কোরিয়া এমপ্লয়মেন্ট ইনফরমেশন সার্ভিস (কেইআইএস) হলো একটি সরকারি সংস্থা যা দক্ষিণ কোরিয়ায় শ্রমবাজারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, বেকারত্ব কমানোর কৌশল প্রণয়ন এবং চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান করে। কেইআইএস একটি ইন্টেলিজেন্ট ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সাপোর্ট সার্ভিস যা ‘জবকেয়ার’ নামেও পরিচিত। এ সেবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বিগ ডাটাভিত্তিক, যা সেবাপ্রার্থীদের পেশাগত জীবনের প্রতিটি ধাপে সহায়তা প্রদান করে। এ সংস্থার মূল কার্যক্রমগুলোর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশ্লেষণ, চাকরির তথ্য সংগ্রহ ও প্রদান, ক্যারিয়ার গাইডেন্স ও পরামর্শ প্রদান, কর্মসংস্থান সম্পর্কিত সরকারি নীতির বাস্তবায়ন এবং চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন। কেইআইএস মূলত ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও ডাটাবেজ ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত পরিষেবাগুলো সহজলভ্য করে তুলতে এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারকে আরো কার্যকর ও স্থিতিশীল করতে কাজ করে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা কাজ করে থাকে। সরকার কোরিয়া এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি ফর পারসন্স উইথ ডিস্যাবিলিটিজের (কেইএডি) মাধ্যমে বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করে, যাতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা স্বনির্ভর হয়ে জীবন যাপন করতে পারেন।
জাপানে ‘হেলো ওয়ার্ক’ নামীয় কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র রয়েছে যা জাপান সরকারের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। জাপানের প্রায় সব শহরে হেলো ওয়ার্কের অফিস রয়েছে। এ কেন্দ্রগুলো বেকার ও চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিনামূল্যে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করে থাকে। হেলো ওয়ার্ক দপ্তর সে দেশের সাম্প্রতিক চাকরির প্রস্তাবগুলোর একটি বিস্তৃত ডাটাবেজ বজায় রাখে, যা চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি সহজলভ্য তথ্যভাণ্ডার হিসেবে গড়ে উঠেছে। এ দপ্তর চাকরি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে জোরদার সহায়তা, নিয়োগ সাক্ষাৎকার প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তার সঙ্গে সংযোগ, মনোবিজ্ঞানী পরামর্শ, প্রশিক্ষণ প্রদান, বেকারত্ব ভাতা প্রদান এবং যোগ্যতা পরীক্ষা (অ্যাপ্টিটিউ টেস্ট) নিয়ে থাকে। হেলো ওয়ার্ক জাপানে বসবাসকারী বিদেশী বাসিন্দাদের জাপানি ভাষায় দক্ষতা উন্নয়নেরও পরামর্শ দেয়। এছাড়া জাপানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক ব্যক্তিদের জন্য কর্মসংস্থান সহায়তা প্রদান করা হয়। হেলো ওয়ার্ক, ভোকেশনাল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারস এবং অন্যান্য বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বিশেষভাবে দক্ষ ব্যক্তিদের চাকরির সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করা হয়।
আমেরিকান জব সেন্টারস (এজেসি) হলো যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র, যা চাকরিপ্রার্থীদের কর্ম অনুসন্ধানে সহায়তা করে এবং চাকরিদাতাদের জন্য উপযুক্ত কর্মী খুঁজতে সহায়তা করে। এ কেন্দ্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়। আমেরিকান জব সেন্টারস চাকরিপ্রার্থীদের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় চাকরির তালিকা প্রণয়ন, কর্মজীবন সম্পর্কিত পরামর্শ প্রদান ও পরিকল্পনা গ্রহণ, বেকারত্ব ভাতা প্রদান সম্পর্কিত তথ্য সংরক্ষণ ও সহায়তা প্রদান, চাকরি প্রাপ্তিসংক্রান্ত বিভিন্ন ফ্রি ও স্বল্পমূল্যে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা পরিচালনা করা, চাকরিদাতাদের সহায়তা প্রদান, চাকরিপ্রার্থীদের বিনামূল্যে রিজ্যুমে তৈরি এবং চাকরির ইন্টারভিউতে ভালো করার প্রস্তুতি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ কর্মসংস্থান সহায়তা দেয়া হয়। আমেরিকান জব সেন্টারসের (এজেসি) পাশাপাশি কিছু বিশেষ সংস্থা ও প্রোগ্রাম রয়েছে, যা প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের চাকরি পেতে এবং কর্মজীবনে সফল হতে সহায়তা করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র রয়েছে। এ সেবা কেন্দ্রগুলো চাকরি অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের সহায়তা প্রদান করাসহ এ-সংক্রান্ত নানা কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। এসব দেশের কর্মসংস্থান সেবা সম্পর্কিত উত্তম চর্চা অনুসরণ করে বাংলাদেশেও একটি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র সৃজন করা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনুযায়ী বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১৫-৬৫ বা তদূর্ধ্ব কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ১৫ লাখ; এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৬ কোটি ৭৫ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৫৮ লাখ ও মহিলা ২ কোটি ১৭ লাখ। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রতি বছর দেশের অভ্যন্তরে ১৮ দশমিক ৪ লাখ এবং বৈদেশিক কর্মে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করতে হবে। কর্মক্ষম মানুষের শিক্ষা, পেশাগত মান ও সামাজিক অবস্থানের বৈচিত্র্য এবং পক্ষান্তরে কর্মের চাহিদা ও সুযোগের বৈচিত্র্য এত বেশি যে কর্মক্ষম ব্যক্তিদের পক্ষে উপযুক্ত কর্ম অনুসন্ধান ও সেই কর্মের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।
দেশে সরকারি-বেসরকারি ১৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে; তাদের চাকরিযোগ্য করে তোলা বা চাকরি পাওয়ার পথ দেখিয়ে দেয়া বা কাউন্সেলিং করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা দেশে নেই বললেই চলে। বর্তমানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোসহ (বিএমইটি) অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রদানকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/সংস্থার এসব কার্যক্রম সমন্বয় সাধনের জন্য নিবেদিত ও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তাছাড়া প্রতি বছর শ্রমবাজারে ট্রেডভিত্তিক শ্রমিকের চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়ে কোনো সুসংগঠিত তথ্যভাণ্ডার ও গবেষণা নেই। এর ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবক/শ্রমিকদের কী সংখ্যক নিয়োগপ্রাপ্ত হচ্ছেন তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান তৈরি এবং তা মনিটরিংয়ের জন্য কোনো দপ্তর/সংস্থা নেই। ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ কর্মের বাইরে থেকে যাওয়ায় প্রশিক্ষণ বাবদ সরকারি অর্থের সদ্ব্যব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কর্মসংস্থান সম্পর্কিত একটি দপ্তর গঠন করা হলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবলযোগে কর্মসংস্থান পুল গঠন করে শ্রমবাজারে নিয়োগ পাওয়ার তথ্যটি নিশ্চিত করা বা মনিটরিং করা সম্ভব হবে। এতে কর্মক্ষেত্রে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করা সহজতর হবে। কর্মসংস্থান বিষয়ে নীতিনির্ধারণ, কর্মের সুযোগ সৃষ্টি ও কর্মে নিয়োগের উপায় নির্ধারণের উদ্দেশ্যে একটি কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র গঠন করা অতীব জরুরি।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জোয়ারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশনের মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আমাদের দেশেও শিল্প ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, মানুষের কাজ দখল করে নেবে উন্নত মানের মেশিন ও রোবট, ফলে শিল্প ক্ষেত্রে অনেক লোক তাদের কর্ম হারাবে। সম্প্রতি এটুআইয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৬০ শতাংশ, আসবাবপত্র শিল্পে ৫৫, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য শিল্পে ৪০, চামড়া ও জুতা শিল্পে ৩৫ এবং সেবা শিল্পে ২০ শতাংশ লোক কর্মহীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্নরাই টিকে থাকবেন। জানা যায়, আমাদের দেশে কারিগরি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল মাত্র ১৪ শতাংশ; কিন্তু উন্নত বিশ্বে কারিগরিভাবে দক্ষ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ। তাই আমাদের এখন থেকেই একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে এবং সেই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি দিক থেকে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের মাধ্যমে শ্রমবাজারের চাহিদার তথ্যাদি সংকলন ও বিশ্লেষণ করে দক্ষতা সমন্বয়ের মাধ্যমে শ্রমবাজারের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সমতা নিশ্চিতকরণ, শ্রমবাজারে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্ম প্রাপ্তিতে সহায়ক ভূমিকা পালন, একাডেমিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ইনকিউবেশন, স্টার্টআপ সেবা প্রদান এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃজনে সহায়তা প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনয়নসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
আমরা জানি, দক্ষিণ কোরিয়ায় এআই সহযোগী কেইআইএস সিস্টেম সফলভাবে চলমান রয়েছে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই বর্তমানে এ ধরনের এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট কর্মসংস্থান সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে আমাদেরকেও এআই সহযোগী কর্মসংস্থান সহায়তা কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। এই সিস্টেম একাধিক কাজ দ্রুত ও সঠিকভাবে করতে পারে, ফলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এটি নানা দিক থেকে উপযোগী হতে পারে। যেমন:
১. এআই চাকরির প্রস্তাব দিতে পারে, যেখানে চাকরিপ্রার্থীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং আগ্রহ অনুযায়ী সঠিক চাকরি খোঁজা যাবে;
২. এআই রিজ্যুমে বা কভার লেটার তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, যেখানে বিভিন্ন কাজের জন্য উপযুক্ত টেমপ্লেট ও ফরমেট ব্যবহার করা হবে;
৩. এআই চাকরিপ্রার্থীর জন্য নিয়োগ পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন তৈরি করতে পারে এবং যথাযথভাবে উত্তর দেয়ার কাজে সহায়তা করতে পারে;
৪. এআই প্ল্যাটফর্ম কর্মজীবন সম্পর্কিত স্কিলের ওপর কোর্স সাজেস্ট করতে পারে এবং শেখার জন্য রিসোর্স প্রস্তাব করতে পারে;
৫. এআই বিষয়ভিত্তিক ক্যারিয়ার পরামর্শ দিতে পারে, যেমন প্রার্থীর কোন ক্ষেত্রে ভালো সুযোগ রয়েছে, কোন স্কিলগুলোর ক্ষেত্রে অধিকতর উন্নতির সুযোগ রয়েছে ইত্যাদি।
অ্যালোকেশন অব বিজনেস ২০২৪ (সংশোধিত) অনুযায়ী শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৩৩টি দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছয়-সাতটি দায়িত্ব কর্মসংস্থান সম্পর্কিত। এর মধ্যে ১৭নং ক্রমিকে উল্লেখ আছে ‘Matters Relating to Labour Employment, Training and Apprenticeship’ অর্থাৎ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষানবিশির দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ২৭৪ ধারা হতে ২৮২ ধারা পর্যন্ত শিক্ষাধীনতা (Apprenticeship) সম্পর্কিত। শিক্ষাধীনতার প্রয়োগ সম্পর্কিত ২৭৪ ধারায় বলা হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান দুই বছরের অধিককাল যাবৎ চালু রয়েছে এবং যাহাতে অন্যূন ৫০ জন শ্রমিক রয়েছে সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ অধ্যায় প্রযোজ্য হবে। এ শিক্ষাধীনতা বাস্তবায়নযোগ্য শত শত শিল্প-কারখানা বা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে রয়েছে, কিন্তু এ আইনি বাধ্যবাধকতার বাস্তবায়ন খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী শিক্ষাধীনতা কর্মসূচি বাস্তবায়নে মালিকের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র ধরনের কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠন করা হলে এ দপ্তর শিক্ষাধীনতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে সমূহ অবদান রাখতে পারবে।
বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস (ডিইএমও) তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ দপ্তরের কার্যক্রম অভিবাসী কর্মীকেন্দ্রিক বিধায় দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সহায়তা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়ে মনিটরিংয়ের জন্য কোনো দপ্তর জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে নেই। এর ফলে দেশীয় শিল্প-কারখানাগুলোয় নিয়োগের ক্ষেত্রে উত্তম চর্চা নিশ্চিত করা দুরূহ কাজ। কর্মসংস্থান অধিদপ্তর গঠন করা হলে জেলা কার্যালয়ের মাধ্যমে এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজার ছাড়াও দেশে অপ্রাতিষ্ঠানিক বিশাল শ্রমবাজার, যেমন গৃহকর্মী, কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল রেস্তোরাঁ শ্রমিক ইত্যাদি রয়েছেন। কিন্তু এই শ্রেণীর শ্রমিকদের এ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ডাটাবেজ প্রস্তুত হয়নি বিধায় তাদের কর্মসংস্থান ও কল্যাণ বিষয়ে সরকারকে নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা দুরূহ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের শ্রেণীবিন্যাস করে ডাটাবেজ প্রস্তুতকরণ, রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনয়ন এবং তাদেরকে কর্মসংস্থানের মূল স্রোতধারায় আনয়নে কার্যক্রম গ্রহণ সৃজিতব্য কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের কার্যাবলিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের জন্য কর্মসংস্থান একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিবিএসের ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনুযায়ী দেশে মোট বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৫ লাখ ৫০ হাজার। যদিও প্রকৃত বিবেচনায় এ সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হলো ১২ কোটি ১৫ লাখ। প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি ১৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শত শত গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, এই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। অন্যদিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারের শ্রেণীবিন্যাসকৃত পূর্ণাঙ্গ তথ্য কোনো প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণ করে কিনা সন্দেহ আছে। শ্রম আইনে বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাধীনতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। প্রতিবন্ধী, অটিস্টিক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, বিশেষভাবে দক্ষ ব্যক্তি, বয়স্ক ও নারী এবং বিদেশ থেকে ফেরত আসা অভিবাসীদের জন্য চাকরির সুযোগ তৈরি, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত সহায়তা প্রদান করাও কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্রেরই কাজ। চাকরিদাতা ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা, বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রযুক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্নভাবে গড়ে তোলা, চাহিদা অনুযায়ী যে ধরনের দক্ষতা ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী প্রয়োজন, কর্মসংস্থান কেন্দ্রের মাধ্যমে এসব তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। এর ফলে শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হয়। শ্রমবাজারে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা এবং শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম, যেমন বেকার ভাতা প্রদান, ইআইএস বাস্তবায়ন করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
নতুন চাকরির বাজারে প্রবেশকারীদের উপযুক্ত চাকরি খুঁজে পেতে সীমাহীন সমস্যায় পড়তে হয়। সরকারি ও বেসরকারি চাকরির যাবতীয় তথ্য ও সেবা সহজলভ্য করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিগ ডাটাভিত্তিক একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন জব পোর্টাল তৈরি করাও সময়ের দাবি। গ্রামের জনগণও যাতে সহজে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত তথ্য পায়, সেজন্য মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল সেবামাধ্যম ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশে একটি কেন্দ্রীয় কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র চালু হলে তা বেকারত্ব হ্রাস, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাকরির সুযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এমন প্রেক্ষাপটে দেশের সুবিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিষয়ে নীতিনির্ধারণ, কর্মের সুযোগ সৃষ্টি ও কর্মে নিয়োগের উপায় নির্ধারণ ও প্রয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সেবা নিশ্চিতকরণ এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী কর্মসংস্থান সেবা কেন্দ্র হিসেবে ‘কর্মসংস্থান অধিদপ্তর’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
মোহাম্মদ কুদ্দুছ আলী সরকার: যুগ্ম সচিব (কর্মসংস্থান), শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়










