দেড় দশকে দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মান ও গবেষণায় উল্লেখ করার মতো তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়োগ–প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, অস্বচ্ছতা ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিগত সরকারের শাসনামলে শিক্ষক নিয়োগে নানা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার অভিযোগ নিয়মিতভাবে উঠে এসেছে। এ সংকট উচ্চশিক্ষার মান ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে বিগত সরকার পতনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যোগ্য উপাচার্য নিয়োগ ও দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষ জোর দেয়া হয়েছিল। তখন অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ–প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব বিস্তার বন্ধ হয়ে একটি স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তবে দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে এখনো অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবে সুশিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হলে দক্ষ শিক্ষক লাগবে এবং শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে লিখিত পরীক্ষা চালু করলেও তা বাদ দিয়ে শুধু ভাইভা বা একাডেমিক ফলাফলের ওপর নির্ভর করা, বিশেষজ্ঞ সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা, বোর্ড সম্পন্ন হওয়ার আগেই রেজল্যুশনে স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই অস্থায়ী নিয়োগ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি পদ শূন্য হওয়ার আগেই সেসব পদের বিপরীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ ধরনের নিয়োগ মেধাভিত্তিক স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র। সেখানে যদি নিয়োগ প্রক্রিয়া অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়ে পড়বে ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ, আর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে যে অভিযোগ ছিল, তা কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতাকে প্রকটভাবে সামনে এনেছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষাঙ্গনে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশিত ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরনো অনিয়মেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জনগণের প্রতি দায়দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে একজন শিক্ষার্থী পরিণত বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাদের আলোকিত করার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের। জ্ঞান, দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা, সৃজনশীলতাসহ মানবিক গুণাবলির উন্মেষ ঘটাতেও ভূমিকা রাখেন শিক্ষকরা। তাই উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ সবদিক বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও নানা অনিয়ম অগ্রহণযোগ্য। এসব অনিয়ম বন্ধ করে শিক্ষা ও গবেষণার মান নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনসহ (ইউজিসি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, রাশিয়া, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলো শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার প্রশ্নে অনড়। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হয় না। বিভাগ কিংবা ডিসিপ্লিনে যোগ্যতাসম্পন্নরাই নিয়োগ পান। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারা নিয়োগ দেন না। এছাড়া অধিকাংশ দেশেই শিক্ষক হতে হলে ন্যূনতম পিএইচডি ডিগ্রি থাকা লাগে। শিক্ষা ও গবেষণার মান ঠিক রাখতে তাদের সময়ে সময়ে মূল্যায়ন করা হয়। এসব দেশের শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতার তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে। কর্মক্ষম ও উন্নত জাতি গঠন করতে হলে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রতিযোগিতার আওতায় আনা জরুরি। স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও জনগণের স্বার্থে শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা ও শর্ত আরো উন্নত করা প্রয়োজন। কিন্তু তা না করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে তা অবনমিতও করা হয়েছে।
জ্ঞান সৃষ্টিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেমন অবদান রাখছে তার প্রধান মানদণ্ড হলো গবেষণা। কিন্তু দেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন গবেষণার উন্নয়ন ও মৌলিক জ্ঞান সৃষ্টির প্রতি মনোযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর পরিবর্তে দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদে থাকা অনেকেই নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখা ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নানা অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও লজ্জাস্কর। আইন ভঙ্গ করে অনুগত ব্যক্তিদের সুবিধা দেয়া ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য নিয়োগ পদোন্নতির শর্ত শিথিল করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ধারণা ও মর্যাদাকে অবনমন করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আদর্শগতভাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের উদাহরণ স্থাপন করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেসব মানদণ্ড বজায় রাখতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।
বিশ্বে যেসব দেশ অর্থনৈতিকভাবে উন্নতি অর্জন করেছে তাদের প্রত্যেকের উন্নয়নের মূল ভিত্তি ছিল শিক্ষা খাতে অগ্রাধিকারমূলক বিনিয়োগ। কিন্তু বাংলাদেশে চিত্রটি ভিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার মানে ক্রমেই অবনমন ঘটেছে। গত দেড় দশকের শাসনামলে এ অবনমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। নতুন ভবন, প্রকল্পের বাহুল্য থাকলেও সর্বস্তরে শিক্ষার গুণগত মান ছিল নিম্নগামী। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠন হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সবার প্রত্যাশা ছিল, গণ-অভ্যুত্থানের সরকার শিক্ষা খাতকে সংস্কারের অগ্রাধিকারে রাখবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন খাতের সংস্কারে ১১টি কমিশন গঠন হলেও শিক্ষা খাতের জন্য কোনো কমিশন হয়নি। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও একাডেমিক সংস্কারের জন্য বড় কোনো উদ্যোগও নেয়া হয়নি। এমনকি জুলাই সনদে শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়টি পুরোপুরি উপেক্ষিত। শিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রমের কোনো মিল নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তৈরি হচ্ছে ‘কর্মে অদক্ষ গ্র্যাজুয়েট’। যাদের অধিকাংশের ডিগ্রি আছে কিন্তু দক্ষতা নেই। ফলে অনেকেই থাকছেন বেকার। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত এক বিপর্যয়কর অবস্থায় রয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতায় পৌঁছতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি মেধা বিকাশ, গবেষণা ও নৈতিক মূল্যবোধের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। এক্ষেত্রে ইউজিসির তদারকি আরো কঠোর হওয়া জরুরি। যারা অনিয়মে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। মনে রাখা দরকার, একজন শিক্ষক কেবল জ্ঞানই বিতরণ করেন না; তিনি সমাজ গঠনের কারিগরও। আর যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয় কখনই মানসম্মত মানবসম্পদ তৈরি করতে পারবে না। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।










