উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আর্থিক খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল জায়গায় নিয়োগ এবং পদোন্নতির জন্য স্পষ্ট নিয়ম রয়েছে। সেখানে কেউ শুধু ডিগ্রি বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শীর্ষ পদে পৌঁছতে পারেন না। নির্দিষ্ট ধাপভিত্তিক সার্টিফিকেশন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। এসব সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করে যে ব্যক্তি কেবল কারিগরি জ্ঞানেই নয়, বরং নৈতিক মানদণ্ডেও যোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, একজন ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানারকে উচ্চ পদে যেতে হলে কয়েকটি স্তরে সার্টিফিকেশন অর্জন করতে হয়। একইভাবে ক্রেডিট রিস্ক বিশেষজ্ঞদের জন্যও আলাদা সার্টিফিকেশন কাঠামো বিদ্যমান।
এ ধরনের সার্টিফিকেশন কোনো সাধারণ শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়। বরং এগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে ব্যক্তি জটিল আর্থিক সমস্যা সমাধান ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব সামলানোর জন্য প্রকৃত বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে। এছাড়া প্রতিটি প্রার্থীকে একটি স্কিল সেট ম্যাট্রিক্স পূরণ করতে হয়, যেখানে কারিগরি জ্ঞান, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও নৈতিক সক্ষমতা একসঙ্গে মূল্যায়ন করা হয়। যদি কেউ নির্ধারিত স্কিল সেট অর্জন করতে না পারে, তবে তিনি পরবর্তী স্তরের জন্য যোগ্য নন। একইভাবে সবাই বুঝতে পারে যে নির্দিষ্ট কিছু কোর্স সম্পন্ন না করলে তারা কোনো বিশেষ পদে আবেদন করতে পারবেন না। আর বিশেষ কোনো পদ বা বিশেষজ্ঞ হিসেবে নির্বাচিত হতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অ্যাডভান্সড লেভেল সার্টিফিকেশন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু আমাদের দেশের আর্থিক খাত বহুদিন ধরেই এমন কোনো বাধ্যতামূলক শর্ত ছাড়া চলছে। ফলে দেখা যায়, অনেক সময় সিইও, এমডি বা পরিচালনা পর্ষদ তাদের পছন্দের লোককে সংবেদনশীল পদে বসাতে সক্ষম হন। এতে স্বচ্ছতা কমে যায়, পক্ষপাতিত্ব বাড়ে, এমনকি দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়। জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। স্বল্পমেয়াদে হয়তো এসব নিয়োগ সুবিধাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা প্রতিষ্ঠান ও পুরো শিল্পের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণ হয়েছে।
মুদ্রানীতির পরিচিত নীতি হলো ‘bad money drives out good money’। একই নিয়ম আর্থিক খাতের মানবসম্পদে প্রযোজ্য। যখন অযোগ্য বা অসৎ লোকদের বারবার সংবেদনশীল পদে বসানো হয়, তখন যোগ্য ও সৎ লোকেরা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। ফলে পুরো খাত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নীতি-নৈতিকতার মান ক্রমে নিচে নামে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু পেশাগত প্রশিক্ষণ কোর্স চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু প্রচলিত প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, এ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি প্রযুক্তি। ডাটা অ্যানালিটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং এখন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আর্থিক পূর্বাভাস, প্রতারণা শনাক্তকরণ, এমনকি গ্রাহক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায়ও বিপ্লব ঘটাচ্ছে। আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এসব বিষয়ে দক্ষ ও সার্টিফায়েড জনবল তৈরি করতে না পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে।
এখানেই স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম), বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমি (বিবিটিএ) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ চাইলে বড় দায়িত্ব নিতে পারে। তারা চাইলে এমন সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম চালু করতে পারে, যেখানে কেবল ঐতিহ্যবাহী আর্থিক দক্ষতা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের জন্য জরুরি প্রযুক্তিগত জ্ঞানও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যেমন ডাটা অ্যানালিটিকস দিয়ে আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ, মেশিন লার্নিং দিয়ে ঝুঁকির পূর্বাভাস কিংবা এআই দিয়ে প্রতারণা শনাক্তকরণ। এ ধরনের কোর্সের মাধ্যমে এমন একটি পেশাজীবী প্রজন্ম তৈরি হবে, যারা একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী আর্থিক ঝুঁকি মোকাবেলা ও নতুন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ সামলাতে সক্ষম হবে।
কেন এটি অপরিহার্য?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সার্টিফিকেশন কেবল দক্ষতা যাচাইয়ের বিষয় নয়, বরং দুর্নীতি ও অযোগ্যতার বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষাবলয়। যে কেউ যাতে প্রভাব খাটিয়ে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে সংবেদনশীল পদে না যেতে পারে, সেজন্যই সার্টিফিকেশনকে বাধ্যতামূলক করা হয়। আমাদের দেশেও এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন হবে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে যদি আগামী কয়েক দশকে আরো শক্তিশালী ও টেকসই করতে হয়, তবে পেশাগত সার্টিফিকেশনকে এখনই বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটিকে অতিরিক্ত বিকল্প হিসেবে দেখা যাবে না; বরং অপরিহার্য পূর্বশর্ত হিসেবে নিতে হবে। তখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পদগুলোয় বসবেন প্রকৃত দক্ষ ও সৎ মানুষ—পক্ষপাতদুষ্ট নয়।
আগামী ১০-১২ বছরের পরিকল্পনা:
প্রথম ধাপ (এক-তিন বছর): প্রস্তুতি ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি
- সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করার জন্য নীতি ও আইন প্রণয়ন।
- বাংলাদেশ ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে একটি জাতীয় সার্টিফিকেশন রোডম্যাপ ঘোষণা।
- স্থানীয় প্রতিষ্ঠান যেমন বিআইবিএম, বিবিটিএ, আইবিএকে দায়িত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কোর্স ডিজাইন করা।
- ডাটা অ্যানালিটিকস, মেশিন লার্নিং ও এআইকে প্রাথমিক পর্যায়ের কোর্সেই অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে নতুন প্রজন্ম শুরু থেকেই প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতায় অভ্যস্ত হয়।
- বিদ্যমান কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ ‘ট্রানজিশন কোর্স’ চালু করা, যাতে তারা বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে সার্টিফায়েড হতে পারেন।
দ্বিতীয় ধাপ (চার-সাত বছর): বাস্তবায়ন ও মানবসম্পদে রূপান্তর
- নতুন নিয়োগ ও পদোন্নতিতে সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করা।
- ধাপে ধাপে অযোগ্য বা সার্টিফিকেশনবিহীন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া।
- একটি রিভিউ বোর্ড গঠন করা, যারা সার্টিফিকেশনবিহীন কর্মকর্তাদের অবস্থান মূল্যায়ন করবে।
- আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (যেমন সিএফএ ইনস্টিটিউট, জিএআরপি, এসিসিএ) সঙ্গে যৌথ সার্টিফিকেশন চালু করা, যাতে আমাদের জনবল বিশ্বমানের স্বীকৃতি পায়।
- প্রযুক্তিভিত্তিক সার্টিফিকেশনের সংখ্যা ও গভীরতা বাড়ানো, বিশেষ করে রিস্ক মডেলিং, প্রতারণা শনাক্তকরণ ও ফাইন্যান্সিয়াল ফোরকাস্টিংয়ে।
তৃতীয় ধাপ (৮-১২ বছর): টেকসই ব্যবস্থা ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি
- সার্টিফিকেশনকে আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রভাব খাটিয়ে নীতি ভাঙতে না পারে।
- জাতীয় দক্ষতা ডাটাবেজ তৈরি করা, যেখানে সার্টিফিকেশনধারী সব পেশাজীবীর তথ্য থাকবে এবং নিয়োগে এটি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে।
- উন্নত প্রযুক্তি যেমন এআইচালিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা, ব্লকচেইনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি সিস্টেম ইত্যাদিকে সার্টিফিকেশনের সঙ্গে একীভূত করা।
- আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের সার্টিফিকেশন স্বীকৃতি আদায় করা, যাতে দেশীয় পেশাজীবীরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন।
মোহাম্মদ আবুল আহসান: ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইউনাইটেড ফাইন্যান্স










