বাংলাদেশে স্থানীয় মুদ্রায় বন্ডের ব্যবহার সম্প্রসারণ বৈদেশিক পুঁজি আকর্ষণের একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। পাশাপাশি এটি বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব থেকেও অর্থনীতিকে সুরক্ষা দিতে সহায়ক।
দুই দশকের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বৈদেশিক ঋণের ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। এ সময়ে দেশটি প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে, যার প্রায় সবই বৈদেশিক মুদ্রায়।
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ১০৪ বিলিয়ন ডলার। এ ঋণের পাঁচ ভাগের চার ভাগই সরকারি খাতের ও বাকি অংশ বেসরকারি খাতের। ২০২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এর মধ্যে সুদ বাবদই পরিশোধ করতে হবে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ জিডিপির ২৩ শতাংশ। স্বল্পসুদে প্রাপ্ত ঋণ ও বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতার কারণে এ ঋণ এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। তবে উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে দেশটির প্রতি বছর অতিরিক্ত কয়েক হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, রফতানি প্রবৃদ্ধির স্থবিরতা ও সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বাংলাদেশ। এসব সীমাবদ্ধতা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে মন্থর করতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রাসংশ্লিষ্ট ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ দেশের সঞ্চয়-জিডিপি অনুপাত ছিল ২৪ শতাংশ, যা দেশীয় বিনিয়োগ অর্থায়নের সীমিত সক্ষমতার প্রতিফলন।
দেশটির বৈদেশিক ঋণ আসে মূলত বহুপক্ষীয় উৎস থেকে, যেখানে সাধারণত স্বল্পসুদে ও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুবিধা থাকে। এসব ঋণ পরিশোধ করা হয় প্রকল্পের আয় ও সরকারি রাজস্ব থেকে। তবে এ দুটি উৎসই বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি প্রশমনে যথেষ্ট নয়। যখন সরকার বৈদেশিক তহবিল থেকে স্থানীয় মুদ্রায় দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে দেশীয় খাতে ঋণ হিসেবে প্রদান করে, তখন এ ঝুঁকি আরো বেড়ে যায়।
আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করা পুঁজি আহরণের একটি পরীক্ষিত উপায়। এ ধরনের বন্ডে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি ঋণগ্রহীতার পরিবর্তে বিনিয়োগকারীর ওপর বর্তায়। ফলে সরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাত বৈদেশিক মুদ্রার ওঠানামার প্রত্যক্ষ ঝুঁকি প্রশমনের মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে প্রবেশ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড ইস্যুর আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক বাজার নীতি গড়ে তোলার শর্ত আরোপ করে। স্থানীয় মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বন্ড সফলভাবে ইস্যু করতে পারা একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি আস্থার প্রতীক। এ ধরনের বন্ড বৈদেশিক ঝুঁকি হ্রাসে সহায়তা করে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ ও বিনিয়োগ বৈচিত্র্যায়ণের মাধ্যমে দেশীয় ও বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের মধ্যে সংযোগ জোরদার করে।
এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করার ফলে স্থানীয় বন্ডবাজারে বিদেশীদের অংশগ্রহণের জন্য উপযুক্ত আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে ওঠে। এর মাধ্যমে দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা স্থানান্তর হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বন্ড ইস্যুর চর্চা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। কার্যকর ইল্ড কার্ভ ও লিকুইড বেঞ্চমার্ক তৈরির মাধ্যমে এসব উদ্যোগ দেশীয় আর্থিক বাজারের পরিপক্বতাও বৃদ্ধি করে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এ ধরনের অর্থায়নের সঙ্গে গুরুতর ঝুঁকি জড়িয়ে রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে টাকা ডলারের বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়েছে। দেশের বৈদেশিক ঋণের বোঝা আনুমানিক ৪০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতায় চাপ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি দেশের সার্বভৌম ঋণমান (sovereign credit rating) অবনমনের পেছনেও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে ওঠানামা-সংক্রান্ত সমস্যাই বড় ভূমিকা রেখেছে। এ কারণে প্রচলিত অর্থায়নের উৎসগুলোয় প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়েছে এবং ঋণের ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৈদেশিক ঋণে অতিরিক্ত নির্ভরতা বহু অর্থনীতিকেই গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছে। অর্থনৈতিক ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন-পরবর্তী ঋণ সংকট অর্থনীতিতে ভয়াবহ ক্ষত সৃষ্টি করেছে। উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৯৭ সালের এশীয় অর্থনৈতিক সংকট, ২০০১ সালের তুর্কি লিরা সংকট, ২০০৮ সালের আইসল্যান্ডের ক্রোনা সংকট, ২০১৮ সালের ভেনিজুয়েলার বলিভার অতিমুদ্রাস্ফীতি, ২০১৮ সালের দ্বিতীয় তুর্কি লিরা সংকট এবং ২০২২ সালের শ্রীলংকার রুপি সংকট।
উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড ইস্যু করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। ইস্যুকারী সংস্থাগুলোকে বিদেশী বাজারে প্রবেশের আগে দেশীয় বাজারে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কর্মক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) প্রথম ‘মহারাজা বন্ড’ ইস্যু করে রুপিতে মূল্যায়িত বন্ডের সূচনা করে। এরপর ২০১৪ সালে তারা অফশোর মাসালা বন্ড ইস্যু করে। এরপর থেকে ভারতের অফশোর মাসালা বন্ড ইস্যুর পরিমাণ আনুমানিক ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
সাধারণত উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা ও সরকারই স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক বন্ডের দেশীয় বাজারে (অনশোর মার্কেট) একটি বিশ্বাসযোগ্য রেকর্ড তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাত এতে অংশ নেয়। তবে সরকারি সহায়তা ছাড়া এ পরিবর্তন কঠিন। তাই বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে সরকারের প্রাথমিক উদ্যোগ অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ২০১৯ সালে ইতিহাস সৃষ্টি করে, যখন আইএফসি প্রথম টাকায় মূল্যায়িত অফশোর বন্ড, ‘বাংলা বন্ড’ ইস্যু করে। তবে এরপর থেকে আর কোনো বন্ড ইস্যু করা হয়নি। প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠাগুলোর উদ্যোগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
এ ধারাবাহিক ইস্যুর অভাব দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে সতর্কতা ও বিনিয়োগ শাসন ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ এখনো এশিয়ার কয়েকটি প্রধান উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে একটি, যার আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো সক্রিয় স্থানীয় মুদ্রা মূল্যের বন্ড নেই।
উদীয়মান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য বৈদেশিক ঋণ অত্যাবশ্যক। তবে ধীরে ধীরে স্থানীয় মুদ্রায় বন্ড ইস্যু বাড়িয়ে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা গড়ে তুলে বৈদেশিক ঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত ঝুঁকি প্রশমিত করা যেতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় সরকার ও উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার মধ্যে ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
যদিও এ ধরনের বন্ড মুদ্রা-সংক্রান্ত ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না। তবে নিয়মিত ইস্যু একটি শক্তিশালী ট্র্যাক রেকর্ড তৈরি করে, যা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে ও দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়। লাখো কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত উদীয়মান অর্থনীতির অফশোর বন্ডের মোট পরিমাণের ১০-১৫ শতাংশের বেশি গ্রহণ করেন না। তাই এ বিষয়কে ‘সব নয়তো কিছুই নয়’—এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়।
উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দেশীয় প্রকল্পগুলোর জন্য কার্যকরভাবে তহবিল সংগ্রহ ও হেজিং খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে স্থানীয় মুদ্রায় মূল্য নির্ধারিত বন্ড ইস্যু করে।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণে এখনই অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি উৎস সীমিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীর আস্থা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে টাকাভিত্তিক অর্থায়ন একটি বিচক্ষণ কৌশল। এ ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশের জন্য একটি নিরাপদ, বাস্তবসম্মত ও টেকসই উন্নয়ন পথ নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
বিদ্যুৎ কুমার সাহা: লিড ইনভেস্টমেন্ট অফিসার, এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) বাংলাদেশ রেসিডেন্ট মিশন
লেই ওয়াং: অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেজারার, ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)
মনোহরি গুনাবর্ধনে: ফাইন্যান্স সেক্টর অফিসের সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টর স্পেশালিস্ট, সেক্টরস ডিপার্টমেন্ট, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)









