সর্ব অর্থেই ঢাকা শহর আর ‘ঢাকা’ নেই, ঢাকা শহর ‘খুলে গেছে’। ঢাকায় ঢুকেছে বিশ্বের নামজাদা বিপণি কেন্দ্রগুলো, বিবিধ পণ্যসামগ্রী, জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্যগুলো। ঢাকায় এখন পাওয়া যাচ্ছে বিশ্বের নানা দেশের খাবার-দাবার। বহুতল হর্ম্যরাজিগুলো ঢাকার আকাশকে ঢেকে দিয়েছে। ঢাকায় প্রতিদিন লোক বাড়ছে ২ হাজার ১০০ করে, যার একটা বড় অংশ দেশের নানা অঞ্চল থেকে আসছে। এত জনসমাগমে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ঢাকার আকাশ, মাঠ-ঘাট, নদী-জলাশয়-মুক্তস্থান আর মুক্তজল।
১৯৭১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১৮ লাখ, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ। ২৫ বছর আগে ২০০০ সালে ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ। ঢাকা তখন জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের নবম বৃহত্তম নগরী। ২০২৫ সালে ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬৬ লাখে। জাকার্তার পরই ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। জাতিসংঘের হিসাব মতে, আগামী ২৫ বছরে বিশ্বের দুটো নগরীর লোকসংখ্যা বছরে ৫ শতাংশ বাড়বে। তার একটি সাংহাই, অন্যটি ঢাকা। ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ ঢাকার লোকসংখ্যা হবে ৫ কোটি ২১ লাখ—জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের ১ নম্বর শহর।
ভাবনাটি আমাকে ভয়ার্ত করে। এমন হারে চলতে থাকলে ঢাকা শহরে মানুষ গায়ে গায়ে লেগে যাবে, দাঁড়ানোর জায়গাও পাওয়া যাবে না। ৫৫ বছর আগেও ১৮ লাখ মানুষ নিয়ে ঢাকা ছিল নিতান্তই একটি প্রাদেশিক রাজধানী। তার আয়তন, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সবই ছিল একটি প্রাদেশিক রাজধানীর মতো। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ঢাকা একটি দেশের রাজধানী হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ বিভিন্ন দিক থেকে ঢাকার গুরুত্ব বেড়ে যায় এবং ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই দেশের রাজধানীতে লোকসংখ্যা বাড়তে থাকে ওই রাজধানীর সম্প্রসারিত প্রয়োজনে এবং সে প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোক আসতে থাকে বর্ধিতভাবে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণেও ঢাকায় দলে দলে লোক আসতে থাকে।
ঐতিহাসিক দিক থেকে ঢাকায় জনসংখ্যা বেড়েছে দুটো প্রধান কারণে—তার একটি বিকর্ষণীয় শক্তি, অন্যটি আকর্ষণীয় শক্তি। বিকর্ষণীয় শক্তির মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি এবং কর্মনিয়োজনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক একটি স্থবিরতা। কয়েক দশক ধরে কৃষিতে যে গতিময়তা সৃষ্টির কথা ছিল, তা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে নীতিমালায় ও সম্পদবণ্টনে কৃষিতে যে অগ্রাধিকার দেয়া দরকার ছিল তা ঘটেনি। এ অবস্থায় বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকায় চলে আসা ভিন্ন কোনো বিকল্প ছিল না।
দ্বিতীয়ত, সময়ের পথ ধরে বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে বটে, কিন্তু অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে হয়নি। ফলে শিল্পায়নসহ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং সেই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সুমানসম্পন্ন সামাজিক অবকাঠামোর বিস্তার কেন্দ্রীভূত হয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো বড় বড় নগরীতে। ফলে দেশের জেলা ও উপজেলা শহরগুলো উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারেনি। সাধারণ মানুষ তাই কাজের খোঁজে ঢাকা শহরে চলে এসেছে এ বিশ্বাসে যে নগরীতে কোনো না কোনো কাজ জুটে যাবে এবং এখানে না খেয়ে মরতে হবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় আয়ে ঢাকার অবদান ২০ শতাংশ, আনুষ্ঠানিক কর্মনিয়োজনের ৪০ শতাংশ ঢাকাতেই। সেই সঙ্গে যেহেতু রাজধানী ঢাকা ক্ষমতা এবং সুমানসম্পন্ন সামাজিক সেবার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, সে কারণে প্রশাসনিক আমলারাও জেলা শহরে থাকতে চাননি, সবার লক্ষ্য ঢাকা।
তৃতীয়ত, নানা দুর্যোগের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হয়েছে। এ সবের মধ্যে রয়েছে বন্যা ও প্লাবন, ঘূর্ণিঝড়, নদীর ভাঙন ইত্যাদি। বিভিন্ন জনপদের দুস্থ, প্রান্তিক মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ঢাকামুখী হয়েছে। এ প্রক্রিয়া আমরা উত্তরবঙ্গের দুর্ভিক্ষ বা ‘মঙ্গা’র সময়ও দেখেছি।
রাজধানী ঢাকার জৌলুস ও এ শহরের চাকচিক্যও ক্রমাগতভাবে মানুষকে, বিশেষত তরুণ সমাজকে ঢাকার প্রতি আকর্ষিত করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবেই তরুণ সমাজ ঢাকাকে দেখে। শহরটির নানা সুযোগ, বিশেষত উচ্চশিক্ষার, এর সংস্কৃতি, শহরটির আধুনিকতা তরুণদের জন্য বড় একটি আকর্ষণ। সেই সঙ্গে যেসব তরুণ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ঢুকতে চান, কিংবা বিদেশযাত্রায় আগ্রহী, তারাও ঢাকায় আগমনকে একটি আবশ্যকীয় শর্ত বলে মনে করেন।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি আর গ্রামীণ মানুষকে ধরে রাখতে পারছে না। তারা আর কৃষিকাজে কিংবা কুটির শিল্পে আগ্রহী নয়। তারা ঢাকা শহরের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে চায়। সেই সঙ্গে সৃজনশীল তরুণদের জন্য যে সুযোগ নাগরিক অর্থনীতি দিতে পারে, তা গ্রামীণ অর্থনীতিতে লভ্য নয়। সেই সঙ্গে উদ্যোক্তা হতে গেলে ঋণ এবং প্রশিক্ষণসহ যে জাতীয় উপকরণ সুবিধা ঢাকার অর্থনীতি একজন উদ্যোক্তাকে দিতে পারে, গ্রামের অর্থনীতি সেটা পারে না।
তৃতীয়ত, গ্রামের মেয়েদের জন্য ঢাকাকেন্দ্রিক পোশাক শিল্পে কর্মনিয়োজন একটি বিরাট সুযোগ। রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের ৮০ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে। বহু গ্রামীণ নারী সে সুযোগ গ্রহণের জন্য ঢাকায় চলে আসেন। তেমনিভাবে শহরের গৃহসেবা খাতে কাজ কারার জন্যও পল্লী থেকে ঢাকা নগরীতে মহিলাদের আগমন ঘটে।
কয়েক দশক ধরে দলে দলে মানুষ নানাভাবে ঢাকা শহরে স্থান করে নিচ্ছে, কিন্তু কত বড় আমাদের এ ঢাকা নগরী? ঢাকা মহানগরের আয়তন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার। সেই হিসাবে এটি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের মাত্র ১ শতাংশ, কিন্তু দেশের ২০ শতাংশ মানুষ ঢাকায় বাস করে। আয়তনের দিক থেকে ঢাকা মহানগরী সাংহাইয়ের ৬ ভাগের ১ ভাগ, কায়রোর ৩ ভাগের ১ ভাগ এবং টোকিওর অর্ধেক। ঢাকা মহানগরের ১ বর্গকিলোমিটার জায়গায় প্রায় ২৪ হাজার লোক বাস করে।
এটা উল্লেখ্য, গত কয়েক দশকে আয়তন ও লোকসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা নগর বিস্তৃত হয়েছে বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে নানা সমস্যার প্রসারণও উল্লেখযোগ্য। প্রথমেই যে জিনিসটি চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে ঢাকা নগরীতে কোনো নগর পরিকল্পনার ছাপ নেই। এ নগরী বেড়ে উঠেছে পরিকল্পনাহীনভাবে—অগোছালো পদ্ধতিতে। ভবিষ্যৎকে মাথায় রেখে কোনো দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা সেখানে চোখে পড়ে না। আবাসন বেড়েছে খেয়াল-খুশিতে, সেইভাবেই অপরিকল্পিতভাবে বিস্তৃত হয়েছে রাস্তা ও সড়ক, ফুটপাত থেকেও নেই, পরিবহনে রয়েছে দুর্ভোগ। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসের পরিষেবার গুণগত মান নীচু স্তরের। সবুজ ও জল পরিবেশের বড় আকাল। শব্দ ও বায়ুদূষণে অস্থির ঢাকাবাসী। এ শহরের বড় বড় সড়কে বাজার-হাট বসে জমিয়ে। ঢাকা শহরের আকার বেড়েছে, কিন্তু মান বাড়েনি।
ঢাকা শহর বহুল পরিমাণে ঘিঞ্জি। নগরীতে বর্জ্য ছড়িয়ে থাকে। বছরজুড়ে নির্মাণকাজ আর ধুলা। শহরটা বড়ই মলিন। যানজটের কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বিশাল ভোগান্তি। অল্প বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়, পথ-ঘাট তলিয়ে যায়। এ শহরের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো নয়। বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ১৭৩টি দেশের মধ্যে ঢাকার স্থান ১৭১। বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ঢাকার অবস্থান তালিকার শীর্ষে।
অনেকেই বলছেন যে ঢাকা এখন বস্তির শহর হয়ে উঠেছে। বলা হয়ে থাকে যে ঢাকা শহরে বস্তির সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। ঢাকা শহরের কোনো কোনো বস্তি অত্যন্ত জনবহুল। কোনো কোনো বস্তিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় সোয়া দুই লাখ মানুষ বাস করে। এসব বস্তিতে বাল্যবিবাহ বেশি, শিশু-অপুষ্টি বেশি, অপরাধ বেশি।
একটি আধুনিক মহানগরীর বাসযোগ্যতার কতগুলো কাঙ্ক্ষিত নির্ণায়ক আছে: অর্থবহ জীবিকার সুযোগ, নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জীবন, পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সেবা ও সুযোগ-সুবিধার লভ্যতা, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা, সুআবাসন এবং সুপরিবহনের আর্থিক সক্ষমতা, আকর্ষণীয় ও পর্যাপ্ত জনপরিসর, স্বাস্থ্যকর প্রাকৃতিক পরিবেশ, আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, জনঅংশগ্রহণের সুযোগ। ঢাকা নগরীতে এগুলো নিশ্চিত করতে পারলেই ঢাকা আমাদের জন্য অশনিসংকেত বয়ে আনবে না।
আশির দশকে টেলিভিশনের একটি ধারাবাহিক নাটকের নাম ছিল ‘ঢাকায় থাকি’। আমরা ঢাকাতেই থাকতে চাই ভালোমতো, সুন্দর করে, আনন্দে। ঢাকা আমাদের জন্য ঢাকাই থাকুক।
সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র










