বাংলাদেশে সম্প্রতি যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, এটি কি আমাদের জন্য বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?

বেশকিছু বছর ধরে দেশের ভূতত্ত্ববিদ বা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন বড় ধরনের ভূমিকম্পের মতো একটি দুর্যোগের আশঙ্কা করছেন। তারা পরিষ্কার করে বলেছেন, বাংলাদেশের ভেতরে কিছু টেকটোনিক অ্যাক্টিভ ফল্ট লাইন আছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান, বার্মিস ও ইউরেশিয়ান প্লেট রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প নিয়ে আসতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা আছে। বিল্ডিং কোডের ভূমিকম্পের জোন ম্যাপ অনুযায়ী ঢাকা শহর মাঝারি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই ভূমিকম্পকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেহেতু আমরা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছি, তাই আমাদের ভূমিকম্পের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ভূমিকম্প-পরবর্তী যে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে সেটাকে কীভাবে হ্রাস করা যায়, সেজন্য আমাদেরকে প্রস্তুতি নিতে হবে। সর্বশেষ কম্প্রিহেন্সিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) প্রতিবেদনেও এ ধরনের একটি আশঙ্কার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে যদি রিখটার স্কেলে ৭-এর অধিক মাত্রার একটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয় তাহলে এর প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়বে। সুতরাং ভূমিকম্পের আশঙ্কা ও তার ক্ষয়ক্ষতি থেকে আমরা মুক্ত নই। তবে এ আশঙ্কাকে সামনে রেখে কীভাবে প্রস্তুতি নেয়া যায় এবং কীভাবে প্রস্তুতি নিলে দুর্যোগের ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায় সেদিকে আমাদের এগোতে হবে।

দেশে অপরিকল্পিত নির্মাণ ও নগরায়ণ ভূমিকম্পের সময় কতটা বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে?

শুধু যে ঢাকা শহর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, বিষয়টি তেমন না। সারা দেশেই নগরায়ণ হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও মানসম্পন্ন ভবন নির্মাণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি অন্যান্য নগর এলাকায় সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো রয়েছে। ভবন যাতে নকশা অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানগুলোর। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জনবলের অভাবে এটা নিশ্চিত করতে পারেনি। যেসব নকশা অনুমোদন করা হয়েছে সেই নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। আবার নকশার অনুমোদন ছাড়াই অনেক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে নকশা-বহির্ভূত বা নকশা ব্যতিরেকে ভবন নির্মাণ—দুটোই আমাদের জন্য ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।

আরেকটি বিষয় হলো বাংলাদেশের অনেক শহর বা নগরায়ণ হয়েছে নিম্নভূমি ভরাট করে। সেখানে নরম মাটির ওপর ভবন তৈরি করা হয়েছে। ফলে নরম মাটিতে যেসব ভবন তৈরি করা হয়েছে সেগুলো ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আবার উঁচু বিল্ডিং তৈরি হয়েছে সরু রাস্তার পাশে এবং দুর্বল অবকাঠামোর ওপরে। বিল্ডিংয়ের দুর্বল কাঠামো, সরু রাস্তা ও উঁচু ভবন তিনটি বিষয় আরেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

কাঠামোগত নকশা ও স্থাপত্য নকশা পরিপূর্ণভাবে না মেনে ভবন নির্মাণ করা হলে সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ারই কথা এবং সেটাই হয়েছে। ঢাকা শহরে এ রকম প্রচুর ভবন আছে। যেগুলো বিল্ডিং কোড না মেনেই তৈরি হয়েছে বা ইমারত নির্মাণ বিধিমালার আলোকে তৈরি হয়নি। ফলে আইনের ব্যত্যয় হয়েছে বা নগর পরিকল্পনার ব্যত্যয় করে যেসব জায়গায় বাড়িঘর তৈরি হয়েছে এগুলো আসলে এ শহরকেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণের বাস্তব চিত্র কতটুকু? এ কোড বাস্তবায়নের প্রধান বাধাগুলাে কোথায়?

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড শুধু রাজধানী বা বড় শহরের জন্য তৈরি হয়নি, বরং সারা দেশের জন্য তৈরি হয়েছে। দেশের যেকোনো জায়গায় মানসম্পন্ন ভবন তৈরি হতে হলে বিল্ডিং কোড মেনেই করতে হবে। কিন্তু বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য যদি কোনো প্রতিষ্ঠানই না থাকে তাহলে সেটি ঠিকমতো হবে না। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য কোডের শুরুতেই ‘‌বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ)’ নামে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করার কথা বলা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান বিল্ডিং কোডকে বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তাদের দায়িত্বগুলো ন্যস্ত করবে। অর্থাৎ এ প্রতিষ্ঠান রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব ন্যস্ত করবে। আর যেখানে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নেই সেখানে বিল্ডিং কোড প্রয়োগের জন্য সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাকে দায়িত্ব দেয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুমোদনের পাঁচ বছর পরও এ কোড প্রয়োগের জন্য বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি তৈরি হয়নি। বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য কর্তৃপক্ষ না থাকায় সেটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

সরকারি ও বেসরকারি ভবনগুলোর ভূমিকম্প প্রতিরোধক্ষমতা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় কিনা এবং এর জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান কোনটি?

প্রত্যেকটি ভবন যখন তৈরি হয় তখন তার বিভিন্ন নকশা (ডিজাইন) থাকে। এর মধ্যে স্থাপত্য নকশা, কাঠামোগত নকশার পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল নকশা ও প্লাম্বিং নকশা উল্লেখযোগ্য। একটি ভবনের কাঠামোগত নকশা একজন দক্ষ প্রকৌশলী দ্বারা তৈরি করতে হবে। কিন্তু এখন এ রকম নকশা ছাড়াও প্রচুর ভবন তৈরি হচ্ছে। একটি ভবন তৈরির ক্ষেত্রে স্থাপত্য ও কাঠামোগত নকশা অনুযায়ী ভবন তৈরি হচ্ছে কিনা দেখার জন্য ইমারত পরিদর্শককে নিয়মিতভাবে তদারকি করতে হয়, সরজমিনে সার্বক্ষণিক দেখার জন্য একজন সাইট প্রকৌশলী এবং বিল্ডিং নির্মাণের জন্য কন্ট্রাক্টর থাকতে হবে। তাদের কাজ হচ্ছে নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করা। একটি ভবনকে সঠিকভাবে তৈরি করতে হলে এবং তার ঝুঁকি হ্রাস করতে হলে এ তিনটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে যারা নির্মাণ শ্রমিক রয়েছে তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেয়ার কথাও বলা আছে। বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি তৈরি হয়নি, তাই ভালো প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে না। এখন তারা হাতেকলমে যতটুকু শিখে ততটুকু কাজ করে। কিন্তু তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ কম পাচ্ছে। বিল্ডিং কোড যদি কার্যকর করতে হয় ‌বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজ ও জরুরি সেবা প্রদানের সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কি? আমরা কতটা প্রস্তুত?

ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকাজ ও জরুরি সেবা প্রদানের সক্ষমতা বাংলাদেশের একেবারেই নেই। সাভারের রানা প্লাজা যখন ধসে পড়ল তখন সেখানে উদ্ধার তৎপরতা শেষ করতে অনেকদিন সময় লেগেছে। ২০১৫ সালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সুন্দরবন হোটেলের পাশে একটি নির্মাণাধীন ভবনের মাঝের রাস্তা ও ফুটপাত ধসে গেছে। এতে পার্শ্ববর্তী সুন্দরবন হোটেলের বেজমেন্টের কিছু অংশ ধসে পড়েছে। সেখানেও উদ্ধারকাজ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। দুএকটি ভবনের ক্ষেত্রে আমাদের উদ্ধারকাজ করার সক্ষমতার অভাব স্পস্ট হয়ে উঠেছে। বড় ধরনের ভূমিকম্পে যখন ভবনগুলো ভেঙে রাস্তায় পড়বে তখন উদ্ধারকাজে যারা থাকবেন তারাই ভেতরে যেতে পারবেন না। এমনও হতে পারে রাস্তাগুলো ব্লক হয়ে যেতে পারে। ফলে উদ্ধার কাজ ব্যাহত হবে।

উদ্ধারকাজের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের প্রযুক্তি ও মেশিনারিজ প্রশিক্ষণ নিয়মিতভাবে করা দরকার। স্বেচ্ছাসেবক দলগুলোকে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশেষ করে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস ও আদালতে ভূমিকম্প ও তার পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আবাসিক ভবনগুলোয় ভূমিকম্পের প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর কোনো কিছুই হচ্ছে না। আমাদের প্রস্তুতির অনেক ঘাটতি আছে।

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বা আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম আছে কি? এটি উন্নয়নে কী ধরনের গবেষণা চলছে?

ভূমিকম্পের জন্য সেভাবে পূর্বাভাস বা আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের এখনো কোনো ব্যবস্থা নেই। এটি নিয়ে তেমন ভালো গবেষণাও নেই।

স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ভূমিকম্প নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া জরুরি?

যেখানে মানুষের জনসমাগম বেশি হয় এবং পাবলিক ফাংশন আছে, সেগুলো সবই পাবলিক ভবন। সেখানে ভবনটি বিল্ডিং কোড অনুযায়ী তৈরি হলো কিনা সেটি নিশ্চিত করতে হবে। মানুষের চলাফেরার রাস্তাটিকে উন্মুক্ত রাখতে হবে। নকশা অনুযায়ী ভবনটিকে মজবুত করে তৈরি করতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, মার্কেটের মতো জায়গাগুলো যারা ব্যবহার করবে তাদের সচেতনতা প্রয়োজন। সচেতনতা তৈরি করতে হলে দুর্যোগ চলাকালীন ও তার পরবর্তী সময়ে আমাদের কী আচরণ করতে হবে সেই তথ্যগুলো তাদের দিতে হবে এবং পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকা শহরে ভবনের পর ভবন তৈরি করা হয়েছে। দাঁড়ানোর জন্য কোথাও উন্মুক্ত জায়গা নেই। সাধারণত ভূমিকম্পের সময় উন্মুক্ত স্থান বা খেলার মাঠে গিয়ে নিরাপদে দাঁড়ানো যেতে পারে। সেখানে ওপর থেকে কিছু ভেঙে নিচে পড়বে না। কিন্তু ঢাকা শহরের কোথাও এ রকম স্থান নেই। ফলে ভূমিকম্পের সময় ঢাকা শহরে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো বড় ঝুঁকিপূর্ণ।

একটি আদর্শ শহরের জন্য কতটুকু জায়গা ফাঁকা থাকা দরকার?

একটি এলাকার ৫০ শতাংশ ভূমিতে আবাসিক, অনাবসিক, কমার্শিয়াল, শিল্প বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ক ভবন নির্মাণ হতে পারে। বাকি ৫০ শতাংশ ভূমিতে রাস্তাঘাট, লেক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, পুকুর, জলাশয়, নদীনালা, খালবিল ইত্যাদি থাকতে হয়। ঢাকা শহরে বা কোনো বড় শহরেই এ ধরনের ভূমি ব্যবহারের বিন্যাস দেখা যায় না। জনঘনত্বও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদর্শগতভাবে শহরের প্রতি একরে কোনোভাবেই যেন ২০০ মানুষের বেশি না হয়। কিন্তু ঢাকা শহরের অনেক জায়গা আছে যেখানে প্রতি একরে ৪০০-৪৫০-এর বেশি মানুষ বসবাস করছে। ছোট জায়গায় যখন অধিক মানুষ বসবাস করে তখন ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

নগর উন্নয়ন ও ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করতে কী করা দরকার?

নগরকে দুর্যোগ সহনশীল বা দুর্যোগকে হ্রাস করতে ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোডকে যথাযথ অনুসরণ করার কোনো বিকল্প নেই। একটি ভবনের নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থাপত্য নকশা, কাঠামোগত নকশা ও ইউটিলিটি সার্ভিসেসের নকশা বিল্ডিং কোড মেনে করা জরুরি। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড কিংবা কাঠামোগত নকশার ব্যত্যয় ঘটলেই ঝুঁকি বাড়বে। কোনো ভবন অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী তৈরি হচ্ছে কিনা সেটি সরজমিনে সার্টিফাই করার জন্য রাজউকের পাশাপাশি তৃতীয় পার্টিকে নিয়োজিত করা যেতে পারে। ভবনে বসবাসের আগে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। যারা ভবন মালিক তারা এটাকে মেনে বাড়িঘর তৈরি করবেন।

ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে?

না, সে রকমভাবে কিছু দেখছি না। জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত যে দুর্যোগগুলো আছে সেগুলো অনেক এনজিও, আইএনজিও ও সরকার নানাভাবে কাজ করে। কিন্তু শহর এলাকায় বন্যা, অগ্নিনিরাপত্তা অথবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য যে প্রস্তুতি থাকা দরকার সে প্রস্তুতি কিন্তু একেবারেই দেখা যায় না। একটি উদাহারণ দেয়া দরকার। সিটি করপোরেশনের জন্য অনেক বছর আগে একটা ভূমিকম্পের কন্টিজেন্সি প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে একটি সার্ভেতে দেখা গেল সিটি করপোরেশন নিজেই জানে না যে তাদের জন্য এ রকম একটা কন্টিজেন্সি প্ল্যান আছে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় হাসপাতাল, ক্লিনিক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার ব্রিগেড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সমন্বিত পরিকল্পনা থাকতে হবে। এগুলোকে নিয়মিতভাবে অনুশীলন করতে হবে যাতে দুর্যোগকালে সঠিকভাবে কাজ করে। আজকাল পৃথিবীর অনেক দেশেই অ্যান্টিসিপেটরি প্ল্যানের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবেলায় বাস্তবসম্মতভাবে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করতে দেখা যায়।

ভূমিকম্প-পরবর্তী সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ড বা ভাঙন বা সুনামির মতো দ্বিতীয় ধাপের দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি কেমন?

এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য আমরা কোনো ধরনের প্রস্তুতি দেখতে পাই না। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় আছি, ভূমিকম্প সামনেও হতে পারে। কিন্তু এর জন্য কোনো প্রস্তুতি আমাদের নেই। তবে ভূমিকম্প-পরবর্তী সুনামি বাংলাদেশ আগে কখনো মোকাবেলা করেনি। উপকূলীয় বেল্টে সুনামি হয়, সেসব এলাকায়ও তেমন কোনো প্রস্তুতি আমি দেখছি না। বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু কমিটি আছে। তবে এগুলোর পাশাপাশি আমাদের প্রচুর পরিমাণে স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করা দরকার।

ভবন নির্মাণের জন্য ভবনের কাঠামোগত নকশা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাড়ির মালিককে রাজউক থেকে এ নকশা অনুমোদনের জন্য বা পরবর্তী প্রক্রিয়ার জন্য নানা ধরনের হয়রানি হতে হয়। এর কারণ কী?

এর প্রধান কারণ অনিয়ম-দুর্নীতি। যারা এ সেবাটুকু দেবেন তাদেরও মনে রাখতে হবে তারা একটি নিরাপদ নগর তৈরি করতে চান। নিরাপদ নগর নির্মাণই যদি উদ্দেশ্য হয় তাহলে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব রাখতে হবে। প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে হবে যাতে ভবন মালিকরা বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণে উৎসাহী হন। সেবা নিতে এসে যেন লোকজন ভয় না পায় সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। রাজউক বা অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে হয়রানির পরিবর্তে সহযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি করে তাহলে তারা সেখানে ভয়ে যাবে না এবং বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণে তারা নিরুৎসাহিত হবেন। এতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তৈরি হবে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে।