ঘটনার আকস্মিকতায় সারা বিশ্ব হকচকিত। এমন ঘটনা যে একবিংশ শতাব্দীতে ঘটতে পারে, তাই বিশ্বের চিন্তা-চেতনায় ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান এবং তার স্ত্রীকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে কারাকাস থেকে নিউইয়র্কে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষ্য মতে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিচার করবে ‘মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার’ অভিযোগে, যে প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এ ঘটনার সূত্র ধরে গত ক’দিনে তিনটা ঘোষণা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। এক. যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার জ্বালানি সম্পদ অধিগ্রহণ করল। এ জ্বালানি তেল অনির্দিষ্টকালের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বিক্রি করবে এবং প্রাপ্ত অর্থ যুক্তরাষ্ট্র ব্যয় করবে তার ইচ্ছা অনুযায়ী। দুই. এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ‘ভেনিজুয়েলা চালাবে’, যার অর্থ খুব সুস্পষ্ট নয়। তিন. ভেনিজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান তদারকির কোনো সময়সীমা নেই।
এক কথায়, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলাকে গ্রাস করেছে—রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই। যুক্তরাষ্ট্র আপাতদৃষ্টিতে ভেনিজুয়েলার ভূখণ্ড দখল করেনি, কিন্তু কার্যকরভাবে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে যুক্তরাষ্ট্রের এ ন্যক্কারজনক কাজ বিশ্বব্যাপী ধিক্কৃত হয়েছে। একটি দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান যদি কোনো অন্যায় কাজ করে থাকেন, তাহলে তার বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশটির বিচার ব্যবস্থা ও চূড়ান্তভাবে জনগণ আছেন। কিন্তু একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে আরেকটি দেশের বিশেষ বাহিনী অপহরণ করে হাতকড়া পরিয়ে সে দেশে নিয়ে যাবে বিচারের জন্য, এটা অভাবনীয়। তবে এটা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত দেশ বলে দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেই সম্ভব, কারণ এমন কাজ করার ইতিহাস সে দেশটির আছে।
১৮৯৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অবৈধ পন্থায় লাতিন আমেরিকায় সরকার বদলের কুকর্মে যুক্তরাষ্ট্র ৪১ বার লিপ্ত ছিল। এর মধ্যে রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকারপ্রধান হত্যা থেকে বৈধ সরকারের পতন ঘটানো সবই আছে। যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্র এ জাতীয় কাণ্ডটি ঘটিয়েছে, তার মধ্যে আর্জেন্টিনা (১৯৭৬), বলিভিয়া (১৯৭১), ব্রাজিল (১৯৬৪), চিলি (১৯৭৩), গুয়াতেমালা (১৯৫৪), পানামা (১৯৯৩), হাইতি (১৯৯১), গ্রেনেডা (১৯৮৩), হন্ডুরাস (২০০৯), ডোমিনিকান রিপাবলিক (১৯৬৫) ইত্যাদি। লাতিন আমেরিকার বাইরেও যুক্তরাষ্ট্র নানা সময়ে বিশ্বের নানা দেশে সরকার উৎখাতে ব্যাপৃত ছিল—যেমন ইরান (১৯৫৩), কঙ্গো (১৯৬১), দক্ষিণ ভিয়েতনাম (১৯৬৩), ইন্দোনেশিয়া (১৯৬৫-১৯৬৭), ইরাক (২০০৩), আফগানিস্তান (২০০১)। বৈশ্বিক স্নায়ুযুদ্ধের কালে যুক্তরাষ্ট্র ৭২ বার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার উৎখাতে সক্রিয় ছিল। এখানে বলা দরকার যে কোনো আদর্শগত অবস্থান নয়, বরং স্বীয় স্বার্থের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এমন সব জঘন্য কাজ করেছিল।
ভেনিজুয়েলার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কুদৃষ্টিও দীর্ঘদিনের। ২০০২ সালে ৪৮ ঘণ্টার জন্য ভেনিজুয়েলার তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান হুগো শাভেজকে ক্ষমতাচ্যুত করে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ২০১৭-১৯ সালে ওয়াশিংটন ভেনিজুয়েলার আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে প্রবেশ বন্ধ করে এবং জ্বালানি তেলের কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক হারে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। প্রথমত, শাভেজের বামপন্থী সরকারের চরম অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার ফলে দেশটির অর্থনীতি একটি গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে। দেশে প্রবল অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়, মূল্যস্ফীতি ৫০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, লাখ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যায়, পুরো দেশে খাদ্যসহ নানা সামগ্রীর আকাল পড়ে যায়। দেশজুড়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়িয়ে পড়ে এবং নানা বঞ্চনার শিকার ৩০ লাখ মানুষ ভেনিজুয়েলার সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে চলে যায়। অন্যদিকে যেহেতু দেশটি গভীরভাবে জ্বালানি তেল রফতানির ওপর নির্ভরশীল, তাই পণ্যটির ওপরে নিষেধাজ্ঞা ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের চোখ রয়েছে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেলের প্রতি। ভেনিজুয়েলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার। সুতরাং সেই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হচ্ছে সেই পণ্য কুক্ষিগত করা। নিজের দেশের জ্বালানি তেল কূপ খনন, উত্তোলন, পরিশোধন ও বাজারজাতকরণ দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়সাধ্য প্রক্রিয়া। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ উপায় হচ্ছে ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেল অধিগ্রহণ। সেই সঙ্গে এ পণ্য বিক্রির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে পারবে। এরই মধ্যে বলা হয়েছে যে ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে পাঁচ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল দেবে। এটি বিক্রি থেকে যে অর্থ পাওয়া যাবে, তা মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এ বিক্রি থেকে ২৭৫ কোটি ডলার আয় হবে। সেই সঙ্গে ‘মারিনেরা’ নামক যে রুশ জাহাজটি ভেনিজুয়েলা, ইরান ও রাশিয়ার জ্বালানি তেল পরিবহন করে, তাকে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিতে ভেনিজুয়েলার উপরাষ্ট্রপতি দেলসি রড্রিগেজকে দেশটির অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। লক্ষণীয় যে যুক্তরাষ্ট্রের বান্ধব শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মারিয়া মাচাদোকে উপেক্ষা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাদের স্বার্থের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ভেনিজুয়েলায় গণতন্ত্র নয়, বরং স্থিতিশীলতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের ফলে বিশ্বের বাজারে অনিশ্চয়তা দেখা যাওয়ার ফলে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহের আধিক্যের কারণে এমনিতেই পণ্যটির বাজার চাপের মুখে আছে। ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেলের জোগান যদি বেড়ে যায়, তবে এর দাম আরো কমে যেতে পারে। বিশেষত ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের নতুন সরকার জ্বালানি তেলের উৎপাদন বাড়াতে বদ্ধপরিকর থাকবে, যা পণ্যটির মূল্যের ক্ষেত্রে আরো নিম্নমুখী চাপ দেবে।
তবে দেশটির জন্য বর্তমানে একটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে জ্বালানি তেল শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ও নাশকতার ঝুঁকি। এ খাতের শ্রমিকদের চরম দারিদ্র্যের কথাটি সর্বজনবদিত। সেই পরিপ্রেক্ষিতে যদি শ্রমিক ধর্মঘট দেখা দেয়, তাহলে দীর্ঘ সময়ের জন্য জ্বালানি তেল উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। ভেনিজুয়েলায় বিশ্বের অন্যতম ব্যাপক জ্বালানি তেলের মজুদ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও বিনিয়োগের অভাবে দেশটি এর সুবিধা নিতে পারেনি। সুতরাং ভেনিজুয়েলার লক্ষ্য হওয়া উচিত জ্বালানি তেল শিল্পের আধুনিকায়ন। সেটা হলে দেশটিতে দৈনিক পাঁচ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল উত্তোলন সম্ভব। তবে পুরো ব্যাপারটিই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার উন্নয়নে উৎসাহী নয়, দেশটির মানুষের কুশলে আগ্রহী নয়, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র লক্ষ্য ভেনিজুয়েলার জ্বালানি তেলসম্পদ।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের পুরো ব্যাপারটিকেই নানাভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন যে ব্যাপারটি হচ্ছে ‘বলপ্রয়োগ ও শক্তি প্রদর্শনের নতুন মার্কিন মিশন’। কেউ কেউ বলছেন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন নয়, বরং এটা হচ্ছে একটা হুমকি যে ‘সব্বাইকে আমাকে মেনে চলতে হবে এবং আমার কথা শুনতে হবে’। কারো কারো মতে, এ সবকিছুর সম্মিলনে এটা হচ্ছে একটি নতুন ‘ট্রাম্প তত্ত্ব’। তবে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এটা জাতীয় সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো, বৈশ্বিক রীতিনীতি, কূটনৈতিক ব্যবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। আমি মনে করি, পুরো ঘটনাটিই হচ্ছে একটি ‘রাষ্ট্রীয় মবতন্ত্র’।
একটি পাদটীকা দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। যুক্তরাষ্ট্র একই রকমের হুমকি দিয়েছে কলাম্বিয়া ও মেক্সিকোকে। ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য কথাও বলেছে যুক্তরাষ্ট্র—হয় অভিযান চালিয়ে, নয় কিনে নিয়ে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডকে দরকার। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র










