সবাই সেই বিখ্যাত বিল মারে ও অ্যান্ডি ম্যাকডোয়েল অভিনীত আমেরিকান চলচ্চিত্র ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’কে স্মরণ করি। কিন্তু কেউই চাইবে না সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর একই জিনিস বারবার করে যেতে। কিন্তু বাস্তবে আমরা ঠিক সেভাবেই বেঁচে আছি। এটাই আমাদের জীবন, আর এমন প্রতিটি ফোরাম সেটাই প্রমাণ করে। ঠিক গত বছর, ইউরোপকে জানতে হবে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়—এ কথা দিয়েই দাভোসে আমি আমার ভাষণ শেষ করেছিলাম। এক বছর কেটে গেছে, কিন্তু কিছুই বদলায়নি। আজও আমাকে একই কথা বলতে হচ্ছে। কিন্তু কেন? উত্তরটা শুধু সম্ভাব্য হুমকির মধ্যেই নিহিত নয়; প্রতি বছরই ইউরোপ ও বিশ্বের জন্য নতুন কিছু নিয়ে আসে। সবাই এখন গ্রিনল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু বেশির ভাগ নেতাই বুঝতে পারছেন না, এ নিয়ে কী করা উচিত। মনে হচ্ছে সবাই শুধু অপেক্ষা করছে—আমেরিকা যেন এ বিষয়টা নিয়ে ঠাণ্ডা হয়, আশা করছে ব্যাপারটা এমনিতেই মিলিয়ে যাবে। কিন্তু যদি না যায়? তখন কী হবে?
ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো রক্তে ডুবে গেছে। বিশ্বনেতারা ইরানের জনগণকে সাহায্য করেনি। এটা সত্য, বিশ্ব পাশে দাঁড়ায়নি। ইউরোপে তখন বড়দিন ও নববর্ষের ছুটি চলছিল। রাজনীতিবিদরা কাজে ফিরতে ফিরতে, অবস্থান নিতে নিতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এরই মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন। এ রক্তপাতের পর ইরানের কী হবে? যদি সেই শাসন টিকে যায়, তবে তা প্রতিটি দাদাগিরি করা শাসকের জন্য স্পষ্ট বার্তা দেয়—মানুষ মারো, তাহলেই ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়। ইউরোপে কে চায় এ বার্তা বাস্তবে রূপ নিক? অথচ ইউরোপ এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করেনি।
পশ্চিমের দিকে তাকাই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় একটি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন এবং নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করেছিলেন। এ নিয়ে ভিন্নমত ছিল, কিন্তু সত্য হলো—মাদুরো এখন নিউইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিচারাধীন নন। অথচ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। আর যিনি এটি শুরু করেছেন, তিনি শুধু মুক্তই নন—তিনি এখনো ইউরোপে জমানো রাখা অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য লড়ছেন। আর বলতে হয়, তিনি কিছুটা সফলও হচ্ছেন। পুতিনই যেন ঠিক করতে চাইছেন, জব্দ করা রুশ সম্পদ কীভাবে ব্যবহার হবে, অথচ যাদের ক্ষমতা আছে তাকে শাস্তি দেয়ার তারা সেটি করছে না। সৌভাগ্যক্রমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ সম্পদ অনির্দিষ্টকালের জন্য জব্দ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ—উরসুলা ভন ডার লেন, আন্তোনিও গুতেরেস এবং যারা এতে সাহায্য করেছেন সবাইকে ধন্যবাদ। কিন্তু যখন সেই সম্পদ ব্যবহার করে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ার সময় এল, তখন সিদ্ধান্ত আটকে গেল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পুতিন ইউরোপকে থামাতে পেরেছে।
আমেরিকার অবস্থানের কারণে এখন মানুষ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছে। এটা আমেরিকার ঐতিহাসিক অবস্থান, কিন্তু একই সঙ্গে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রুশ আগ্রাসনের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনে এখনো কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। চুক্তি আছে, বহু বৈঠক হয়েছে, কিন্তু ইউরোপ এখনো একটি ট্রাইবুনাল গঠন করতে পারেনি। কী ঘাটতি—সময় নাকি রাজনৈতিক সদিচ্ছার? ইউরোপে প্রায়ই ন্যায়বিচারের চেয়ে অন্য কিছু বেশি জরুরি হয়ে ওঠে।
এখন আমরা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে অংশীদারদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছি। তবে এগুলো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের জন্য। যুদ্ধবিরতি হলে সেখানে বাহিনী থাকবে, যৌথ টহল হবে, ইউক্রেনে অংশীদার দেশের পতাকা থাকবে—এটা ভালো পদক্ষেপ। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স বাস্তবেই বাহিনী পাঠাতে প্রস্তুত, যা সত্যিই ইতিবাচক বার্তা। এ বিষয়ে প্রথম চুক্তিও হয়েছে। কিয়ার স্টারমারসহ আমাদের জোটের সব নেতাকে ধন্যবাদ। আমরা নিশ্চিত করছি, আগ্রহীদের জোট যেন সত্যিকারের ‘কার্যকর জোটে’ পরিণত হয়। কিন্তু আবারো বলতে হয়, শেষ ভরসা হিসেবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর্থন দরকার। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কোনো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কার্যকর হয় না।
কিন্তু যুদ্ধবিরতিটা কে করাবে? ইউরোপ ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করে। কিন্তু বর্তমানের কাজ এড়িয়ে যায়—যে কাজ ঠিক করবে আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে। সমস্যা এখানেই। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন ছায়া বহরের ট্যাংকার থামাতে ও তেল জব্দ করতে পারেন, অথচ ইউরোপ পারে না? ইউরোপের উপকূলঘেঁষে রুশ তেল পরিবাহিত হচ্ছে, সেই তেল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থ জোগাচ্ছে। সেই তেল ইউরোপকে অস্থিতিশীল করছে। তাই রুশ তেল পরিবহন থামাতে হবে, জব্দ করতে হবে, আর ইউরোপের স্বার্থে বিক্রি করতে হবে। কেন নয়? পুতিনের টাকা না থাকলে ইউরোপে যুদ্ধ থাকবে না। ইউরোপের টাকা থাকলে সে ইউরোপ তার জনগণকে রক্ষা করতে পারবে। এখন এ ট্যাংকারগুলো পুতিনের জন্য টাকা বানাচ্ছে, আর তাই রাশিয়া তার এজেন্ডা চালিয়ে যেতে পারছে।
আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি—ইউরোপের ঐক্যবদ্ধ সশস্ত্র বাহিনী দরকার, যা ইউরোপকে রক্ষা করতে পারবে। বিপদ এলে ন্যাটো কাজ করবে—ইউরোপ শুধু এ বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কেউ ন্যাটোকে বাস্তবে কাজ করতে দেখেনি। যদি পুতিন লিথুয়ানিয়া দখল করতে চান বা পোল্যান্ডে আক্রমণ করেন, কে জবাব দেবে? যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে আসবে—এখন ন্যাটোও এ বিশ্বাসে টিকে আছে। কিন্তু যদি না আসে? বিশ্বাস করুন, এ প্রশ্ন প্রতিটি ইউরোপীয় নেতার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে যেতে চাইছে, কেউ অপেক্ষা করছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমস্যা মিলিয়ে যাবে ভেবে। কেউ কেউ অস্ত্র উৎপাদনে বিনিয়োগ শুরু করেছে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমেরিকা চাপ না দিলে বেশির ভাগ দেশই জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষায় ব্যয় করার চেষ্টা করেনি—যেটা ন্যূনতম প্রয়োজন। ইউরোপকে জানতে হবে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়। গ্রিনল্যান্ডে যদি ৪০ জন সৈন্য পাঠান, সেটা কীসের বার্তা দেয়? পুতিনকে কী বার্তা দেয়? চীনকে কী বার্তা দেয়? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ডেনমার্ককে কী বার্তা দেয়? ইউরোপীয় ঘাঁটি অঞ্চলটিকে রাশিয়া ও চীন থেকে রক্ষা করার ঘোষণা করতে হবে, নয়তো কেউ আপনাকে গুরুত্ব দেবে না। আর ৪০ জন সৈন্য কিছুই রক্ষা করতে পারে না।
রুশ যুদ্ধজাহাজ যদি গ্রিনল্যান্ডের আশপাশে ঘোরে, ইউক্রেন জানে কী করতে হয়—আমাদের সেই অভিজ্ঞতা ও অস্ত্র আছে। এর আগে যেমন ক্রিমিয়ার কাছে জাহাজ ডুবেছে, তেমনি গ্রিনল্যান্ডের কাছেও ডুবতে পারে। আমাদের কাছে মানুষ আছে, অস্ত্র আছে। ইউক্রেন যদি ন্যাটোতে থাকত এবং আমাদের বলা হতো তাহলে আমরা সমুদ্রে যুদ্ধ করতে পারতাম। কারণ আমরা সমুদ্রে যুদ্ধ করতে জানি। কিন্তু আমরা নেই। তবু আমরা রুশ জাহাজের সমস্যা সমাধান করব। ইরানের ক্ষেত্রেও সবাই আমেরিকার দিকে তাকিয়ে আছে, বিশ্ব কিছুই করছে না। ইউরোপও কিছু করছে না। যারা স্বাধীনতার জন্য লড়ছে, তাদের পাশে না দাঁড়ালে ফলাফল সবসময় নেতিবাচক হয়। ২০২০ সালে বেলারুশ তার উদাহরণ। কেউ তাদের সাহায্য করেনি, এখন সেখানে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন আছে, যা ইউরোপের রাজধানীগুলোর নাগালের মধ্যে। যদি বেলারুশের মানুষ জিতত, এটা হতো না।
রুশ তেলের বিষয়েও একই কথা। নিষেধাজ্ঞা আছে, দাম কমেছে, কিন্তু তেল সরবরাহ বন্ধ হয়নি। যুদ্ধের অর্থ জোগানো কোম্পানিগুলো চলছে। আরো নিষেধাজ্ঞা ছাড়া এটা বদলাবে না। ইউরোপকে আমেরিকার মতো সক্রিয় হতে হবে। কারণ কী? যদি ইউরোপকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে দেখা না হয়, তবে সে সবসময় দেরিতে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ইউরোপ ধ্বংস করতে চাওয়া শক্তিগুলো প্রতিদিনই কাজ করছে, এমনকি ইউরোপের ভেতরেও। যারা ইউরোপের টাকায় বাঁচে অথচ ইউরোপের স্বার্থ বিক্রি করে, তাদের মাথায় চড় মারাই প্রাপ্য।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার মূল পার্থক্য হলো রাশিয়া মানুষকে তুচ্ছ করে, আর ইউক্রেন মানুষকে মূল্য দেয়। রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয় কারণ তারা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের কোম্পানিগুলো থেকে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উপাদান পায়। তাইওয়ান নিয়ে সবাই স্থিতিশীলতা চায়, কিন্তু তাইওয়ানের কোম্পানিগুলো কি রাশিয়াকে ইলেকট্রনিকস দেয়া বন্ধ করবে? ইউরোপ কিছু বলে না, আমেরিকাও না, আর পুতিন ক্ষেপণাস্ত্র বানান। আমি ধন্যবাদ জানাই যারা ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা মেরামতে সাহায্য করছেন। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র কেনায় যারা সহায়তা করছেন। এ সহায়তা না পেলে রাশিয়ার অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করা সহজ হতো না?
গত বছর দূরপাল্লার অস্ত্র নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। এখন কেউ কথা বলে না। অথচ ক্ষেপণাস্ত্র কারখানার স্থানাঙ্ক আমাদের জানা। আজ তারা ইউক্রেন লক্ষ্য করে, কালই হতে পারে অন্য কোনো ন্যাটোর দেশ। ইউরোপে এত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব যে এক হওয়া যায় না। ফলে ইউরোপ সুন্দর কিন্তু খণ্ডিত ক্যালাইডোস্কোপ হয়ে থাকে। শক্তিশালী বা সক্রিয় না হয়ে শুধু প্রতিক্রিয়া জানায়। আমরা যেন গৌণ ভূমিকায় নেমে না যাই। আমরা এক হলে অজেয়। ইউরোপকে ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী শক্তি হতে হবে, দেরিতে প্রতিক্রিয়া জানানো শক্তি নয়। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে সবার উপকার হবে। যেখানে মানুষ ও জাতি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি ইউরোপের জীবনধারার জন্যও জরুরি।
আজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। যুদ্ধ শেষ করার নথি প্রায় প্রস্তুত। ইউক্রেন সততার সঙ্গে কাজ করছে। রাশিয়াকে এ যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে হবে। তাই চাপ আরো বাড়াতে হবে, ইউক্রেনকে সহায়তাও করতে হবে। ইউক্রেন শান্তি নিশ্চিতে সাহায্য করতে প্রস্তুত। আমরা এমন ইউরোপের অংশ হতে চাই, যা সত্যিকারের শক্তিশালী। আজ আমাদের সময়মতো কাজ করতে হবে। শুধু বিশ্বাস যথেষ্ট নয়। কাজ ছাড়া কোনো বিশ্ব ব্যবস্থা আসে না। এখন কাজ না করলে আগামীকাল থাকবে না। আমাদের এ ‘গ্রাউন্ডহগ ডে’ শেষ করতে হবে। এটা সম্ভব।
ভলোদিমির জেলেনস্কি: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট
[সুইজারল্যান্ডের দাভোসে আয়োজিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলন ২০২৬-এ প্রদত্ত বক্তব্যের সংক্ষেপিত ও সম্পাদিত রূপ]










