বাংলাদেশী উপকূলীয় জেলেদের জীবন মূলত সাগরের ওপর নির্ভরশীল। বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরাই তাদের একমাত্র জীবিক-উপার্জনের মাধ্যম। কিন্তু সাগর আজ শুধু রুটি-রুজির উৎস নয়—এটি এখন মানবিক সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত পাঁচ বছরে প্রতি বছর ভারতীয় কোস্টগার্ড ২০-৩০ জন বাংলাদেশী জেলেকে আটক করেছে। ২০১৯ সালে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩২ জন জেলে আটক হন। ২০২১-২২ সালে একই ধরনের ঘটনায় ২৭ জন জেলে আটক হন। সম্প্রতি ১৮ জানুয়ারি ২০২৬, ভারতীয় কোস্টগার্ড ২৪ জন বাংলাদেশী জেলেকে আটক করেছে, সঙ্গে ছিল একটি ট্রলার—এফবি সাফওয়ান। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সবাই বাংলাদেশের নাগরিক বলে স্বীকার করেছেন।

অধিকাংশ বাংলাদেশী জেলে ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করেন না। ঝড়, কুয়াশা, দিকভ্রান্তি, জালের টান বা ট্রলারের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অনিচ্ছাকৃত প্রবেশ ঘটে। বাংলাদেশের ট্রলারগুলো ছোট, প্রযুক্তিহীন এবং আধুনিক নেভিগেশনের অভাব—ফলে নিরাপদে মাছ ধরতে সাগরে নামা জেলেরা ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। ভারতীয় জেলেরা বড়, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ট্রলার ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ ধরে, বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে। এ কর্মকাণ্ডে ক্ষুদ্র জেলেরা নিঃস্ব হন এবং উপকূলীয় এলাকার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।

প্রতি বছর এত বেশি জেলে আটক হচ্ছেন, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমঝোতা বা মানবিক প্রটোকল নেই। এ শূন্যতার মধ্যে কোস্ট ফাউন্ডেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৮ সাল থেকে সংস্থাটি বারবার আটক জেলেদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভারতীয় হাইকমিশন ও ভারতীয় মৎস্যজীবী নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে মুক্তি নিশ্চিত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তাও দিয়েছে। সংস্থার এ কাজ দেখাচ্ছে যে উপকূলীয় মানুষের প্রতি সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা কেবল মানবিক নয়, রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপূরকও হতে পারে।

প্রয়োজনীয় সমাধান হতে পারে:

  • দুই দেশের মধ্যে জেলেবান্ধব দ্রুত প্রত্যাবাসন চুক্তি।
  • যৌথ সমুদ্র টহল ও নজরদারি ব্যবস্থা।
  • বাংলাদেশী জেলেদের জন্য আধুনিক নেভিগেশন প্রযুক্তি ও নিরাপদ ট্রলার।
  • সীমান্ত লঙ্ঘন রোধে কার্যকর আইন প্রয়োগ ও কূটনৈতিক সমন্বয়।

মনে রাখতে হবে, জেলেরা অপরাধী নয়। তারা জীবিকার তাগিদে সাগরে যান। কূটনৈতিক উদাসীনতা এবং সীমান্তনীতি তাদের বারবার শাস্তির মুখে ফেলে। বঙ্গোপসাগরের মাছ ধরে বেঁচে থাকা এ মানুষগুলোর জীবন বারবার ঝুঁকির মুখে—এখন সময় এসেছে রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের মানবিক দায়িত্ব ও কূটনীতি সমন্বয় করে স্থায়ী সমাধান আনার। অন্যথায় এ মানবিক সংকট চলতেই থাকবে এবং জেলেদের চোখের জল থামবে না।

মোস্তফা কামাল আকন্দ
পরিচালক (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এন্ড এসআর), কোস্ট ফাউন্ডেশন