দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের ক্রমাবনতি ঘটে চলেছে। চলতি বছরের মে মাসে ব্যবসা পরিবেশ সূচক (বিবিএক্স) ২০২৩-২৪ জরিপে উল্লেখ করা হয়, সার্বিকভাবে ২০২৩ সালে দেশের ব্যবসা পরিবেশের সূচকে ১০০ স্কোরের মধ্যে অর্জন ৫৮ দশমিক ৭৫, যা ২০২২ সালে ছিল ৬১ দশমিক ৯৫। ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিতেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে পিছিয়ে। চলতি বছরেও এর খুব একটা উন্নতি হয়নি। এ বছর ব্যবসা পরিবেশের এমন ভঙ্গুর দশার জন্য প্রধানতম দায়ী দুর্নীতি বলে মনে করেন দেশের ১৭ শতাংশ ব্যবসায়ী। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্নীতির পাশাপাশি আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, মূল্যস্ফীতি, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো প্রভৃতিও ব্যবসার প্রধান অন্তরায়। চলতি বছরের শুরুতে ‘বাংলাদেশ ব্যবসায় পরিবেশ ২০২৩: উদ্যোক্তা জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক একটি জরিপ প্রকাশ করে সিপিডি। সেখানেও ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ব্যবসার সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় দুর্নীতিকে। এছাড়া এ জরিপে প্রশাসনিক অদক্ষতাও ব্যবসা পরিবেশের অবনতির বড় কারণ বলে উল্লেখ করা হয়। সুতরাং দেশে ব্যবসার প্রসার করতে হলে দুর্নীতি রোধ করা আবশ্যক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি ব্যবসার সার্বিক পরিবেশ সুষ্ঠু করতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের দিকেও নজর দেয়া প্রয়োজন।
কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। এর প্রভাব যেমন পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে, তেমনি গত দেড় দশকে রাজনৈতিক মদদে কতিপয় অলিগার্ক ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে যাদের রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। এসব ব্যবসায়ী দেশের ব্যাংক খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থও পাচার করেছে। আবার ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেও অনেক ব্যবসায়ীকে অযথা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, যা ব্যবসার প্রসারে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। উপরন্তু গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের মতোও ঘটনা ঘটেছে, যা ব্যবসা-বিনিয়োগের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। এদিকে আগে থেকে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণেও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। জ্বালানি সংকটে নির্বিঘ্ন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরেই। এমন আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় মানুষের মাঝে আস্থার সংকট তীব্র হয়েছে। এ অবস্থায় দুর্নীতি রোধ করে মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে, যাতে ব্যবসা-বিনিয়োগের প্রসার ঘটে। একই সঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ অন্য সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করায় মনোযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবসার খরচ বা কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। এর পেছনেও দুর্নীতির দায় রয়েছে। ঘুস থেকে শুরু করে চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। সিপিডির ওই সাম্প্রতিক সেমিনারে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সূত্রে জানা যায়, ভ্যাট-ট্যাক্স অফিসেই বছরে ২৫-৩০ লাখ টাকা ঘুস দিতে হয় তাদের। সেটা আবার দেখানো যায় না। সেজন্য ঘুসের টাকার ওপর আবার কর দিতে হয়। সিপিডির ওই জরিপে করসংক্রান্ত সেবা পেতে ঘুস দিতে হয় বলে মনে করেন ৫৭ শতাংশের বেশি ব্যবসায়ী। যদিও গত বছর এ অভিযোগ ছিল ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবসায়ীর। বছরের ব্যবধানে ব্যবসা পরিচালনায় ঘুসের কারবার আরো বেড়েছে দেশে।
এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন। কর ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। এটি যত দ্রুত সম্ভব পুরোপুরি ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনতে হবে। এছাড়া কর আরোপ যৌক্তিক ও স্বচ্ছ করতে হবে। অনেক সময় অতিরিক্ত কর ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয়। আবার দুর্নীতির কারণে ব্যবসা ব্যয়বহুল হলে তা নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে। আবার ব্যবসায়ীরা ব্যবসা-বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়েন। উৎপাদন কমিয়ে আনেন। এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারদরেও পড়ে। বাড়তি দাম গুনতে গিয়ে আর্থিক চাপের মধ্যে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ব্যয় কমিয়ে এনে বরং বিনিয়োগ বাড়িয়ে ব্যবসার উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে।
বর্তমানে ব্যবসা ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ নিম্নমুখী, বিশেষ করে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই)। বর্তমানে এফডিআইয়ের অর্ধেকই পুনর্বিনিয়োগ। এফডিআই নিম্নমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ ব্যবসা পরিবেশের সূচকে অবনতি। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হয়েছেন নতুন বিনিয়োগে। আবার ডলার সংকটে বিনিয়োগের মুনাফা প্রত্যাবাসনেও জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের। উপরন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে নতুনভাবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো অস্থিরতার দিকে নিয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না ফিরলে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা আরো কঠিন হয়ে উঠবে।
বিনিয়োগ আকৃষ্ট করায় আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাব। এর সমাধানও তাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন শিল্পোৎপাদন সম্ভব নয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধানে গতি বাড়াতে হবে। অফশোর ও অনশোরে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতাগুলোও দূর করতে হবে।
আবার ব্যবসা শুরু করার দাপ্তরিক প্রক্রিয়াও অত্যন্ত দীর্ঘ এবং অনেকাংশে বেশ হয়রানিমূলক। এসব আমলাতান্ত্রিক সমস্যা দূর করতে হবে। জমিপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। বিবিএক্স যে ১১টি সূচকের ভিত্তিতে ব্যবসা পরিবেশ বিশ্লেষণ করে, সেখানে দেখা যায় বাংলাদেশ সবচেয়ে খারাপ করেছে ঋণের প্রাপ্যতা সূচকে। এ সূচকে প্রাপ্ত পয়েন্ট মাত্র ২৮ দশমিক ১১। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ পাওয়ার বিষয়টি জটিল এখানে। গত বছরের জরিপেও বিষয়টি উঠে আসে।
দেশের ব্যবসা পরিবেশের আরেকটি প্রতিবন্ধকতা ঋণপ্রাপ্তি তথা অর্থসংস্থান। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিগত সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা ও ঋণের বাড়তি সুদের চাপে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমেছে। নীতি সুদহার দফায় দফায় বাড়ায় বেসরকারি খাতের ওপর বাড়তি সুদের চাপ এখনো বিদ্যমান। এ খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি কীভাবে আরো সহজ করা যায় এবং সুদহার কমিয়ে আনা যায় তা বিবেচনায় আনতে হবে।
দেশের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ অবশ্যই উন্নত করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম অনুষঙ্গ ব্যবসা-বিনিয়োগ। ব্যবসা পরিবেশ সহজ ও নিরাপদ হলে তা ব্যবসার প্রসারে সহায়ক হবে। বিনিয়োগেও মানুষ উৎসাহিত হবে। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ব্যবসা পরিবেশ সুষ্ঠু করা অপরিহার্য।










