বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে ঢাকার পার্ক, মাঠ ও জলাশয় দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে। ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডে গাছ কাটা, তেঁতুলতলা মাঠে থানা ভবন নির্মাণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে পরিবেশকে ধ্বংস করার প্রবণতা একই। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে যেসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদীরা রাজপথে নেমেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সময়েও সেই একই সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প সামনে আসা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। কারণ গত সরকার সময়ে আন্দোলনে যারা ছিলেন তারাই অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এতে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলাধার। রাজধানীর অন্যতম জলাধার হাতিরঝিল ও পার্ক পান্থকুঞ্জের ওপর দিয়ে নির্মাণ হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি সংযোগ সড়ক (র্যাম্প)। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশকর্মীরা সেখানে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়—গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনকারীদের কথা শুনেছেন, আশ্বাস দিয়েছেন আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেয়ার। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং আন্দোলনকারীদের আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছে, আর পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিলের উন্মুক্ত স্থানে যেকোনো নির্মাণকাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এ অবস্থায় আদালতের স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে আপিল করে আবার পান্থকুঞ্জে নির্মাণকাজ শুরু করেছে সরকার। এ ধরনের পরিবেশবিধ্বংসী সিদ্ধান্তে সরকারের প্রতি নাগরিকদের আস্থা নষ্ট হওয়াই স্বাভাবিক।
বিগত শাসনামলে নেয়া ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিলের সংরক্ষিত জলাধারে এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত চলমান সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ হাতিরঝিল প্রকল্পের সার্বিক লক্ষ্য ও উপযোগিতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। এ প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে হাতিরঝিল জলাধার ও পান্থকুঞ্জ পার্ক নষ্ট করার পাশাপাশি পলাশী পর্যন্ত বিদ্যমান রাস্তার উপযোগিতাও নষ্ট হবে। এ এলাকার মানুষজনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সামগ্রিক পরিবেশ বিনষ্ট করার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় যানজট বাড়াবে। মেগা প্রকল্পের বিনিয়োগ ফেরত আনা ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলের সুযোগ করে দেয়ার এ আয়োজনের মাধ্যমে ঢাকার পরিবেশকে আরো ঝুঁকিতে ফেলবে।
এফডিসি থেকে পলাশী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের যে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ চলছে, তা হাতিরঝিল প্রকল্পকে নষ্ট করছে। হাতিরঝিলে এক্সপ্রেসওয়ের একের পর এক পিলার প্রকল্প এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জলাধারের পানিপ্রবাহ ও সার্বিক উপযোগিতা ধ্বংস করবে। পৃথিবীর উন্নত ও আধুনিক শহরগুলো নগর এলাকায় ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক পরিবহন সমস্যা সমাধানের কৌশল থেকে সরে এসেছে। অথচ বাংলাদেশ এখন পরিবহন সমস্যার সমাধান কৌশল হিসেবে নগর এলাকায় ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক পরিকল্পনা করে যাচ্ছে, যা ব্যক্তিগত গাড়িকে উৎসাহিত করে। পরিবহন-ভূমি ব্যবহারের পারস্পরিক সম্পর্কজনিত প্রভাব বিশ্লেষণ না করেই অধিকাংশ পরিবহন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, যা প্রায়ই সামষ্টিক জনকল্যাণের অন্তরায় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
শুধু পান্থকুঞ্জ পার্কই নয়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও চলছে পরিবেশের জন্য বিরূপ কর্মকাণ্ড। সেখানে শিশুপার্ক সংস্কারের নামে পার্কের বড় অংশই কংক্রিটের আচ্ছাদনে ঢেকে দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্যানের ভেতর সম্প্রতি আনসার ক্যাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে উদ্যানে ওয়াকওয়ে নির্মাণের নামে কংক্রিটের আচ্ছাদন দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢাকায় বর্তমানে দুটি পাতাল মেট্রোরেলের কাজ চলমান। এর মধ্যে হেমায়েতপুর-ভাটারার মধ্যে নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-৫, নর্দান রুটের গতিপথে রয়েছে দুটি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। এ মেট্রোরেলের গতিপথ পড়েছে গুলশান-বারিধারা লেক ও তুরাগ নদে। গুলশান-বারিধারা লেক ২০০১ সালে এবং তুরাগ নদকে ২০০৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরিবেশবিদরা বলছেন, গুলশান-বারিধারা লেক ও তুরাগ নদের নিচ দিয়ে যখন পাতাল রেল চলবে, তখন যে কম্পন হবে এবং শব্দ উৎপন্ন হবে তা এই লেকের জীববৈচিত্র্য ও জলজ বাস্তুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।
উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পের (এমআরটি লাইন-৬) মাধ্যমে ফার্মগেটের আনোয়ারা উদ্যান দখলে নিয়েছিল মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পান্থকুঞ্জ পার্কে এসে সড়ক উপদেষ্টা ঘোষণা করেছিলেন পরের বছর মার্চেই (২০২৫) ফার্মগেটের শহীদ আনোয়ারা উদ্যান উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু আনোয়ারা উদ্যান উন্মুক্ত হয়েছে গত শুক্রবার এবং তা-ও ব্যবহারের উপযোগী পরিবেশ ছাড়াই।
গত কয়েক দশকে এ ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ঢাকার পরিবেশগত সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছুটির দিনগুলোয়ও বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোয় অন্যতম অবস্থানে থাকে ঢাকা। রাজধানী ঢাকায় নেই পর্যাপ্ত জলাধার ও সবুজের উপস্থিতি। নদী ও খাল দখল করে অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে অবকাঠামো। অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে যেটুকু জলাধার বা নদী রয়েছে সেগুলোও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিবেশ ধ্বংস করে বিগত সরকারের নেয়া জনবিরোধী ও পরিবেশবিধ্বংসী প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার বিগত সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে বলে মনে করছেন নগরবিদরা।
পরিবেশকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল এ সরকারের সময়ে তেমন কোনো পরিবেশবিষয়ক আন্দোলনের প্রয়োজন হবে না। বরং সরকার নিজ থেকেই পার্ক-মাঠ-জলাশয় দখল রোধ করবে। কিন্তু এ সরকারও অতীতের মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বিগত শাসনের ভুল সংশোধনের সুযোগ ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি এ সরকার। বরং পরিবেশ প্রশ্নে একই ধরনের উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি বহাল থাকায় নাগরিক সমাজের হতাশা আরো গভীর হয়েছে। ঢাকার মতো জনবহুল ও পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন শহরে মাঠ, পার্ক ও জলাশয় কোনো বিলাসিতা নয়—এগুলো মৌলিক নাগরিক অধিকার। এগুলো দখল বা ধ্বংস করে নগর উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকার যদি সত্যিই একটি ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায়, তাহলে পরিবেশ ও জনপরিসর রক্ষায় স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিতে হবে।
বাংলাদেশে যোগাযোগ ও পরিবহন অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত আগে নেয়া হয়, তারপর সেটাকে বৈধ করার জন্য সমীক্ষা বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ৫ শতাংশ মানুষ চলাচল করে, তাদের জন্যই বড় বড় মেগা প্রকল্প নেয়া হয়। অথচ তার কুফল ভোগ করে বাকি ৯৫ শতাংশ মানুষ। এ প্রবণতা থেকে বের হয়ে কম ব্যয়ে ও সহজে বাস্তবায়নযোগ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য পরিবহন ও নগর পরিকল্পনার কর্মকৌশল তৈরি করা প্রয়োজন।
এক্সপ্রেসওয়ের অপরিণামদর্শী সম্প্রসারণ থেকে হাতিরঝিল, পান্থকুঞ্জ পার্কসহ সংশ্লিষ্ট এলাকাকে সুরক্ষা দিতে এখনই এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। হাতিরঝিল জলাধারকে রক্ষা করা দরকার এবং পান্থকুঞ্জ পার্ককে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা ও দ্রুত সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার পাশাপাশি হাতিরঝিল থেকে পলাশী পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক নির্মাণ পুনর্বিবেচনা করা উচিত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পান্থকুঞ্জ পার্কসংলগ্ন এলাকা ঘনবসতি ও জনঘনত্বপূর্ণ। আশপাশে কোনো খোলা বা উন্মুক্ত জায়গা নেই। আর হাতিরঝিল এ অঞ্চলের সর্বশেষ বড় জলাধার। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এ জলাধার খুব দরকারি। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ সড়ক বানিয়ে পান্থকুঞ্জ পার্ক ও হাতিরঝিল প্রকল্প ধ্বংস করা মোটেই ঠিক হবে না। পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংস করে অবকাঠামো উন্নয়নের আত্মঘাতী দর্শন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।










