সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের অর্থনীতিতে ডলার ঘাটতি, ক্রমাগত রিজার্ভ ক্ষয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ নানামুখী সংকট দেখা দেয়। এসব সংকট মোকাবেলার কৌশল হিসেবে সরকার কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ করে। এর ধারাবাহিকতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করার সিদ্ধান্ত হয়। কেননা প্রতি বছর বাজেট বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের পেছনে ব্যয় হয়। এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর একটি পরিপত্রও জারি করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া বিদেশ ভ্রমণে যাওয়া যাবে না। আর সরকারি অর্থে কম প্রয়োজনীয় ভ্রমণ অবশ্যই পরিহার করতে হবে। মন্ত্রণালয়ের সচিব ও অধীন অধিদপ্তর বা সংস্থাপ্রধানরা একান্ত অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ছাড়া একসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণে যাবেন না। এমনকি চলতি বছরের ২৩ মার্চও বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে আরেকটি পরিপত্র জারি করা হয়। এ পরিপত্রে বলা হয়েছে, ঠিকাদার বা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণ অবশ্যই পরিহার করতে হবে। জরুরি কারণ ছাড়া উপদেষ্টা বা সিনিয়র সচিব বা সচিব, একান্ত সচিব বা সহকারী একান্ত সচিবদের সহযাত্রী হিসেবে বিদেশ ভ্রমণ পরিহার করতে হবে। সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা তাদের স্ত্রী কিংবা স্বামী অথবা সন্তানদের সফরসঙ্গী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো সরকার নির্দেশনা জারি করলেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত সরকারি আদেশ পর্যালোচনার ভিত্তিতে বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, অনেকেই মোবাইল টয়লেট, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টের যন্ত্রপাতি, ট্রেইলার, চেইন ডোজার, স্ক্র্যাপার ব্রিজ ক্রয় এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ও নকশাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার নামে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা যেমন আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, আইএলও ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের অর্থায়নে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদনও পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। আবার ঠিকাদার, উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থেও প্রশিক্ষণ, সশরীরে পরিদর্শন, পারফরম্যান্স টেস্ট ও ফ্যাক্টরি অ্যাকসেপটেন্স টেস্টের নামে অনেক কর্মকর্তাকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও এর অধীন প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ বিভাগ ও এর অধীন প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের ৩৫ কর্মকর্তা ঠিকাদার, উৎপাদক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অর্থে বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদন পেয়েছেন।

কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে রাশ টানতে না পারার পেছনে সরকারের সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উল্লিখিত বিদেশ ভ্রমণের অনুমোদনগুলোও সরকারের কাছ থেকেই এসেছে। এতে এ ধরনের ভ্রমণ কেবল সরকারি নির্দেশনার ব্যত্যয় নয়, সরকারের স্ববিরোধী আচরণকেও তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এটি স্বার্থগত সংঘাতকেও নির্দেশ করছে। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কর্মকর্তাদের সফরের ব্যয় বহন করে, তবে তার বিনিময়ে হিসেবে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা রাখে। মূলত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অর্থায়নে এসব ভ্রমণ করানো হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মালপত্র সরবরাহের ক্ষেত্রে নিম্নমানের পণ্য দেয়া, কাজের গুণগত মান কমানোর মাধ্যমে তারা তাদের ব্যয়ের অর্থ পুষিয়ে নেয়। অনেক সময় সফরের সেই ব্যয় পণ্যের মূল্যের সঙ্গেও সমন্বয় করে। আবার কোনো কোম্পানির টাকায় ঘুরে আসার পর ওই কোম্পানির প্রতি নির্দিষ্ট কর্মকর্তার মধ্যে নমনীয়তা তৈরি হয়। সরবরাহকৃত পণ্যের মান যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ওই কর্মকর্তার শিথিল ভূমিকা লক্ষ করা যায়। ওই প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করলেও এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে না। ফলে একদিকে নিম্নমানের পণ্য কিনে জনগণের অর্থের অপচয় হয়। অন্যদিকে জনগণ উচ্চ গুণগত মানসম্পন্ন সেবাও পায় না। নিম্নমানের পণ্য হওয়ায় তা টেকসই হয় না। যে কারণে পুনরায় একই পণ্য জনগণকে কিনতে হয়। এতে তাদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ে।

অর্থনীতির নানা সংকট মোকাবেলায় ব্যয়সংকোচন নীতি নেয়ার পরও কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্বশীলতার অভাবকে স্পষ্ট করে। বিশ্লেষকদের মতে এ চর্চা অনৈতিকও বটে। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তারা অনৈতিকতার আশ্রয় নিচ্ছে, সরকারি নির্দেশ অমান্য করছে। বাস্তবে তারা ট্রেনিং বা বিভিন্ন কর্মসূচির নামে বিনোদনমূলক ভ্রমণে যাচ্ছেন। সম্প্রতি একজন রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমোদিত প্রশিক্ষণ ইন্দোনেশিয়ায় হলেও তিনি গেছেন অস্ট্রেলিয়ায়—এমন ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। সরকারি নির্দেশ অমান্য করা মানে চাকরিবিধি ভঙ্গ করা। এর দায় ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় পর্যায়েও বর্তায়। কেবল নির্দেশ জারি করলেই হবে না, এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া এ প্রবণতা রোধ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে জরুরি হলো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো কর্মকর্তাদের শাস্তির আওতায় আনা।

কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলে কর্মকর্তাদের বিদেশ যেতে হবে, এমন ব্যবস্থা থেকেও বের হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ চাইলে অনলাইনে করা সম্ভব। কিংবা বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষকদের দেশেও আনা যায়। এতে সরকারের ব্যয় অনেকাংশে কমতে পারে। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সহজ হবে। এর বাইরে যেকোনো প্রয়োজনে বিদেশ যেতে হলে অবশ্যই কঠোরভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। সরকারকে এ বিষয়ে কঠোর হতে হবে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের প্রবণতা বজায় থাকা বেশি হতাশাজনক। অনেকেই বঞ্চিত হওয়ার নামে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ নিচ্ছেন। কিন্তু এভাবে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেয়ার ধারা অব্যাহত থাকলে কখনই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না। তাই বর্তমান সরকারের নির্দেশের ব্যত্যয় ঘটানো কর্মকর্তাদের বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন।