নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নগর, বন্দর, শহর, গ্রাম, জেলেপাড়া, বাণিজ্য কেন্দ্র প্রভৃতি। এ নদীকে ঘিরেই ছিল আদিকালের যাতায়াতের সব ব্যবস্থা। কৃষি, মৎস্য, জেলেদের পেশা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি মানুষের নিত্যদিনের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ সবকিছুর একমাত্র উৎস ছিল নদী। কিন্তু সেই নদী আজ দখল-দূষণ আর ভরাটের প্রতিযোগিতায় বিপন্ন, অনেকাংশে বিলুপ্ত। সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে শহর-বন্দরের পয়োবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য। বিষাক্ত সব রাসায়নিক এবং প্লাস্টিক ও পলিথিনের দূষণে নদীগুলো ভয়ংকর দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দূষণের কারণে এখন মাছ ও জলজ প্রাণী মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে। চাঁদপুরে মেঘনা নদীর এখলাসপুর থেকে ছটাকি পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটারজুড়ে জানুয়ারির শেষ দিকে সপ্তাহজুড়ে প্রচুর মাছ ও জলজ প্রাণী মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। স্রোত ও ঢেউয়ে ভেসে নদীর তীরে এসে জমা হয় প্রচুর জাটকা পোনা, পোয়া, বেলে, চিংড়ি, কাঁকড়া, ব্যাঙ, শামুক, ঝিনুকসহ নানা ধরনের জলজ প্রাণী। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেঘনার অববাহিকায় কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে এবং বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী দিয়ে ভেসে আসা নানা ধরনের বর্জ্য মিশে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে, যা মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে। পানিদূষণের কারণে মেঘনায় মাছ ও জলজ প্রাণীর মড়কের এটিই প্রথম নজির নয়। এর আগে ২০২৩ সালেও মেঘনার মতলব উত্তর উপজেলাধীন অংশে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক টন মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা যায়। সে সময়ও অনুসন্ধানে একই কারণ উঠে এসেছিল বলে জানা গেছে। নদীর পানিতে মাছ ও জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধসহ নদী দখল ও দূষণ ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ জরুরি।

দেশের নদ-নদীর চিত্র যখন এমন সেসময় গতকাল আন্তর্জাতিক নদীরক্ষা দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘আমাদের নদী, আমাদের জীবন’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে সারা দেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ পালন করা হয়েছে। ১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৭ সালের মার্চে ব্রাজিলের কুরিতিয়া শহরে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশ থেকে আন্তর্জাতিক নদীরক্ষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নদীর প্রতি মানুষের করণীয়, নদীরক্ষায় দায়িত্ব, মানুষের দায়বদ্ধতা কতটুকু—এসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হলেও নদী দখল কিংবা দূষণ কোনোটিই কমেনি। বরং মানুষ নদী দখল করে হাটবাজার, বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছে।

ঢাকার চারপাশের চার নদী—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা আর বালু। এ নদ-নদীগুলো ঢাকার প্রাণ। দূষণ-দখলের কবলে থেকে রাজধানীর কোলঘেঁষা নদীগুলোকে আর বাঁচানো যাচ্ছে না। প্রতিদিনই দূষণ বাড়ছে, বাড়ছে দখলদারদের সংখ্যা। রাজধানী ঢাকার পরিবেষ্টিত নদীগুলোকে দূষণের হাত থেকে রক্ষার শতচেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। শঙ্কার কথা, রাজধানীর কোলঘেঁষা এসব নদ-নদী না বাঁচানো গেলে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে, ঘটতে শুরুও করেছে। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগব্যাধিতে। এখনই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, দূষণের কারণে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। দূষিত হতে হতে পানি তার স্বাভাবিক ঘনত্বটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে অনেক নদীতে আগে থেকেই মাছ নেই। শীতলক্ষ্যা ও বালুতে মাছ ধরতে জেলেদের দেখা যায় না। মাছ থাকার মতো অবস্থা নেই। নদীগুলো এখন বর্জ্য ফেলার ভাগাড়। পলিথিন, ট্যানারিসহ শিল্প-কারখানা ও হাসপাতাল-ক্লিনিকের বিষাক্ত বর্জ্যে ভরপুর নদীর পানি।

মেঘনায় গত জানুয়ারির শেষ দিকে মাছ ও জলজ প্রাণীর মড়ক দেখা দেয়ার পর শুরুতেই দূষণের কারণে এ ঘটনা ঘটছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছিল। এর পর এ ঘটনার তদন্তে গত ২৭ জানুয়ারি পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যরা ৩০ জানুয়ারি মেঘনার বিভিন্ন অংশে দিনে ও রাতে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ও তাপমাত্রা পরিমাপের পাশাপাশি এর মধ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক ও দূষণ উপাদানের উপস্থিতি পরিমাপের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন। তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে, নারায়ণগঞ্জ লঞ্চঘাট থেকে শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী এবং মেঘনা নদীর মতলব ও চাঁদপুরের বাবুবাজার পর্যন্ত পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের উপস্থিতি ছিল গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর মিলিত প্রবাহ এবং মেঘনা নামে প্রবাহিত ধলেশ্বরী ও মেঘনা নদীর মিলিত প্রবাহ এলাকায় বিশাল জলরাশিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা খুবই কম। ফলে এ এলাকায় জলজ প্রাণীর জীবনধারণ কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি নদীর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দূষণ ক্ষমতা রয়েছে। ক্ষমতা নির্ভর করে নদীর ধারণক্ষমতা, উজানের প্রবাহ, অখণ্ডতা, পানির তাপমাত্রা ইত্যাদির ওপর। নদীতে নির্গত দূষণের পরিমাণ তার সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে নদী আর কার্যক্ষম থাকে না। মেঘনাসহ বাংলাদেশের নদীগুলোয় দূষণ যেভাবে মাত্রা ছাড়িয়েছে, তা নদীর স্বাস্থ্য ও প্রাণবৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

নদীতে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা, দূষণমুক্ত রাখা এবং দখল রোধে জড়িত আছে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। নদীর অবৈধ দখল ও পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে আরো আছে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন। তবু রক্ষা পাচ্ছে না নদীর দখল ও দূষণ। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সর্বত্রই আমরা ময়লা-আবর্জনা সব নদীতে ফেলছি। শিল্প-কারখানার বর্জ্য গিয়ে পড়ছে নদীতে। উজান থেকে নেমে আসা পলি এসে পড়ছে নদীতে। ময়লা-আবর্জনার কারণে একদিকে যেমন জলজ প্রাণী হুমকিতে পড়ছে, অন্যদিকে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদীকে এখনই রক্ষা করতে না পারলে বাংলাদেশে তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দেবে। শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য, শহরের কঠিন বর্জ্য এবং নৌযানের বর্জ্য—এ চারটি বড় উৎসকে নদীদূষণের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। নদীদূষণের উৎস যেমন একাধিক, তেমনি দূষণ রোধ ও তদারকি করার কর্তৃপক্ষও একাধিক। রাজধানীসহ বিভিন্ন বড় শহরের পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা করে ওয়াসা, শিল্প-কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ অধিদপ্তর, কঠিন বর্জ্য অপসারণ ও পরিশোধন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার আর নৌযানের বর্জ্য অপসারণ ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএর। তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করলে নদ-নদীর এ অবস্থা হওয়ার কথা নয়।

নদীদূষণ রোধে প্রথমেই নজরদারি বাড়াতে হবে। যেসব কারণে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে তা উৎস থেকে নজরদারির মাধ্যমে বন্ধের পাশাপাশি দূষিত তরল নদীতে ফেলা রোধ করতে হবে। এর জন্য যে আইনগুলো আছে সেগুলো প্রয়োগ জরুরি। নদীর প্রাণপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য, নদীগুলোর রাসায়নিক ও জীববৈচিত্র্যগত মান বজায় রাখার জন্য বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের নদ-নদী, জলাভূমি দখল ও দূষণ প্রতিরোধে কঠোর আইন, নৌপথকে সচল রাখতে নদীগুলোকে খনন, নদী ও জলাভূমির দূষণ রোধে সব কারখানায় শিল্পবর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নির্মাণে সরকারকে অবিলম্বে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে অভিযোগ আছে, পরিশোধন যন্ত্র থাকলেও কোনো কোনো কারখানায় বর্জ্য পরিশোধন না করে সরাসরি তা নদী ও পাশের খাল এবং নর্দমায় ফেলে দেয়া হয়। এতে বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ আমাদের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি হয়। কাজেই নদীদূষণ রোধেও নিতে হবে কার্যকর ব্যবস্থা। কেননা নদীর পানিতে দূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেলে তা শুধু মাছ নয়, জলজ অন্যান্য প্রাণীর জন্যও হুমকিস্বরূপ। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা শূন্য হলে মাছের মড়ক দেখা দেবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে শিল্প-কারখানার বর্জ্য। প্রথমে এ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নদীতে পানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। স্যুয়ারেজ বর্জ্য, রাসায়নিক উপাদান, বিভিন্ন নৌযান থেকে সৃষ্ট বর্জ্য জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। শিল্প-কারখানা ও কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক মাছ ও জলজ প্রাণীর জন্য বিষ হিসেবে কাজ করে। মাছ ও জলজ প্রাণীর জন্য দরকার উপযুক্ত পরিবেশ। মাছের বংশবিস্তারকে ব্যাহত করে। নদীর পানির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং মাছের উৎপাদন বাড়াতে নদীর পানির দূষণ ও দখলমুক্ত অপরিহার্য।