যেকোনো দেশের জনপ্রশাসন যদি দক্ষ ও গতিশীল না হয় তাহলে সেটি জনগণের যথাযথ সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার হতে হয় জনগণকে। সরকারি সেবা খাতে শ্লথগতি দেখা যায় যা সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবন মান ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই একটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হয় জনপ্রশাসন খাতকে। দুঃখজনকভাবে দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনামলে এ দেশের জনপ্রশাসন কেবল মাথাভারী এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। পুরো জনপ্রশাসনকে দলীয়করণ করা হয়েছে। জনপ্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে দলীয় আনুগত্যকে। যোগ্যতা ও মেধা ছিল নিয়োগের ক্ষেত্রে বিবেচনা-বহির্ভূত। পদোন্নতিও দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। এমনকি পদ না থাকার পরও অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে, যেগুলোর বেশির ভাগই ছিল শীর্ষস্থানীয় পদ। অথচ জনগণের সেবক হিসেবে জনপ্রশাসনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চেয়ে নিচের সারিতে বেশি লোকবল নিয়োগের নিয়ম। একদিকে যেমন পদায়ন ও পদোন্নতি দেয়া হয়েছে, অন্যদিকে যাদের সঙ্গে স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে তাদের নানাভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। মূলত এমন দলীয় এক জনপ্রশাসনের ওপর ভর করেই টিকে ছিল বিগত সরকারের সুদীর্ঘ শাসনামল।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে এ সরকারের পতন ঘটলে স্বাভাবিকভাবেই বঞ্চিত কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তারা দাবি-দাওয়া নিয়ে সামনে এসেছেন। জনমনেও জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর প্রত্যাশা জন্মেছিল। এর ধারাবাহিকতায় জনপ্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এ রদবদল ঘিরে নতুন করে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। পদায়ন বা পদোন্নতি ঘিরে বিভিন্ন মহল থেকে নানা অভিযোগ উঠতে থাকে। এতে রাতারাতি রদবদল বা পদায়ন-সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্ত স্থগিতও করতেও বাধ্য হয় সরকার। বিশেষত বিগত সরকারের আমলে ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ঘিরে বিশৃঙ্খলা আরো ঘনীভূত হতে শুরু করে, যা জনপ্রশাসন পরিস্থিতির আরো অবনমন ঘটায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গত ১৬ সেপ্টেম্বর পদোন্নতি বঞ্চিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। এ কমিটি এক সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেছিল যে তারা ১ হাজার ৫৪০ জনের কাছ থেকে আবেদন পেয়েছিল এবং সেগুলো যাচাই-বাছাই করে তাদের প্রতিবেদনে ৭৬৪ জনকে ভূতাপেক্ষা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পদোন্নতির সুপারিশ করেছে।

বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দাবি আবেদন পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারিতে ৭৬৪ জনকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট বিবেচনায় এটা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত বলা যেতে পারে। অতীতে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে যেসব কর্মকর্তা ন্যায্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তাদের স্বীকৃতি ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে। যেকোনো সরকারের অন্যতম দায়িত্বও এটি—প্রশাসনিক কাঠামোয় ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি খুব বেশি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়া হলেও যে সময়টুকু তারা কাজ করেননি সে সময়ের জন্য আর্থিক সুবিধা প্রদান সরকারের ব্যয় আরো বাড়াচ্ছে। আগেও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির নজির রয়েছে, তবে সেটি ছিল হাতেগোনা। কিন্তু বর্তমানে যে হারে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে সেটি নজিরবিহীন। তাছাড়া ভবিষ্যতে এর উদাহরণ টেনে আবারো এমন পরিস্থিতি তৈরির ঝুঁকিও রয়েছে। এদিকে গত দেড় দশকে বঞ্চিত আরো সাত শতাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতির আবেদন পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ আদালতে রিটের রায় বাস্তবায়নে আরো অর্ধশতাধিক কর্মকর্তার ভূতাপেক্ষ পদোন্নতির বিষয়ে যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চলছে বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

প্রত্যাশা ছিল অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসনে বড় ধরনের পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে। কিন্তু তেমন কিছুই ঘটেনি। সরকারের দিক থেকে তেমন কোনো সংস্কার উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে না। আবার বর্তমানে সরকারের রাজস্ব আয়, বাজেট ঘাটতি ও ঘাটতি মেটাতে ঋণ নেয়ার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি সরকারের ওপর আরো আর্থিক চাপ বাড়াবে বৈ কমাবে না। অথচ জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সরকারের ব্যয় কমাতে যেসব সুপারিশ করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও সচিবের সংখ্যা কমিয়ে ৬০-এ নামিয়ে আনা। একই সঙ্গে দেশে বিদ্যমান ৪৩ মন্ত্রণালয় থেকে কমিয়ে ২৫টি এবং বিভাগের সংখ্যাও কমানোর সুপারিশ করেছিল এ কমিশন। কিন্তু এখনো এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। জনপ্রশাসনের কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ সাধারণ সেবা খাতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে সরকারের ব্যয়। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং সামনে সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা দেয়া হলে এ ব্যয় আরো বাড়তে পারে। হতাশাজনক বিষয় হলো, সব মিলিয়ে সরকারের ব্যয় বাড়লেও এ খাতের সংস্কার না হওয়ায় দেশের সাধারণ নাগরিক সুবিধা বঞ্চিতই রয়ে যাচ্ছে।

সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কারে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। নয়তো এটি সরকারের বোঝায় পরিণত হবে। উপরন্তু জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চা আজও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে। দেশের জনপ্রশাসন ও শাসন কাঠামোয় বড় রকমের পরিবর্তনের জন্য সুপারিশ প্রণয়নের আগে এ-সংক্রান্ত একটি জরিপ পরিচালনা করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। ওই জরিপের দেখা যায়, ৯৬ শতাংশ নাগরিকের অভিজ্ঞতা হচ্ছে জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে এবং দেশের ৮৪ শতাংশের বেশি নাগরিক মনে করে দেশের জনপ্রশাসনে সংস্কার প্রয়োজন। সেখানে আরো উল্লেখ করা হয়, ৫৬ শতাংশ মানুষ মনে করে জনপ্রশাসনকে জনবান্ধব করার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হচ্ছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। জনপ্রশাসনের এমন পরিস্থিতিতে

সরকারের প্রয়োজন জনপ্রশাসন সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া। যার অগ্রাধিকারে থাকবে জনপরিষেবার মানোন্নয়ন করা।