স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, যা চালিত হচ্ছে অটোমেশন, রোবোটিকস, ডাটা অ্যানালিটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে, যেটি এরই মধ্যেই জার্মানি, চীন, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পে আমূল পরিবর্তন এনেছে। এ প্রযুক্তিতে আইওটি কাজ করছে চোখ ও কান হিসেবে আর এআই কাজ করছে মস্তিষ্ক হিসেবে। একসঙ্গে তারা শিল্পকে করছে স্মার্ট, নিরাপদ ও উৎপাদনশীল। দেরিতে হলেও এ পরিবর্তনকে বাংলাদেশের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই, যদি দেশটি রফতানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে ও গ্লোবাল ভ্যালু চেইন আরো উচ্চস্তরে পৌঁছতে চায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি মূলত শ্রমনির্ভর। তৈরি পোশাক, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া ও মৌলিক উৎপাদন এ দেশের শিল্পের প্রধান অঙ্গ। অদ্যাবধি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও এসেছে রফতানিমুখী শিল্প, অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভর করে। তৈরি পোশাক একাই রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি আয় দেয়। তবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর এ মডেল আর কার্যকর নয়। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও পূর্ব এশিয়ার ক্রেতারা এখন দ্রুত সরবরাহ, নিখুঁত মান, সম্পূর্ণ শনাক্তকরণযোগ্যতা ও প্রমাণযোগ্য টেকসই উৎপাদন চায়। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ডিজাইন ও স্মার্ট সাপ্লাই চেইনের উন্নয়ন এখন শুধু দামের ওপর নয়, বরং দ্রুততা, নির্ভরযোগ্যতা এবং পরিবেশগত ও সামাজিক মানদণ্ড পূরণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে শুধুই শ্রম খরচের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রযুক্তি গ্রহণ করছে এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো অর্ডার সরিয়ে নিচ্ছে তাদের দিকে, যারা নতুন শর্ত পূরণ করতে পারছে।

তবে এটাকে হতাশার যুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এখনো টিকে থাকতে এবং এগিয়ে যেতে পারে, যদি আমরা আত্মতুষ্টি নয়, পরিবর্তন বেছে নিই। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। কারখানা, ক্রেতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে প্রযুক্তি, দক্ষতা, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যবস্থায় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য। স্বল্পমূল্যের শ্রম আমাদের শক্তি হলেও সম্পূর্ণভাবে শ্রমিকের পরিবর্তে রোবট ব্যবহার স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক বা সামাজিকভাবে সম্ভব নয়। বরং সহায়ক রোবট এবং নির্দিষ্ট কাজের জন্য স্মার্ট যন্ত্রপাতি, যেমন স্বয়ংক্রিয় কাটিং, ডিজিটাল সেলাই সহায়ক, এআই-নির্ভর মান নিয়ন্ত্রণ; শ্রমিকদের বাদ না দিয়েই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশকে তৈরি পোশাক খাত সচল রেখেই উচ্চ মূল্যের উৎপাদন ও ডিজিটাল সেবার দিকে বৈচিত্র্য আনতে হবে। লক্ষ্য হবে দুটি: ক. একক রফতানির ওপর অতিনির্ভরতা কমানো, খ. প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য ও সেবার মাধ্যমে বেশি মুনাফা এবং স্থিতিশীলতা অর্জন।

বিশ্বব্যাপী ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ এবং স্মার্ট ফ্যাক্টরির প্রসার দেখিয়ে দিচ্ছে শুধু খরচ কমানো আর বাজার ধরে রাখা প্রতিযোগিতার নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে এমন নতুন খাত চিহ্নিত করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও উদ্ভাবন আমাদের বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে। ফার্মাসিউটিক্যালস, আইসিটি, কৃষি-প্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা ও সবুজ উৎপাদন রফতানিকে বৈচিত্র্যময় করার পাশাপাশি স্থিতিশীল অর্থনীতি গড়তে সহায়ক হতে পারে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বাংলাদেশের জন্য এমন এক মোড় পরিবর্তনের সুযোগ এনে দিতে পারে, যা পোশাকনির্ভর প্রবৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।

ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে ব্লকচেইন ও ডিজিটাল ট্যাগিং (RFID/QR কোড) পুরো পণ্যের পথ অনুসরণযোগ্যতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে ১৫০টিরও বেশি দেশে জেনেরিক ওষুধ রফতানি করছে। রোবোটিক প্যাকেজিং, এআই-নির্ভর আরঅ্যান্ডডি ও সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে উচ্চ মূল্যের বাজার যেমন বায়োসিমিলার, ভ্যাকসিন ও মেডিকেল যন্ত্রপাতিতে প্রবেশের গতি বাড়ানো সম্ভব।

কৃষিতে স্মার্ট ফুড প্রসেসিং ও কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস কৃষকের আয় বাড়ায়। সেন্সরভিত্তিক মান বাছাই, আইওটি সক্ষম কোল্ড স্টোরেজ ও স্বয়ংক্রিয় প্যাকেজিং ব্যবহার করলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মান ধারাবাহিক থাকে। স্মার্ট প্যাকেজিং ও ব্লকচেইন শনাক্তকরণ বাংলাদেশকে বৈশ্বিক হালাল এবং জৈব খাদ্যবাজারে শক্ত অবস্থান দেবে।

লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে খুচরা যন্ত্রাংশে থ্রিডি প্রিন্টিং ও স্মার্ট প্রোটোটাইপিং ব্যবহার করা যেতে পারে। দেশের ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিকস বাজার (টিভি, ফ্রিজ, মোবাইল) রফতানিমুখী উৎপাদনের জন্য ভিত্তি তৈরি করছে। স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অটোমোবাইল ও যন্ত্রপাতি শিল্পের জন্য সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান নিতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় কোম্পানিগুলো ভোক্তা ইলেকট্রনিকস, মডুলার অটোমেশন, আইওটি ডিভাইস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপকরণ উৎপাদনে আঞ্চলিক বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব প্রযুক্তি শক্তি-সংবেদনশীল ও সবুজ প্রতিযোগিতা ক্রেতার জন্য একটি বড় ফিল্টার। নবায়নযোগ্য শক্তি ও সৌরশক্তিতে সম্প্রতি নীতিগত পদক্ষেপ বাংলাদেশের বাজার প্রবেশ সহজ করবে। এছাড়া সার্কুলার-ইকোনমি উৎপাদন (শিল্প/নগর বর্জ্যকে কাঁচামালে রূপান্তর) আমদানিনির্ভরতা কমাবে এবং পরিবেশগত সুবিধা দেবে।

বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় কারখানার জন্য প্রস্তুত নয়। তবে ‘‌হাইব্রিড’ স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং: নির্বাচিত অটোমেশন, ডিজিটাল সংযোজন, টেকসই উৎপাদন এবং ট্রেসেবল সাপ্লাই চেইনে আমরা ভালো অবস্থানে আছি। শ্রমিকদের চাকরি রক্ষা করে বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে মানানসই উৎপাদন করা সম্ভব।

অটোমেশনে উচ্চ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (এসএমই) পক্ষে সহজ নয়। দক্ষতারও ঘাটতি রয়েছে, কারণ শ্রমিকরা এখনো প্রথাগত উৎপাদনে অভ্যস্ত। তাই জরুরি হলো আপস্কিলিং ও রিস্কিলিং প্রশিক্ষণ এবং এসএমই খাতে প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেয়া।

বাংলাদেশ দেরিতে শুরু করলেও এটি হতে পারে বড় সুযোগ। অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরাসরি মডুলার, খরচ সাশ্রয়ী স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং গ্রহণ করা সম্ভব। সঠিক নীতি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ থাকলে স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।

এমএম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও অধ্যাপক (অব.)

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়