ডেঙ্গু ভাইরাসের তাণ্ডব এখন শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপ করা হয় যে মাপকাঠিতে তা হলো বিআই বা ব্রুটিও ইনডেক্স। এ ইনডেক্স করা হয় মূলত এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। এ বিআই হলো কোনো নির্দিষ্ট স্থানে প্রতি ১০০টি বাড়িতে কতগুলো পাত্রে লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যায় তার ওপর ভিত্তি করে। এ সূচকের মান ২০-এর বেশি হলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ বলে মনে করা হয়। সেখানে বরগুনা পৌরসভার মধ্যে এর মান ৪৭ দশমিক ১০ এবং সদর উপজেলায় এ সূচকের মান ১৬৩ দশমিক শূন্য ৪। তাহলে বুঝতেই পারছেন মশার ঘনত্ব কতটা ভয়ংকর। তাহলে ডেঙ্গুর তাণ্ডবলীলা কেন হবে না? এবার আসি এ পরিস্থিতির মূল কারণ কী। আমরা জানি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে ডেঙ্গুর ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার দুই প্রজাতির। এরা হলো এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস। ২০২৪ সালে এক জরিপে দেখা গেছে দুই প্রজাতির মধ্যে নগর বা শহরে ৯৯ শতাংশই হলো এডিস ইজিপ্টাই এবং ১ শতাংশ হলো এডিস অ্যালবোপিকটাস।

কিন্তু গ্রামে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। ২০২৪ সালে নিপসম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চলে ৯৫ শতাংশ এডিস অ্যালবোপিকটাস এবং ৫ শতাংশ এডিস ইজিপ্টাই। এর কারণ এডিস অ্যালবোপিকটাসকে বলা হয় জঙ্গলের মশা। এদের মূল প্রজননস্থল হলো প্রাকৃতিক উৎস। যেমন কলাগাছের পাতার গোড়ায়, বাঁশের ট্রাম্পের মধ্যে, কচুগাছের লিফ এক্সাইলে প্রভৃতিতে। আর এডিস ইজিপ্টাই হলো ডোমেস্টিক মশা। এরা সাধারণত কৃত্রিম পানির উৎস যেমন টায়ার, নারকেলের মালাই, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের পাত্র বালতি, নির্মাণাধীন বাড়ির নিচের ফ্লোর প্রভৃতিতে প্রজনন ঘটিয়ে থাকে। এ মশার ঘনত্ব নির্ভর করে শহরে বাড়ির ধরন, অবস্থান, পানি জমার পাত্রের উপস্থিতি, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রভৃতির ওপর। গ্রামে এডিস অ্যালবোপিকটাসের ঘনত্ব নির্ভর করে বাড়ির আশপাশে অবস্থিত ঝোপ ঝাড়, পানি জমার পাত্রের উপস্থিতি এবং কৃত্রিম উৎস দুটোতেই।

শহর থেকে গ্রামে কেন এতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি হলো। বিশেষ করে বরগুনায়। যেখানে সারা দেশে ৮ হাজার ৮৭০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর মধ্যে ৩ হাজার ৯৮৫ জনই বরিশাল বিভাগে এবং ২ হাজার ৪০৭ জন বরগুনা উপজেলায়। সারা দেশে ৩৬ জন মৃত্যুর মধ্যে নয়জনই বরিশালে এবং ছয়জনই বরগুনায়। এ তীব্রতার কারণ ও প্রতিকার কীভাবে সম্ভব। কারণ তো আগেই বলা হয়েছে মশার ঘনত্বের কথা। মশার ঘনত্ব যত বাড়বে, রোগীর সংখ্যা ততই বাড়বে। তবে যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে, তা হলো আক্রান্ত মশার উপস্থিতি ও জনসচেতনতা। এডিস অ্যালবোপিকটাসের ঘনত্ব আগে থেকেই গ্রামে রয়েছে। তবে তারা ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ছিল না। যথাযথ কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের অভাবে শহর থেকে যখনই কোনো মশা দ্বারা ভাইরাসটি গ্রামের মানুষকে আক্রান্ত করছে এবং তা সঠিকভাবে দমন করা হয়নি ঠিক তখনই আক্রান্ত মশা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বাধাহীনভাবে চালাতে থাকে তার ভয়াল আক্রমণ। ক্রস ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে ক্রমাগত মানুষকে আক্রমণ করেই চলছে। সংখ্যা বাড়ছে রোগীর। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। জনসচেতনতার অভাবে ক্রমেই বাড়ছে মৃত্যু। দিশেহারা হয়ে পড়ছে মানুষ। বিমর্ষ হয়ে পড়ছে স্বজন হারানোর বেদনায়। বরগুনার মানুষের হাহাকারে ক্রমেই ভারী উঠছে বরগুনার বাতাস। বরগুনার মানুষ বরাবরই প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। খাবার পানির সংকট বিধায় বিভিন্ন পাত্রে পানি ধারণ করে রাখে। ধরে রাখা পানির মধ্যে যে এডিস মশার লার্ভা জন্মায় তা তাদের বোধগম্যের মধ্যে নেই। তারা মনে করে এটি স্বাভাবিক পানির পোক (পোকা)। কিন্তু এটি যে ডেঙ্গুর ভাইরাসের প্রধান বাহক মানুষের পরম শত্রু এডিস মশার লার্ভা তা তাদের চিন্তার বাইরে ছিল। জীবন সংগ্রামে নিয়োজিত মানুষেরা তাদের শত্রুকে নিজের ঘরেই পালছে নিজের অজান্তে। তাই এখন সময় এসেছে শুধু বরগুনাবাসী নয়, সারা দেশের মানুষকে সচেতন হওয়ার। খাওয়ার পানির পাত্র অবশ্যই সপ্তাহে কমপক্ষে দু-দুবার ডিটারজেন্ট পাউডার দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে আবার পানি ধরে রাখতে হবে। বাড়ির চারপাশে যেখানে এডিস মশা (এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস ইজিপ্টাই) ডিম পাড়তে পারে, তা ধ্বংস করতে হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যে ইউনিট রয়েছে যেমন পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ প্রভৃতির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ করবেন। সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিতভাবে যথাক্রমে লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগে মূল্যায়ন এবং তদারকি করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে নিয়ে জনসচেতনতামূলক কমিটি গঠন করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যুবসমাজ পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। এদেরকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। জেলা প্রশাসন হতে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যন্ত একটা চমৎকার আন্তঃসম্পর্ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে সমন্বিতভাবে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করে ডেঙ্গু মোকাবেলা করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অন্য সম্ভাব্য স্থানগুলোয় একই ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রচলিত কীটনাশকের অ্যাকটিভ ইনগ্রিডেন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে তা মশার ওপর কতটুকু কার্যকর তাও পরীক্ষা করতে হবে। মোট কথা ইন্টিগ্রেটেড ডেকটর ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচে ক্রাশ প্রোগ্রাম চালাতে হবে। এ কাজে কীটতাত্ত্বিক পরামর্শ অত্যন্ত জরুরি। মশার বায়োলজি, ইকোলজি, আচরণগত পরিবর্তন প্রভৃতি সাপেক্ষে একটি টেকসই পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগেই আসতে পারে স্বস্তি। সবসময়ই মনে রাখা প্রয়োজন এটি একটি মশাবাহিত রোগ। এতে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা। গুজবে নয়, বাস্তবে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। সর্বোপরি ১ হাজার ৮৩১ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বরগুনা জেলা। যেখানে মাত্র ১০ লাখ ১০ হাজার লোকের বাস। এ জনগোষ্ঠীসহ সারা দেশের মানুষকে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে আসুন সবাই মিলে সোচ্চার ও সম্পৃক্ত হই।

ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), মহাখালী, ঢাকা