আজ ২৪ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস। ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ২৪ জানুয়ারিকে ‘‌আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এ দিনটি শিক্ষা উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই অগ্রগতি তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে পালিত হচ্ছে। চলতি বছর আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘‌শিক্ষা বিনির্মাণে তারুণ্যের শক্তি।’ চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে দেশের তারুণ্যের ঐক্যবদ্ধ শক্তি দেখা গেছে। এর আগে মানুষ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয় দেখেছিল। স্বাধীনতার সুফল ঘরে তোলা হয়েছিল। তখনকার প্রজন্ম তাদের যৌবনকে দান করেছিল দেশমাতৃকার জন্য। একইভাবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দেখিয়ে দিল ঐক্যবদ্ধ শক্তি দমন-পীড়ন রুখে দিতে পারে, পারে দেশের অপরাজনৈতিক ক্ষমতাচর্চাকে হটিয়ে দিতে। তরুণরা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে পারে। আর এ দেশের স্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টিতে তরুণদের আত্মদান ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে চলেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটির বেশি। মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। এ বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করা না গেলে তা দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। ব্যাহত হবে কাঙ্ক্ষিত জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনে তাদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হবে। এজন্য তরুণদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ এখন জনমিতি লভ্যাংশ অর্জনের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কেননা দেশের জনসংখ্যায় তরুণদের হার এখন সবচেয়ে বেশি। তবে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার পরও সেভাবে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করতে পারছে না দেশ। কারণ তরুণদের তথা কর্মক্ষম জনসংখ্যার অধিকাংশই শ্রমবাজারে নেই। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা রয়েছে, তরুণদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে না পারলে বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন কঠিন হবে।

সাধারণত ১৫-৬৪ বছর বয়সীদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে ধরা হয়। এ হিসেবে দেশের জন্য জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের অনুকূল সময় ২০৩৭-৩৮ সাল পর্যন্ত বলে মনে করেন জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ এ সময় পর্যন্ত দেশে কর্মক্ষম মানুষ বেশি থাকবে। কিন্তু এরপর দেশের জনসংখ্যা তারুণ্যনির্ভর থাকবে না। তাই তরুণদের যত দ্রুত সম্ভব যুগোপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে কর্মে নিয়োজন করা জরুরি। প্রয়োজনে এর জন্য বিনিয়োগ ও নীতিগত পরিবর্তনও আনতে হবে। একটি দেশের জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করার অন্যতম পূর্বশর্ত প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ। দেশে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণে এখনো বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক কাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান। রাষ্ট্র শিক্ষার দায় স্পষ্টভাবে গ্রহণ করেনি। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক শিক্ষা আইন আছে, যেখানে অভিভাবকদের দায়িত্বের কথা বলা আছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় বিদ্যালয়, শিক্ষক ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র কী দায় নেবে—তা আইনে স্পষ্ট নয়। সংবিধানেও শিক্ষা অধিকার হিসেবে ঘোষিত নয়; কেবল মূলনীতি হিসেবে আছে। ফলে শিক্ষার সর্বজনীন অধিকারের বিষয়টিও আইনিভাবে সুরক্ষিত নয়। আর মাধ্যমিক শিক্ষার বিষয়ে সংবিধান বা আইনে কার্যত কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকারই নেই। অথচ একবিংশ শতাব্দীতে শুধু পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা দিয়ে একটি সমাজ এগোতে পারে না। অন্তত মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানসম্মত হওয়া দরকার, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ৪-এর মূল প্রতিশ্রুতি।

দেশের শিক্ষার বুনিয়াদ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুর উপস্থিতি প্রায় শতভাগ নিশ্চিত হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নও হয়েছে বেশ। কিন্তু শিক্ষক ও শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোয় প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা কম। বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকেরও অভাব রয়েছে। তাই দক্ষ শিক্ষক তৈরিতে ও শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। নতুন নতুন শিক্ষা পদ্ধতি চালু করার আগে শিক্ষকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের দক্ষ শিক্ষক না থাকায় গণিতসহ মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের ভীতি ও অনীহা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কেই এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ভেতরের গুণাবলিকে বিকশিত করা। নানা কারণে আমরা সেই উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। বারবার শিক্ষা পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। ফলে শিক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে পড়ছি। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জন করতে হলে টেকসই ও যুগোপযোগী শিক্ষা পদ্ধতি গ্রহণ জরুরি। শিল্প-একাডেমিয়ার সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে অকর্মক্ষম জনশক্তির চেয়ে কর্মক্ষম কর্মশক্তি বেশি। কিন্তু সেটি কাজে লাগাতে পারব না যদি সেই তরুণদের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত কাজ দিতে না পারি। বাংলাদেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যাও অনেক বেশি। প্রতি বছর ২২-২৩ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও আমরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ দিতে পারছি না। আমরা যদি এই বিপুলসংখ্যক তরুণকে কাজে লাগাতে পারি, তাহলে বাংলাদেশেও সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনৈতিক উন্নয়ন আশা করা যেতে পারে। আর এই যে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের বড় অংশ শিক্ষিত, তাদের জন্য যদি আমরা উপযুক্ত কর্মসংস্থান দিতে না পারি, দেশের উন্নয়নই ব্যাহত হবে না; তরুণদের মধ্যে হতাশা দেখা দেবে। এরই মধ্যে দেশের তরুণদের একাংশ অপরাধ ও মাদকে জড়িয়ে পড়ছে; যা দেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জনমিতির সুবিধা কাজে না লাগাতে পারার বড় কারণ আমাদের সেকেলে শিক্ষা ব্যবস্থা, যা যুগের চাহিদা মেটাতে পারছে না। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত যে দেশের শিক্ষিত তরুণরা চাকরি পাবে না, আর শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর জন্য বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মী আনতে হবে। তরুণদের কাজে লাগাতে হলে যুগোপযোগী শিক্ষায় গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।