দৈনন্দিন যাতায়াতে দেশের মানুষ বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার, অটোরিকশার মতো যানবাহনের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে। এ ধরনের যানবাহনের অধিকাংশেরই হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই বলে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে এসব যানবাহন যাত্রী নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে। ব্যস্ত সড়কে নষ্ট হয়ে যত্রতত্র থামানোর কারণে অসহনীয় যানজট ও দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের। সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চাপা দিচ্ছে পথচারীদের।
অবৈধ, অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। তাছাড়া রুট পারমিটবিহীন, ফিটনেসবিহীন, লক্কড়ঝক্কড় গণপরিবহন ঢাকাসহ সারা দেশে চলাচলের জন্য কোনোভাবেই উপযোগী নয়। অথচ এসব যানবাহন কর্তৃপক্ষের সামনে দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। গণপরিবহন খাতের এ বিশৃঙ্খলা দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফল। এজন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা যেমন দায়ী, তেমনি সরকারও দায়ী। অতীতের রাজনৈতিক দলগুলোই পরিবহন মালিকসহ খাতসংশ্লিষ্টদের নানা ধরনের অনিয়ম করার সুযোগ করে দিয়েছে। পরিবহন মালিকরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের প্রভাবেই চলেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তাদের স্বার্থে একপেশে ও একচেটিয়া সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বিগত সময়ে আইন কার্যকরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর অবৈধ, অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল বন্ধ হবে। সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। গণপরিবহন খাতকে সেবা খাত হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এজন্য পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে গণপরিবহন ব্যবস্থাটি পুরোপুরি ঢেলে সাজানো দরকার। অবৈধ, অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন সড়ক-মহাসড়কে অবাধে বন্ধ করতে সরকারের তৎপরতা বাড়াতে হবে। সেজন্য সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ (বিআরটিএ) সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দেশের পরিবহন খাতে নানা সমস্যা বিদ্যমান। তবে অবৈধ, অনুমোদনহীন ও ফিটনেসবিহীন গণপরিবহন সড়ক-মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে, যা বর্তমানে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোয় দিন দিন ফিটনেস সনদ নেই, এমন অবৈধ পরিবহনের সংখ্যা বেড়ে চলেছে, যা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব অবৈধ পরিবহনের কারণে ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সড়ক-মহাসড়কে নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ছে। দেশের সড়ক ও মহাসড়কে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মিছিল থামছে না। বরং দিনের পর দিন তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা বিধানে সরকার জনস্বার্থে ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা, অটো, টেম্পো এবং সব শ্রেণীর অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে নিষিদ্ধ করেছিল। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ১০ বছর। মহাসড়কে তিন চাকাসহ স্বল্প গতির যানবাহন চলাচল বন্ধে উচ্চ আদালতেরও রয়েছে কঠোর নির্দেশনা। অথচ কিছুই মানা হচ্ছে না। ফলে অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ এবং অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে এসব যানবাহন চলাচল করছে, যেসব কারণে প্রায় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময় অদক্ষ চালক, ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চালানো, অতিরিক্ত গতিসহ নানা বিষয় উঠে আসে। তবে সড়ক দুর্ঘটনার যতগুলো কারণ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে প্রায়ই দেখা যায় অবৈধ বা অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়টি।
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ বর্তমানে ২০ ধরনের যানবাহনকে রাস্তায় চলাচলের অনুমোদন দিয়ে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, অটোরিকশা, অটো টেম্পো, বাস, কার্গো ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান, ডেলিভারি ভ্যান, হিউম্যান হলার, জিপ, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, মোটরসাইকেল, পিকআপ, প্রাইভেট কার, স্পেশাল পারপাজ ভেহিকল, ট্যাংকার, ট্যাক্সি ক্যাব, ট্রাক্টর, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ জুন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার। দেশের সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, এসব ক্যাটাগরির যানবাহন ছাড়া সড়ক-মহাসড়কে চলাচল করা সব ধরনের যানবাহন অবৈধ। আর অবৈধভাবেই এ ধরনের যানবাহন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সড়ক-মহাসড়কে, যার কারণে সড়কে তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাস-মিনিবাস, মাইক্রোবাস, সিএনজি, অটোরিকশা ও প্রাইভেট কারের মতো বিভিন্ন যানবাহনের সমস্যা আমাদের সড়কে তীব্রতর হয়ে উঠেছে। শুধু গণপরিবহন বা চুক্তিভিত্তিক পরিবহন নয়, বাংলাদেশে নিবন্ধিত সব ধরনের মোটরযানের একটি বড় অংশেরই হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ জুন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৪৭ লাখ। দুই চাকার বাহনটির ক্ষেত্রে ফিটনেস সনদ থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। ফিটনেস সনদ থাকা বাধ্যতামূলক এমন যানবাহনের সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ছয় লাখের হালনাগাদ ফিটনেস সনদ নেই। সে হিসেবে সারা দেশে ফিটনেস নবায়ন ছাড়াই ছয় লাখ যানবাহন সড়কে চলাচল করছে। দফায় দফায় কর মওকুফের পরও মালিকরা গাড়ির ফিটনেস হালনাগাদ করছেন না। যে কারণে গত প্রায় এক বছরে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ক্রমেই বেড়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৮-২০১৩ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর অন্যান্য কারণের মধ্যে ছিল ৬৬ হাজার ৬৬১টি ফিটনেসবিহীন যানবাহন। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সরকারি সংস্থাই যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা ছাড়াই সনদ দিয়ে দিচ্ছে। কারণ দেশে যেভাবে ফিটনেস সনদ দেয়া হয়, তা মূলত পরীক্ষককেন্দ্রিক। পরীক্ষক যানবাহন সরাসরি দেখে ফিট বা আনফিট হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিআরটিএর একজন পরীক্ষককে প্রতিদিন শত শত যানবাহন পরীক্ষা করতে হয়। একজন মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই এত সংখ্যক যানবাহনের নির্ভুল ফিটনেস পরীক্ষা করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে ফিটনেস সনদ দেয়ার প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে উন্নীত করা উচিত।
বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে কাঠামোগত ত্রুটিসহ নানা অসংগতির কারণে অবৈধ বা অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলোয় নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। এটা বোঝা গেলেও মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত প্রয়োজন এবং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবিকার স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এসব যানবাহনকে রাস্তা থেকে এখনই হয়তো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাই এসব যানবাহনকে কাঠামোগত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানোন্নয়ন, সেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধিত করে এগুলোকে অনুমোদনের ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। আর সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের উচিত হবে দ্রুততার সঙ্গে অবৈধ, রুট পারমিটহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক-মহাসড়কে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা এবং তার বিকল্প দ্রুততার সঙ্গে খুঁজে বের করা।










