গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান অবনমন করেছিল আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা মুডি’স। সে সময় সরকারের ইস্যুয়ার ও সিনিয়র আনসিকিউরড রেটিং এক ধাপ অর্থাৎ ‘বি১’ থেকে ‘বি২’তে অবনমন করে সংস্থাটি। ঋণমান অবনমনের পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাসও স্থিতিশীল থেকে নেতিবাচক করেছিল মুডি’স। এর কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা। অনেকটা একই বিবেচনায় এবার দেশের ব্যাংক খাতের পূর্বাভাস নেতিবাচকে নামিয়ে এনেছে মুডি’স। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে মুডি’স উল্লেখ করেছে, সম্পদমানের অবনতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। খেলাপি ঋণ ক্রমশ বাড়তে থাকায় ব্যাংক খাতের সম্পদের ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতির উচ্চহার বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থরিবরতার পাশাপাশি মুডি’স সামাজিক অস্থিতিশীলতা, পোশাক শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং দেশী-বিদেশী বাজারে চাহিদা কমার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে। মুডি’সের এ ধরনের সিদ্ধান্ত মূলত দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের পূর্ভাবাস।

দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ঘাটতি, সমন্বয়হীন পরিকল্পনা, আর্থিক অব্যবস্থাপনা, দুর্বল শাসন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অভাব—সবকিছু আমাদের অর্থনীতির ভিত্তিকে ভঙ্গুর করে ফেলেছে। যার দরুন দেশে দুই বছরের অধিক সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষ অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করে যাচ্ছে। অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের অভিজাত গোষ্ঠী নানাভাবে মুনাফা লুণ্ঠন করে গেছে। বিশেষত বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে নামে-বেনামে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একই অবস্থা পুঁজিবাজারেরও। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং বিদেশে টাকা পাচারকারীরা এতই ক্ষমতাঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী ছিল যে তাদের কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংক খাতসহ আর্থিক খাত সংস্কারের নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু দিনদিন নানা ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়ছে। আবার কিছু উদ্যোগে অর্থনীতির গতি আরো শ্লথ হয়েছে, যেমনটা মুডি’সের ওই প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর কৌশল হিসেবে দফায় দফায় নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আরো কমেছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিও কমেনি।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ, চাঁদাবাজি, বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয়তা, অনেক কারখানায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো ঘটনাও বেড়েছে। এখনো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ইদানীং মব ভায়োলেন্স, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণ এসব ঘটনা বেড়েই চলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে খুন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে মোট ৫ হাজার ৮৬২টি। আবার বিগত মাসগুলোয় দেড় শতাধিক আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়েছে সরকারকে। সড়ক বন্ধ করে সংঘটিত আন্দোলনে সাধারণ মানুষকেও ভুগতে হয়েছে। এসব সামাজিক অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভাজনও দিনদিন প্রকট হচ্ছে। সবকিছুর প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বিনিয়োগে। এমনিতে দেশে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। উপরন্তু রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় নীতি ধারাবাহিকতা বজায় থাকার ক্ষেত্রে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ কথা অনিস্বীকার্য, অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে খাদের কিনারা থেকে প্রতিনিয়ত টেনে তোলার কাজ করে যাচ্ছে। বড় কোনো বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে বাঁচিয়ে চলেছে। তবে এখন সময় এসেছে এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়ার যা দেশের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোয় সহায়ক হবে। এজন্য মুডি’সের সতর্কবার্তাগুলো আমলে নেয়া প্রয়োজন।

সর্বপ্রথম ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ শতাংশেরও বেশি ঋণ এরই মধ্যে খেলাপির খাতায় উঠেছে। এজন্য পদ্ধতিগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রণগত ঘাটতি ও অর্থ পাচারের মতো অপরাধ তথা শোষণমূলক অনুশীলন বড় ভূমিকা রেখেছে। সুতরাং এসব চর্চায় লাগাম টানা আবশ্যক। অর্থ পাচার বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণ আদায়ে যথাযথ ব্যসস্থা নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।

ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে মনোযোগ প্রয়োজন। কারণ ব্যবসা সহজ ও সুলভ না হলে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে। একটি দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপরই মূলত বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার বিষয়টি নির্ভর করে। আর ব্যবসা খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধিও ঘটে না, যা বেকাররের সংখ্যা বাড়ায়। অথচ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ ও সুদহার দিনদিন বেড়েই চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই খরচ বেশি হলে দেশের নাগরিক বা বিদেশীরা এ দেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন না। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোয় কাজ করতে হবে। এজন্য জরুরি হলো সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এর অন্যতম সমাধান হতে পারে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কারণ তাদের মনে সংশয় রয়েছে, পরবর্তী রাজনৈতিক সরকার হিসেবে কোন দল দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এর সঙ্গে নীতি ধারাবাহিকতার প্রসঙ্গটিও যেহেতু জড়িত, যা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তবে নির্বাচনের প্রস্তুতি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এক্ষেত্রে অবশ্যই সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকার রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে। আবার এটি কেবল আস্থা ফেরানো নয়, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিবেশ স্বাভাবিক করতে হবে। এখন পর্যন্ত এক্ষেত্রে সরকারের কার্যক্রম সন্তোষজনক নয়। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়তেই থাকবে।

কয়েক বছর ধরে দেশের অর্থনীতি বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। উপরন্তু গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নানা ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা-অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। বলা বাহুল্য, এমন পরিস্থিতিতে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ আরো সংকুচিত হয়েছে। তাই সব মিলিয়ে সরকারকে এমন পথে হাঁটতে হবে যেটি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে।