প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ও সরবরাহ ক্রমেই কমার বিপরীতে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে নতুন করে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় আবাসনে এ জ্বালানি পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যায়। তবে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে শিল্প খাতেও এর চাহিদা ও ব্যবহার বেড়েছে। এমনকি দেশের ৬০ হাজার রেস্তোরাঁর ৮০ শতাংশই এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। সব মিলিয়ে দেশে এলপিজির চাহিদা ১৫ লাখ টনের ওপরে। কিন্তু পণ্যটির বাজার প্রসারিত হলেও এর ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের দুর্বলতা রয়ে গেছে। টানা কয়েক দিন ধরে দেশে যে তীব্র এলপিজি সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিক নানা ঘটনাপ্রবাহের প্রভাবের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতারও দায় রয়েছে। আর এসব সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও জনগণের ওপর বড় অভিঘাত নেমে আসবে। সরকারের দ্রুত এ সংকট সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের সংকটাপন্ন পরিস্থিতি তৈরি যেন না হয়, সেটি নিশ্চিতেও টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিভিন্ন দেশের নানা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এলপিজির বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের এলপিজি বাজারেও। আর নিজস্ব মজুদের সক্ষমতা না থাকায় এ সংকট যে আরো তীব্র হয়েছে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষয়টি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই তুলে ধরে। এতে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অনেকের মতে, দেশের বৃহৎ কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানির আমদানি সীমিত হয়ে পড়ায় বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এসব কোম্পানির অনুপস্থিতিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পূরণে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি বাড়াতে চাইলেও সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদন দেয়া হয়নি। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হয়নি। আবার বর্তমানে বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহকে পুঁজি করে উচ্চ মুনাফার আশায় অনেক ব্যবসায়ী বাজারে কৃত্রিম এলপিজি সংকট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রেও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে না পারার দায় সরকারের ওপর কিছুটা হলেও বর্তায়। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা অতীতেও দেখা গেছে। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তবে সময়ের পরিক্রমায় অনিশ্চয়তা কেটে গিয়ে দাম কমার নজিরও আছে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে দাম কমার নজির অনেক ক্ষেত্রেই বিরল। তাই বিশ্ববাজারে এলপিজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পরও যে দেশের বাজারে এর কৃত্রিম সংকট ও দাম কমে আসবে, সেটি নিশ্চিত বলা যায় না। এগুলো অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনারই প্রতিফলন। তাই বর্তমান সংকট সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে এ জ্বালানি পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির উচ্চ চাহিদা থাকে। যে কারণে এমনিতেই দাম বেড়ে যায়। আবার দেশেও শীতকালে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রবাহ কম থাকে। ফলে এলপিজির চাহিদা হয় ঊর্ধ্বমুখী। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। এ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারের আগাম পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত আমদানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। যাতে এলপিজির সংকট তৈরি না হয় এবং সহনীয় মূল্যে বিক্রি করা যায়। তাছাড়া এলপিজি সরবরাহ সংকটের আভাস আগে থেকে পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে জনগণ ও ব্যবসায়ীদের ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে। এখনো দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। এরই মধ্যে নতুন করে সবাই আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নিয়মিত এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয়। তবে সেই দাম বাজারে কার্যকর হচ্ছে কিনা তা দেখার সক্ষমতা বা সদিচ্ছায় বড় ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। যে কারণে ব্যবসায়ীরা এলপিজির দাম ইচ্ছামতো বাড়াচ্ছেন। রান্নার গ্যাসের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে এমন লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বর্তমানে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো কঠোর তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা বললেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব দৃশ্যমান নয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নীরবতাও এখানে প্রশ্নবিদ্ধ।

সামগ্রিকভাবে চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কোথাও এলপিজির কৃত্রিম মজুদ যাতে না থাকে সেটি নিশ্চিতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি দাম নিয়ন্ত্রণেও এলপিজির বাজার তদারকি আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এছাড়া যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি পরিবহনে জাহাজ সংকট রয়েছে, সেটি সমাধানের উদ্যোগও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মাধ্যমে জাহাজ ভাড়া করে এলপিজির পরিবহন সংকট দূর করার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। এছাড়া সম্প্রতি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এলপিজি আমদানি করার অনুমতি চেয়েছে। জিটুজি পদ্ধতিতে সংস্থাটি এলপিজি আমদানি করতে চায়। যদি দ্রুততার ভিত্তিতে এটি কার্যকর করা যায় তাহলে এলপিজি বাজার পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে এলপিজি আমদানি করে সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ভার বেসরকারি অপারেটরদের হাতে তুলে দিলে পণ্যটির বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তাই বিপণনের বিষয়টিও কীভাবে সরকারি উদ্যোগে হতে পারে সেটি চিন্তা করা প্রয়োজন। এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদে এলপিজি আমদানিতে সরকারের হিস্যা বাড়ানো দরকার।

বর্তমানে দেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করে থাকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। এলপিজি আমদানি ও বিপণনের জন্য বর্তমানে ৫৮টির লাইসেন্স থাকলেও বাজারে আছে ২৮টির মতো কোম্পানি। আবার লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও কার্যকরভাবে বাজারে সক্রিয় কোম্পানির সংখ্যা তুলনামূলক কম। বড়জোর পাঁচ থেকে ছয়টি। ফলে এলপিজির বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক করা যায়নি। এতে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আবার এলপিজি আমদানি বেসরকারি খাতনির্ভর হওয়ায় এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। এসব কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না হলে ভবিষ্যতেও এমন সংকট বারবার ফিরে আসবে। কিছু বড় কোম্পানির আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প সরবরাহ দ্রুত বাড়ানোর সক্ষমতা অন্যদের থাকে না। সরকারি অনুমোদন ও প্রশাসনিক জটিলতা এক্ষেত্রে সংকটকে আরো দৃঢ় করে। এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরকারের এলপিজির আমদানি ও সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।