে সংস্থাটি গঠন করা হয়েছে। সংস্থাটির কাজ হলো সব ধরনের দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং যুগোপযোগী কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

প্রশিক্ষণ কর্মসূচি (SEIP ও SICIP): এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বিনিয়োগ কর্মসূচি (SEIP) সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় বর্তমানে শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য (SICIP) প্রকল্প চলমান রয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা ফ্রেমওয়ার্ক (বিএনকিউএফ): সাধারণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন স্তরের দক্ষতার স্বীকৃতি দেয়া সহজ হচ্ছে।

দক্ষতা বৃদ্ধিতে নীতি সহায়তা প্রদান: প্রবাসী শ্রমিক, বেকার তরুণ এবং নারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও নীতি সহায়তা দেয়া হচ্ছে।

এছাড়া সরকার দেশের তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে প্রশিক্ষণমূলক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে আর্ন (Earn) প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫-৩৫ বছর বয়সী পাঁচ লাখ নারীসহ মোট নয় লাখ তরুণকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার কাজ চলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে (যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া) কর্মসংস্থান সহজ করতে ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে। তরুণ উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে ‘‌স্টার্টআপ বাংলাদেশ’ ও ‘‌আইডিয়া’ প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা ও পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) স্থাপন করা হচ্ছে, যাতে তরুণরা বৃত্তিমূলক বা ট্রেড কোর্স শিখতে পারে। উপজেলা পর্যায়ে চাকরি প্রার্থীদের তথ্য ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দিতে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ সেন্টার’ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিটি ও কর্মমুখী দক্ষতা শিক্ষা চালু করতে ইউনিসেফের সহায়তায় প্রজন্ম অসীম প্রোগ্রাম কাজ করছে। ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট ও এআই প্রযুক্তির ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের গ্লোবাল রিমোট জবের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে তরুণদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। তরুণদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপগুলো নেয়া দরকার—

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি): সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় জোর দিতে হবে, এতে অল্প সময়ে দক্ষ কর্মী তৈরি হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘ইকোনমিক এক্সিলারেশন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফর নিট (ইএআরএন)’ প্রকল্পটি অধিকতর বাস্তবসম্মত ও কর্মসংস্থানবান্ধব প্রশিক্ষণ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং, রোবোটিকস, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, পারমাণবিক শক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, চতুর্থ প্রজন্মের কম্পিউটারে ভাষার ব্যবহার, প্রায়োগিক শিক্ষার ওপর অঞ্চলভিত্তিক নিবিড় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি: তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রোগ্রামিং এবং গ্রাফিক ডিজাইনের মতো বিষয়গুলোয় তরুণদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোয় কর্মসংস্থানের সঙ্গে বা ভবিষ্যৎ চাকরির সম্ভাবনা মাথায় রেখে কয়েক বছর পর পর শিখন প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করতে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা হয়। আমাদেরও আগামী দিনের কর্মসংস্থানের ধরন বিবেচনায় রেখে উন্নত দেশের মতো পাঠ্যক্রম ও শিখন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। তাছাড়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যবহারিক পাঠদান ফলপ্রসূ করার জন্য প্রতিটি স্কুল-কলেজে আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন করতে হবে।

ইংরেজি ও যোগাযোগ দক্ষতা: বৈশ্বিক চাকরির বাজারে টিকে থাকতে ইংরেজি ভাষায় কথা বলা ও লেখার দক্ষতা বাড়াতে হবে। দেশে ও বিদেশে সম্মানজনক এবং উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থানের জন্য আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিসহ কমপক্ষে দুটি ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আমাদের শ্রমিকরা বেশি কাজ করেন, তাদের আরবি ভাষা জানা থাকলে এসব শ্রমিকের যোগাযোগ দক্ষতা বাড়বে এবং তারা বেশি কাজের সুবিধা পাবেন। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষার শিক্ষক নিয়োগ, অত্যাধুনিক ল্যাব স্থাপন করতে হবে। এছাড়া পর্যায়ক্রমে কায়িক শ্রমঘনিষ্ঠ কাজের চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক পেশায় মনোযোগ দিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। ভবিষ্যৎ বিশ্বের শ্রমবাজার যাচাই করে তরুণদের ইংরেজি, চায়নিজ, জাপানিজ, কোরিয়ান ইত্যাদি প্রয়োজনীয় ভাষা শিক্ষা দিতে হবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও চাকরির বাজারের মধ্যে দূরত্ব কমাতে হবে, সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। দেশী, বিদেশী শ্রমের চাহিদা অনুযায়ী তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

উদ্যোক্তা তৈরি: তরুণদের নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং ব্যবসার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

তরুণদের সুদক্ষ করতে না পারলে সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য তারা বোঝা হয়ে থাকবে। ফলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিতসহ শ্রেণীবৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। তাই আগামী দিনের কর্ণধার হিসেবে যুবকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ একটি প্যাকেজ থাকা উচিত, যেখানে তরুণদের শিক্ষা গ্রহণ থেকে শুরু করে চাকরির সুযোগ, সামাজিকতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, বিনোদনের সুযোগ, মানবতা, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সচেতনতা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তদুপরি বিশ্বের বিপুলসংখ্যক তরুণদের সুদক্ষ করে গড়ে তোলার দায়িত্বের অংশ হিসেবে জাতিসংঘকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য আর্থিক, কারিগরি ও পরামর্শমূলক বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

মোছা. নূরজাহান খাতুন: (অব.) অতিরিক্ত সচিব