ডিএনএ অণুতে প্রত্যেক জাতি এমনকি প্রতিটি মানুষের নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের ছাপ বিদ্যমান। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা মানুষের প্রাচীন অভিপ্রায়ণ (মাইগ্রেশন) এবং বিবর্তনের চিত্র উদঘাটন করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ-: ১. বাঙালিদের ডিএনএতে দক্ষিণ এশীয় (৬০-৭০ শতাংশ), দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় (১৫-২০ শতাংশ) ও ইন্দো-আর্য (১০-১৫ শতাংশ) জনগোষ্ঠীর মিশ্রণ দেখা যায়। ২০১৮ সালের জিনোমিক স্টাডিজে বাংলার আদিবাসী জনগোষ্ঠী (যেমন সাঁওতাল) ও তিব্বত-বর্মি গোষ্ঠীর প্রভাবও শনাক্ত হয়েছে। কারণ নদীবিধৌত এ উর্বর ভূমিতে খাদ্যের সন্ধানে পৃথিবীর নানা অঞ্চল থেকে মানুষ এসেছে। ফলে বাঙালির ডিএনএতে উল্লিখিত এলাকার মানুষের জিনের সংমিশ্রণ ঘটেছে। তবে এ সংমিশ্রণের বৈচিত্র্য উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে অনেকটা কম, কারণ এরা বিবাহ সম্পর্ক বা যৌন সংযোগে অন্যান্য জাতি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে অনেকটা রক্ষণশীল। ফলে এখনো আমাদের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর ডিএনএতে তাদের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে এবং তা সমতল ভূমির মানুষের চেয়ে কম বৈচিত্র্যময়।

২. আফ্রিকান উৎস: মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ গবেষণা (যেমন মাইটোকন্ড্রিয়াল ইভ তত্ত্ব) প্রমাণ করে যে সব আধুনিক মানুষের উৎস প্রায় তিন লাখ বছর আগে আফ্রিকায়। মানুষসহ বেশির ভাগ প্রাণীর মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ প্রায় সম্পূর্ণরূপে মাতৃগতভাবে বংশানুক্রমে প্রাপ্ত হয়।

৩. নিয়ান্ডারথাল উত্তরাধিকার: ইউরোপীয় ও এশীয়দের ডিএনএতে ১-৪ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল জিন রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আধুনিক মানুষ প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালদের সঙ্গে সংকরায়ণ করেছিল। নিয়ান্ডারথাল হলো মানুষের একটি বিলুপ্ত প্রজাতি, যা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার বছর আগে বরফ যুগের ইউরোপে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, যাদের কপাল ঝুলে ছিল এবং ভ্রু উঁচু ছিল। সভান্তে প্যাবো জীবাশ্ম বংশাণুসমগ্র বিজ্ঞান ক্ষেত্রের একজন প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নিয়ান্ডারথাল বংশাণুসমগ্র (জিনোম) বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। তিনি নিয়ান্ডারথাল মানবের বংশাণুসমগ্রের অনুক্রম নির্ণয় করেছেন, যারা ছিল আধুনিক মানবের আদিপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কিত কিন্তু বর্তমানে বিলুপ্ত এক মানব প্রজাতি। এছাড়া তিনি সম্পূর্ণ অজানা এক ধরনের হোমিনিন আবিষ্কার করেন, যার নাম দেনিসোভা। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্যাবো দেখাতে সক্ষম হন যে আজ থেকে প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে এসব বিলুপ্ত হোমিনিনদের থেকে আধুনিক হোমো স্যাপিয়েন্স মানবদের কাছে বংশাণুর (ডিএনএ) হস্তান্তর হয়েছিল, যে সময় হোমো স্যাপিয়েন্স আফ্রিকা থেকে বিশ্বের অন্যত্র অভিবাসী হওয়া শুরু করেছিল। গবেষকরা দেখেছেন, কিছু নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ ধারকদের সিস্টেমিক লুপাস এরিথেমাটোসাস বা ক্রোন’স ডিজিজের মতো অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। ডিএনএ বা বংশাণুর এ সুপ্রাচীন প্রবাহ বর্তমান যুগের মানুষের শারীরবিদ্যায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি ঘটনা। ২০২২ সালে সভান্তে প্যাবো শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। প্যাবো জীবাশ্ম বংশাণুবিজ্ঞান (প্যালিওজেনেটিকস) ক্ষেত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত।

মানুষের জীবনযুদ্ধের সব রেকর্ড ডিএনএ অণুতে অভিযোজিত থাকে। ফলে ডিএনএ অণু পাঠোদ্ধারে আমরা কোনো অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প জানতে পারি। সুতরাং মানুষের ডিএনএ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার গল্প বলে। যেমন ১. তিব্বতিদের উচ্চতা অভিযোজন: EPAS1 জিনের একটি বিশেষ রূপ (হাপলোটাইপ) রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন বাড়িয়ে কম অক্সিজেনে বেঁচে থাকার ক্ষমতা দেয়। ২. ল্যাকটোজ সহনশীলতা: উত্তর ইউরোপে প্রাপ্তবয়স্কদের ৯০ শতাংশ ল্যাকটোজ হজম করতে পারে, যেখানে পূর্ব এশিয়ায় মাত্র ১০ শতাংশ পারে। এটি LCT জিনের মিউটেশনের ফল। ৩. ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ: আফ্রিকা ও এশিয়ায় HbS জিনের বিস্তার সিকল সেল অ্যানিমিয়ার মতো রোগ সৃষ্টি করলেও ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।

ডিএনএ শুধু জৈবিক ইতিহাসই ধরে না, এটি সংস্কৃতিরও বাহক। যেমন ১. দুধের বিবর্তন: উত্তর ইউরোপে LP (Lactase Persistence) জিনের বিস্তার ঘটেছে পাঁচ হাজার বছর আগে দুগ্ধজাত খাদ্যাভ্যাসের কারণে। ২. ধান চাষের প্রভাব: এশিয়ায় AMY1 জিনের বহুল উপস্থিতি (যা লালায় অ্যামাইলেজ উৎপাদন বাড়ায়) ধানভিত্তিক খাদ্যের সঙ্গে অভিযোজনের ফল। ৩. বাঙালিদের মাছ-ভাত সংস্কৃতি: FADS2 জিনের বিশেষ রূপ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বিপাককে ত্বরান্বিত করে, যা মাছভিত্তিক খাদ্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

ডিএনএ যেহেতু নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাসের ফুট প্রিন্ট ধারণ করে, ডিএনএ টেস্টিং তাই আত্মানুসন্ধানের নতুন দিক উন্মোচিত করেছে। ডিএনএ টেস্টিং তাই যেকোনো মানুষের নৃতাত্ত্বিক উৎস জানা, বিভিন্ন জেনেটিক রোগের যেমন ক্যান্সার বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি জানা এবং বিবাহের ক্ষেত্রে সন্তানের ভবিষ্যৎ জেনেটিক রোগের ঝুঁকি ইত্যাদি জানা এখন অনেক সহজ। আধুনিক বাণিজ্যিক ডিএনএ টেস্টিং (যেমন 23andMe, AncestryDNA) মানুষের জন্য তাদের নৃতাত্ত্বিক উৎস জানার পথ খুলে দিয়েছে। এ পরীক্ষাগুলো থেকে জানা যায়: ১. অ্যানসেস্ট্রি কম্পোজিশন: একজন বাঙালির ডিএনএতে সাধারণত ৫০-৭০ শতাংশ দক্ষিণ এশীয়, ১০-৩০ শতাংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় এবং ৫-১৫ শতাংশ ইন্দো-ইউরোপীয় উপাদান থাকে। ২. স্বাস্থ্যঝুঁকি: BRCA1/জিনের মিউটেশন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, যা দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে ১.৫ গুণ বেশি থাকে। ৩. প্রাচীন ডিএনএ: গড় বাঙালি ০.৫-১.৫ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ বহন করে। মানুষের ডিএনএতে নিয়ান্ডারথাল ডিএনএ সিকুয়েন্সের আধিক্য রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং স্নায়বিক বৈশিষ্ট্যের মতো রোগের বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রভাবিত করে। তবে এ ডিএনএ রোগ-বহির্ভূত ফেনোটাইপ যেমন ত্বকের বর্ণ, ত্বক ও চুল-সম্পর্কিত ফেনোটাইপ বা আচরণগত ফেনোটাইপগুলোকে প্রভাবিত করে বলে প্রমাণিত হয়েছে।

গবেষণার ব্যাপক অগ্রগতি একবিংশ শতাব্দীতে অনেক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। জিনোম এডিটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিএনএ অনুক্রমে পরিবর্তন করে বিজ্ঞানী ফসলের রোগ প্রতিরোধী, উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ, উচ্চফলনশীল এবং জলবায়ুর অভিঘাত সহনশীল জাত উদ্ভাবন করে খাদ্যনিরাপত্তায় বিস্ময়কর অবদান রাখছে। মানুষের সিকেল সেল এনিমিয়া এমনকি ক্যান্সার সমূলে বিনাশে জিনোম এটিডিং সফলভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। কভিড-১৯ রোগ প্রতিরোধে আবিষ্কৃত টিকা ছিল সিনথেটিক বায়োলজির অগ্রসরমাণ সংযোজন। ইচ্ছে অনুযায়ী ডিএনএ কোড পরিবর্তনের বিস্ময়কর ক্ষমতা নানা রকম ঝুঁকি ও নৈতিক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে। আমরা কি তাহলে ইচ্ছে অনুযায়ী সব বৈশিষ্ট্যের সংযোজনের মাধ্যমে ডিজাইনার বেবি উৎপাদনের দিকে অগ্রসর হব? ভ্রুণে জিন এডিটিংয়ের মাধ্যমে চীনা বিজ্ঞানী কর্তৃক নানা ও লুলু নামক দুজন টেস্টটিউব বেবি জন্মদানের পর সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা মানব ভ্রুণে জিনোম এডিটিং নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে রায় দিয়েছেন। মানুষ এখন মিরর লাইফ তৈরি করতে সক্ষম, যা বিজ্ঞানীরা না করতে সতর্ক করেছেন। সুতরাং নৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া দ্বারা জিনোম এডিটিং বা সিন্থেটিক বায়োলজির প্রয়োগের সীমা নির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। জেনেটিক ডিসক্রিমিনেশন: কর্মক্ষেত্রে বা বীমা কোম্পানিগুলো জেনেটিক ডেটা ব্যবহার করে বৈষম্য করতে পারে। ডেটা গোপনীয়তা: ২০১৯ সালে GEDmatch ডেটাবেস হ্যাকিংয়ে ১.২ মিলিয়ন ডিএনএ ডেটা লিক হয়েছিল।

আমরা সবাই জিনগত অভিবাসী। ডিএনএ প্রমাণ করে যে মানবজাতি এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা। বাঙালি, ইউরোপীয় বা আফ্রিকান—সবাই আমাদের ডিএনএতে বহন করি হাজার হাজার বছরের যাত্রার ইতিহাস। সেজন্য বিজ্ঞানী ড. স্পেন্সার ওয়েলস (জিনেটিক ইতিহাসবিদ) বলেন, “প্রতিটি মানুষের ডিএনএ এক অনন্য গ্রন্থ, যেখানে লেখা আছে অসংখ্য মানুষের গল্প, যারা কখনই লিখিত ইতিহাসে স্থান পায়নি।” ডিএনএর এ গল্প আমাদের শেখায় যে আমরা সবাই এক বৃহত্তর মানব পরিবারের অংশ, আমাদের পার্থক্যগুলো সুন্দর এবং আমাদের মিলনই সম্ভাবনার সূচনা।

এখন আলোচনা করা যাক, বাঙালিদের ডিএনএ কেন এবং কতটা অনন্য? বাঙালির ইতিহাস, ভৌগোলিক পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জিনগত বৈশিষ্ট্য তাদের বিশ্বের অন্যান্য জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাঙালির ডিএনএতে এক অসাধারণ মিশ্রণ রয়েছে, যা তাদের জিনগতভাবে অনন্য করে তুলেছে। বাঙালির ডিএনএ অনন্য হওয়ার কারণ এর দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় হাজার হাজার বছর ধরে এ অঞ্চল বিভিন্ন সভ্যতার মিলনস্থল ছিল। প্রাচীন দক্ষিণ এশীয় শিকারি-সংগ্রাহক, দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ধান চাষী, মধ্য এশীয় অভিবাসী, পূর্ব এশীয় জনগোষ্ঠী এবং পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া থেকে আসা মুসলিম বসতি স্থাপনকারী—প্রত্যেকেই বাঙালির জিনগত গঠনে তাদের ছাপ রেখে গেছেন। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাঙালির জিনগত প্রোফাইল দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ। এখানে প্রাচীন পূর্বপুরুষ দক্ষিণ ভারতীয় উপাদানের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় (অস্ট্রো-এশিয়াটিক) এবং পূর্ব এশীয় (তিব্বতি-বর্মি) প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যা অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর থেকে তাদের আলাদা করে। এছাড়া মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে আসা ইন্দো-আর্য এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর জিনগত উপাদানও বাঙালির ডিএনএতে মিশে আছে, যা এ অঞ্চলের মানুষের এক বহুস্তরীয় এবং গতিশীল জিনগত পরিচয়ের সাক্ষ্য বহন করে।

কেন বাঙালির ডিএনএ অন্যান্য জাতি গোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র তা কিছুটা সংক্ষেপে এখানে আলোচনা করা যাক। ১. নৃতাত্ত্বিক মিশ্রণের স্তর—বাংলা অঞ্চল হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মিলনস্থল হিসেবে কাজ করেছে: ক. প্রাচীন স্তর: অস্ট্রো-এশিয়াটিক (মুন্ডা ভাষাগোষ্ঠী, ~ ৪০০০ খ্রিস্টপূর্ব) । খ. মধ্য স্তর: দ্রাবিড় (তামিল/তেলুগু সম্পর্কিত, ~ ২০০০ খ্রিস্টপূর্ব)। গ. আধুনিক স্তর: ইন্দো-আর্য (সংস্কৃত/প্রাকৃত, ~ ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব), তুর্কি-মোঙ্গল (১২০০ খ্রিস্টাব্দ)। ২. জলবায়ুগত অভিযোজন: (ক) ARS-D জিন: কলেরা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে (বাংলাদেশে ২৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীতে বিদ্যমান)। খ. G6PD ডেফিসিয়েন্সি: ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সহায়ক (পশ্চিমবঙ্গে ৮-১৫ শতাংশ বিদ্যমান)। ৩. ভাষাগত বিবর্তনের প্রভাব: বাংলা ভাষার বিকাশ (ইন্দো-ইউরোপীয় + অস্ট্রো-এশিয়াটিক + তিব্বত-বর্মি উপাদান)

জিন-সংস্কৃতি সমবায়ের (Gene-Culture Coevolution) উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ৪. খাদ্যাভ্যাসের জিনেটিক প্রভাব: ক. ALDH2 জিন: ধানের ভাত থেকে ইথানল মেটাবলিজমের সঙ্গে সম্পর্কিত। খ. FTO জিন: স্থূলতা ঝুঁকি বাড়ায় (বাঙালিদের ৩২ শতাংশ এই রূপ বহন করে)। সুতরাং সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং লাইফস্টাইল মেনে না চললে বাঙালিদের অনেকেই সহজে মুটিয়ে যাবে। ৫. আধুনিক জিনোমিক গবেষণা: ২০২১ সালের Bangladesh Genome Study”-এ এক হাজার জনের ডিএনএ বিশ্লেষণে ১১টি অনন্য জেনেটিক ক্লাস্টার শনাক্ত হয়েছে, যা বিশ্বের অন্য কোথাও নেই। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন (১৭৫৭-১৯৪৭) বাংলা অঞ্চলে কেবল সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, জিনগত প্রবাহের দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বাঙালিদের জিনোমিক স্বাতন্ত্র্য আরো বিশদ জানার জন্য জাতীয়ভাবে একটি প্রকল্প প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা দেশে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং বাঙালির স্বকীয়তা বোঝার জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন।

বাঙালি জনগোষ্ঠীর জিনোম হলো একটি অনন্য মোজাইক, যা বিভিন্ন পূর্বপুরুষের উপাদানগুলোর নির্দিষ্ট মিশ্রণ পদ্ধতির দ্বারা চিহ্নিত। গবেষণা প্রায়ই নির্দিষ্ট ওয়াই-ক্রোমোজোম এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ হ্যাপলোগ্রুপগুলোর (যেমন: O, R1a, H, L, এবং M-এর নির্দিষ্ট সাবক্লেড) ফ্রিকোয়েন্সি এবং অটোজোমাল জিনগত বৈচিত্র্যগুলোর ওপর আলোকপাত করে, যা বাঙালির জিনগত পরিদৃশ্যকে আকারদানকারী গভীর ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়া এবং অভিবাসনকে উন্মোচন করেছে।

বাঙালিদের ডিএনএর অনন্যতা তাদের ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের ফলাফল। এ বৈচিত্র্যময় জিনগত মিশ্রণ বাঙালিদের শুধু শারীরিকভাবেই নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবেও বিশেষ করে তুলেছে। জিনগত পুনর্মিলন এবং বৈচিত্র্যের কারণে বাঙালিরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং পরিবেশের প্রতি অত্যন্ত সহনশীল (resilient)। ভবিষ্যতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর জিনগত উত্তরাধিকার ইতিহাস, অভিবাসন, অভিযোজন ও আধুনিক প্রযুক্তির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে আরো তথ্যাবলি গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হতে থাকবে। জনসংখ্যায় সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য একটি মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে রয়ে যাবে, তবে নতুন প্রভাবের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি জিনতত্ত্ব সম্পর্কে জানার এবং এর ভবিষ্যৎ গঠনের নতুন সুযোগও তৈরি হবে। অতীতের গভীর জিনগত সংযোগ জানা থেকে শুরু করে বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিশ্বায়িত বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া পর্যন্ত, বাঙালি জনগোষ্ঠীর জিনগত যাত্রা ধ্রুবক বিবর্তন এবং গতিশীল অভিযোজনের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে স্থান পাবে।

ড. তোফাজ্জল ইসলাম: ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি, অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই), গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়