বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাহিত্যের ইতিহাসে কমরেড বদরুদ্দীন উমর গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে অব্যাহতভাবে লিখে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেছেন। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তার লেখা ‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সংস্কৃতির সংকট’ প্রভৃতি গ্রন্থ পূর্ব বাংলার জনগণের ভেতরে যে জাতিগত উপলব্ধি ও জাতীয় প্রতিরোধ চেতনা সৃষ্টি করেছিল, স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উদ্ভবে ভূমিকা রেখেছিল তা বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে এখনো অজানা।
’৫২-এর ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা তার তিন খণ্ডের গবেষণা গ্রন্থ ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ ‘যা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিভিন্ন সময় মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছে। তাকে বলা হয় ভাষা আন্দোলনের সাহিত্যিক স্থপতি। অন্যদিকে এ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস পাঠে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলোকিত হয়ে চলেছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার বিষদাঁত ভেঙে দিয়ে গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী রাজনীতি বিকাশে তার লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, যখন অনেক লেখক-বুদ্ধিজীবীর কাজ ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের আনুকূল্যে সুযোগ-সুবিধা অর্জন।
ষাটের দশকের শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে উমর তৎকালীন আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) সংক্ষেপে ইপিসিপির (এম-এল) সঙ্গে যুক্ত হন এবং এ অঞ্চলে কমিউনিস্ট বিপ্লবী রাজনীতি বিকাশে ভূমিকা রেখে চলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর এক অন্যায়, অসম যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। গণহত্যার শিকার হন পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র জনগণ। অসম অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্যা প্রতিরোধে নিজ পার্টি প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত না নেয়ায় তিনি পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন। তার আগে নিজ বক্তব্যের সমর্থনে উমর ইপিসিপিতে (এম-এল) লিখিত বক্তব্য উত্থাপন করেছিলেন।
একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশের উদ্ভব হওয়ার পর উমর নব উদ্যোগে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ছিন্নভিন্ন বিভিন্ন অংশকে সংগঠিত করেছিলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলন ও কমিউনিস্ট ঐক্য গঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ পার্টি গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মার্ক্সবাদী পদ্ধতিতে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণ, রণনীতি-রণকৌশল নির্ধারণ, আন্তর্জাতিক লাইন নির্ধারণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশের বিপ্লবী আন্দোলন গ্রন্থে এর প্রমাণ মেলে।
বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রের অভিমুখে সর্বহারা শ্রেণীর জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সাধনে শ্রমিক-কৃষক-গ্রামীণ মজুরদের সংগঠিত করতে গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে সংগঠন গড়ে তোলায় তিনি নেতৃত্ব দেন। প্রকাশ্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে এ সময় তার নেতৃত্বে গঠন হয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোট। আশির দশকে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এ জোট নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রেখে মাঠের সংগ্রামে ব্যাপৃত ছিল। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারবিরোধী সংগ্রামে, বিপ্লবী রাজনীতি বিকাশে বাধা সৃষ্টিকারী সাম্রাজ্যবাদী সাহায্য সংস্থার মুখোশ উন্মোচনে তার লেখালেখি এসব বিষয়ে এখনো ভূমিকা রেখে চলেছে।

বাংলাদেশের সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম এগিয়ে নিতে মার্ক্সবাদী পদ্ধতিতে পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণ ও এর বিকাশের ধারাকে চিহ্নিত করা তার কাজের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইতিহাস পাঠ যে কত গুরুত্বপূর্ণ তা তার লেখা বাংলাদেশের অভ্যুদয়, ভারতের জাতীয় আন্দোলন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলাদেশের কৃষক, বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কমিউনিস্টদের ভূমিকা, বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চা প্রভৃতি গ্রন্থ রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য অবশ্য পাঠ্য।
সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর তার লেখা ‘বিপ্লব প্রতিবিপ্লব’, ‘সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি’ প্রভৃতি গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি সমাজতন্ত্র যে একটা দেশীয় বিষয় নয় বরং আন্তর্জাতিক সে বিষয়ে খোলাসা করেন।
২০০৩ সালে উমরের আহ্বানে কনভেনশনের মধ্য দিয়ে গঠন হয় বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম সংগঠনী কাউন্সিল। ২০০৯ সালে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় কমিটি ও ২০১১ সালে সারা দেশে জাতিগত ভাষাগত সংখ্যালঘুদের কনভেশনের মাধ্যমে গঠন হয় জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রামের হাতিয়ার যে সংগঠন তা তার এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়েই প্রকাশ হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে ২৯ জুলাই বণিক বার্তায় দেয়া তার সাক্ষাৎকার কিংবা জুলাই অভ্যুত্থানের দিনগুলোয় নিয়মিত আন্দোলন—সংগঠনে তার সচেতন তদারকি, ভূমিকা আশ্চর্যজনক তারুণ্যে ভরপুর। ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার উচ্ছেদ-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারে এর দেখা মিলবে। বিশেষ করে দৈনিক খবরের কাগজে পরপর দুদিন দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের এবং এর প্রেক্ষাপট যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা রাজনৈতিক কর্মীদের বর্তমান পরিস্থিতির বিকাশ এবং আগামীর পথ নির্মাণেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস।
৯৩ বছর বয়সী বদরুদ্দীন উমর এখনো জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের তরুণ কর্মীদের সামনে একজন সংগ্রামী যুবক হিসেবে উপস্থিত। তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘজীবন কামনা করি।
ফয়জুল হাকিম: সম্পাদক, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল










