দেশে উচ্চশিক্ষার পরিবেশ ক্রমাগতভাবে অবনমন ঘটেছে। বিশেষত গত দেড় দশকে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির নামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যাপক মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সেভাবে নিয়মনীতির পরিপালন হয়নি। এতে যোগ্য শিক্ষকেরও ঘাটতি তৈরি হয়, যা শিক্ষার মানে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। আবার শিক্ষাগত দিক থেকে অনেক যোগ্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ শোনা গেছে। সব মিলিয়ে এক প্রকার জিম্মি অবস্থায় ছিল উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা। যে কারণে বিগত সরকার পতনের পর প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়েছিল। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ শীর্ষস্থানীয় বেশির ভাগ কর্মকর্তা পালিয়ে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া লাগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগেও। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে অনেক শিক্ষক পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। সব মিলিয়ে দীর্ঘকাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকে এবং শিক্ষক সংকট প্রকট হয়ে ওঠে, যার সমাধান এখনো হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রত্যাশা ছিল নতুন সরকারের মাধ্যমে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নয় মাস পেরিয়ে গেলেও বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সে প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং একের পর এক সংঘর্ষ, আন্দোলন, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে চলেছে। শিক্ষার পরিবেশ এখনো স্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, সম্প্রতি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে অনশনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ভিসিসহ ১২ শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। এর আগে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থী খুন হয়েছেন নিজ ক্যাম্পাসেই। কুয়েট, ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, বুটেক্স, জাহাঙ্গীরনগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষ, অনশন, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘটনা প্রমাণ করছে—একটি বড় অংশের শিক্ষার্থী এখনো পড়াশোনার বাইরে। বর্তমানে শিক্ষাঙ্গনে নানামুখী সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই তথাকথিত ন্যায়বিচার নিশ্চিতে উদ্যত হচ্ছে, যা মব ভায়োলেন্স বা মব লিঞ্চিংয়ের রূপ নিচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভাজন, প্রশাসনিক দুর্বলতা, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব এবং অস্বচ্ছ নীতিমালা শিক্ষাঙ্গনের সংকটকে আরো গভীর করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সবার উচিত অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যার মাধ্যমে একদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠন হবে, অন্যদিকে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আন্দোলন-সংঘর্ষের পেছনে কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন আছে কিনা—সে বিষয়েও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
উচ্চশিক্ষা মানুষের জ্ঞানের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি তার প্রায়োগিক জ্ঞানের মাধ্যমে দেশ ও অর্থনীতির সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হন। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ। সেখানে নিরাপত্তাহীনতা, শৃঙ্খলার অভাব কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদে বারবার শিক্ষাজীবন স্থবির হয়ে পড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অচিরেই এ সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ দ্রুত স্বাভাবিক করতে হবে।
শিক্ষাঙ্গনকে স্বাভাবিক করতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে সহায়ক হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বন্ধ করা আবশ্যক। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত রাখা, নয়তো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগের পরিবেশ ফিরে আসবে ক্যাম্পাসগুলোয়। এর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষা-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এজন্য যোগ্য শিক্ষকও আবশ্যক। তাই শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া হতে হবে মেধাভিত্তিক। স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ বন্ধের সংস্কৃতি দূর করা জরুরি। এতে শিক্ষার মান নিশ্চিত করাও সহজ হবে।
এমনিতেও মানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবস্থানগত দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মান নিয়ে প্রতি বছর ‘কান্ট্রিজ উইথ বেস্ট পারফর্মিং এডুকেশন সিস্টেম’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন। গত বছর ম্যাগাজিনটি শিক্ষা মানের ভিত্তিতে ৯৩টি দেশের র্যাংকিং প্রকাশ করেছে যেখানে বাংলাদেশের নাম নেই। আবার গত বছর প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে দুই হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশের মোট ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে ঠিকই, তবে বিশ্বের সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় নাম নেই কোনো প্রতিষ্ঠানের। এটিও শিক্ষার মান, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত, গবেষণার মান, সাইটেশন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীসহ কয়েকটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত হয়। বিশ্বের ১১৫টি দেশের মধ্যে এ মূল্যায়ন করা হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে থাকার কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমের অপ্রতুলতা ও পাঠ্যক্রমকে দায়ী বলে মনে করেন অধিকাংশ শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতসংশ্লিষ্টরা। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো প্রয়োজন। বিশ্বায়নের এ যুগে উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিতের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন নয়তো ব্যাহত হবে। বর্তমানে উচ্চ শিক্ষিতদের অনেকেই চাকরি না পেয়ে রাষ্ট্রের জন্য বড় বোঝা তৈরি হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে কর্মমুখী শিক্ষার বিকাশে মনোযোগ দিতে হবে।
গবেষণা কার্যক্রমের অপ্রতুলতা, শ্রমবাজারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, এর সম্প্রসারণ সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে হয়নি। সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়। যেমন বিগত সরকারের শেষ সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। আবার দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৫। এর মধ্যে ২৫টিই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এ সরকারের আমলে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করায় উচ্চশিক্ষার মান কমেছে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এছাড়া আরেকটি সমস্যা হলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশে মানসম্পন্ন শিক্ষক নেই। উপরন্তু দুর্বল ব্যবস্থাপনায় একটা ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে। সার্টিফিকেটসর্বস্ব ডিগ্রিধারী বেড়েছে। কিন্তু মানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এছাড়া দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নানা ব্যবধান ও বৈষম্য বিদ্যমান। এসব সংকটের সমাধান না হলে উচ্চশিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরবে বলে প্রতীয়মান হয় না।
দেশে উচ্চশিক্ষার যেমন পরিসর বেড়েছে, তেমনভাবে শিক্ষার মানের বিকাশেও মনোযোগ দিতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন না ঘটায় এখানে শিক্ষার পরিবেশ ক্রমাগতভাবে অধঃপতিত হয়েছে। তাই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সব সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে যাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে ওঠে। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হয়।










