দেশে প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তরগুলো। একাডেমিক ও প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালনকারী অধিদপ্তরগুলো নানা অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত, যার মধ্যে অন্যতম অধিদপ্তরপ্রধানকে ঘন ঘন পরিবর্তন। শিক্ষা অধিদপ্তরগুলোর শীর্ষপদ হলো মহাপরিচালকের (ডিজি) পদ। বণিক বার্তার প্রতিবেদন বলছে, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রাথমিক থেকে শুরু করে, কারিগরি, মাদ্রাসা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব অধিদপ্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত অধিকাংশ মহাপরিচালকের দায়িত্বের মেয়াদ ছিল কমবেশি এক বছর। অনেকেই আবার পালন করেছেন মহাপরিচালক হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব। কেবল গত এক বছরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরেই পর পর চারজন মহাপরিচালক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, যা বেশ উদ্বেগজনক। ২০১৯ সাল থেকে এ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন সাতজন। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে গত সাত বছরে নয়বার ডিজি পরিবর্তন হয়েছে। মাউশি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরেও একই চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে।

এভাবে বারবার নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা যেমন নেয়া যায়নি, তেমনি স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা খাতের পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য টেকসই নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে যে ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন সেটি নিশ্চিত করা যায়নি। একই সঙ্গে অধিদপ্তরগুলোয় কিছু অভ্যন্তরীণ জটিলতা তৈরি হয়েছে। কর্মপরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনায় ব্যাঘাত ঘটেছে। নতুন নিয়োগপ্রাপ্তরা অনেক সময়ই আগের নেয়া নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে ভিন্নমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন কিংবা অন্য কর্মকর্তারা মহাপরিচালকের কাজকে প্রভাবিত করার প্রয়াস চালিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ এসব বিশৃঙ্খলার বিরূপ প্রভাব পড়েছে শিক্ষা খাতে।

শিক্ষা অধিদপ্তরগুলোয় এ অবস্থা চলমান থাকলে সেটি ভবিষ্যতে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। একজন ডিজি যদি পর্যাপ্ত সময় না পান তাহলে তার পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি কোনো নীতি নেয়া কখনই সম্ভব হবে না বা নিলেও সেটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ। আবার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বা চাকরির শেষ পর্যায়ে নিযুক্ত মহাপরিচালকরা অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারার অভিযোগ রয়েছে। এতে তারা চাইলেও অনেক সময় ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য কোনো নীতি-কৌশল নিতে পারেন না। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে মহাপরিচালক নিয়োগ থেকে তার মেয়াদের বিষয়গুলো নিয়ে আরো পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করতে সরকারকে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ এবং অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অনেকেই মনে করেন যে মহাপরিচালক নিয়োগের সঙ্গে নির্দিষ্ট মেয়াদও বেঁধে দেয়া প্রয়োজন, যাতে তিনি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সুযোগ পান। আবার অনেককে চাকরিজীবনের শেষদিকে মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ফলে অবসরজনিত কারণেও খুব বেশিদিন মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি অনেকে। এমন পরিস্থিতি এড়াতেও মহাপরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরির মোট বয়সের বিষয়টিকেও প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক। তাহলে নির্দিষ্ট মেয়াদ বেঁধে দেয়ার বিষয়টির কার্যকর হবে।

নির্দিষ্ট মেয়াদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অবশ্য একটি বড় আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তাদের ভাষ্য, মেয়াদ বেশি বাড়ানো হলে তা অপব্যবহারের সুযোগও রয়েছে। তাই কোনো মহাপরিচালক যেন দীর্ঘমেয়াদের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা করতে না পারেন সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো সেখান থেকে নতুন সমস্যার উদ্ভব হবে। তবে মহাপরিচালক নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়েও ভাবনার অবকাশ রয়ে গেছে। তাছাড়া এক্ষেত্রে নানা অভিযোগও রয়েছে।

দেখা গেছে যে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কেউ নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের কার্যক্রম অপেক্ষাকৃত বেশি ফলপ্রসূ হয়েছে। অন্যদিকে যে অধিদপ্তরের দায়িত্বে প্রশাসন থেকে সরাসরি নিয়োগ দেয়া হয়েছে, সেখানে কার্যকর উদ্যোগ কম দেখা গেছে। উল্লেখ্য, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ক্যাডার সার্ভিস ও মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে উন্নীত হওয়ার সুযোগ নেই। এটি এ অধিদপ্তরে দক্ষ মহাপরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মাঠ পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মহাপরিচালক নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। আর যোগ্য নেতৃত্ব বাছাই করার একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রক্রিয়াও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এছাড়া দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মহাপরিচালকদের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা প্রশাসনিক চাপ বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

সর্বোপরি, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত জাতি গঠনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ স্তরের শিক্ষার ভিত মজবুত না হলে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হবে। আর এটিকে দৃঢ় করতে প্রয়োজন যোগ্য নেতত্ব এবং অধিদপ্তরগুলোর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। নেতৃত্ব ঘিরে অনিশ্চয়তা, খণ্ডকালীন নীতি, কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে পরিচালিত অধিদপ্তরের মাধ্যমে শিক্ষায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কখনই সম্ভব হবে না। কাজেই শিক্ষা প্রশাসনের নেতৃত্বে স্থিতিশীলতা, দক্ষতা ও দূরদৃষ্টির ভিত্তিতে একটি স্থায়ী ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। নয়তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ ধরনের অস্থিতিশীলতার ভুক্তভোগী হবে।

সরকারকে শিক্ষা অধিদপ্তর-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে মনোযোগী হতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা খাতে নানামুখী সমস্যা বিরাজমান। সেসব সমস্যার অনেক কিছুর পেছনে শিক্ষা অধিদপ্তরের ভুল বা পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্তের দায়ও রয়েছে। ঘন ঘন কেবল ডিজি নয়, পরিবর্তন করা হয়েছে পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি। উপরন্তু চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এসব সমস্যা আরো ঘনীভূত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা খাতে এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা গভীর ক্ষত তৈরি করবে আগামীতে। মৌলিক শিক্ষার ভিত হিসেবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের শিক্ষা ব্যবস্থাকে তাই স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে হবে, যার শুরুটা হতে পারে শিক্ষা অধিদপ্তরগুলোয় কাঠামোগত পরিবর্তন আনয়নের মাধ্যমে।