স্বাধীনতার পর গড়ে তোলা হয়েছিল ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। উদ্দেশ্য ছিল সারা দেশে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে স্বল্প মূল্যে পণ্য বিক্রি। সময়ের পরিক্রমায় সংস্থাটির বিপণন কার্যক্রমের উপকারভোগীর সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে শুধু ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমেই সরাসরি উপকারভোগী হিসেবে সংস্থাটির তালিকাভুক্ত রয়েছে এক কোটি পরিবার। মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমানে কার্ডধারীদের বাইরেও পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে টিসিবিকে। সেবার পরিধি বাড়লেও সংস্থাটির সক্ষমতা সেভাবে বাড়ানো হয়নি। দুর্বল করে রাখা হয়েছে সংস্থাটির কার্যক্রম। এ সুযোগে ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়েছে বাজারে। ফলে দেশে দুই বছরেরও অধিক সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না সংস্থাটি। এমনকি রমজানে বাড়ে এমন পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতেও তারা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। সংস্থাটির জনবল ও গুদাম সংকট, দুর্নীতি, মূলধনের অভাবসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে টিসিবিকে শক্তিশালী করা যাচ্ছে না। তাছাড়া জনবলের অভাবে টিসিবির যে আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে, তাও বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। কারো অজানা নয় যে সংস্থাটির ভৌত অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাসহ বেশকিছু অসুবিধার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাজারে তারা প্রতিযোগিতা তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। টিসিবির যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে সেগুলো সংস্কার করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে উদ্যোগ দরকার। সংস্থাটিকে বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নেয়া আবশ্যক।
নব্বইয়ের দশকে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার পর বেসরকারি খাতের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে টিসিবির কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে গেছে। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রণে সহায়ক শক্তি হিসেবে সরকারের ভূমিকা রাখা উচিত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মোট চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। এক্ষেত্রে কোনো অসাধু চক্র অযৌক্তিকভাবে যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ঘাটতি বা দাম বাড়াতে না পারে, তা দেখাও সরকারের দায়িত্ব। টিসিবি হলো সরকারের সেই ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা যায়। গত দুই বছরের অধিক সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কিন্তু টিসিবির পণ্যের ধরন, পরিমাণ ও বিপণনের আওতা সেভাবে বাড়েনি। দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকায় এ মুহূর্তে টিসিবির সক্ষমতা ও কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সারা দেশের স্বল্প আয়ের জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণে টিসিবিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা প্রয়োজন। টিসিবিতে সমস্যার অন্ত নেই। এত সমস্যা নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করা এবং তা থেকে জনগণের সুফলপ্রাপ্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ পরিস্থিতিতে টিসিবির মজুদ সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাসহ পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া উচিত। কেননা ব্যক্তি উদ্যোগের এ যুগে দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপের বিপরীতে টিসিবির মতো ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান দিয়ে বাজারে হস্তক্ষেপও কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি বৃহৎ ও নিত্য পরিবর্তনশীল ভোগ্যপণ্যের বাজারে সামান্য আমদানি, সংরক্ষণ ও বিক্রয় ক্ষমতার সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবিকে আমাদের মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটা কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দরকার বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।
প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকার পাশাপাশি সংস্থাটির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও কম নয়। ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সংস্থাটির বিরুদ্ধে ২৯৭ কোটি ৬ লাখ টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণের তথ্য পাওয়া গেছে। আবার প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে সংস্থাটির কেনাকাটায়ও প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। পর্যাপ্ত নগদ তহবিল না থাকায় সংস্থাটিকে কেনাকাটা চালাতে হয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে। এ ঋণের সুদহার পরিশোধ করতে গিয়ে টিসিবির পণ্যের দামও কিছুটা বেড়ে যায়।
বর্তমানে নিম্ন আয়ের এক কোটি উপকারভোগী কার্ডধারী পরিবারের মধ্যে ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পণ্য অর্থাৎ ভোজ্যতেল ও মসুর ডাল বিক্রি চলছে। পাশাপাশি সাধারণ ভোক্তাদের কাছে ঢাকা মহানগরে ৫০টি ও চট্টগ্রাম মহানগরে ২০টি স্থানে ট্রাকে ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পণ্য—তেল, ডাল ও খাদ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ করা চাল বিক্রি করা হচ্ছে। এ কার্যক্রমের সঙ্গে ঢাকায় আলু বিক্রিও শুরু করেছে। টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল, পাঁচ কেজি চাল ও তিন কেজি আলু কিনতে পারবেন। প্রতি লিটার ভোজ্যতেলের দাম ১০০ টাকা। এছাড়া প্রতি কেজি মসুর ডাল ৬০, চাল ৩০ ও আলু ৪০ টাকায় কিনতে পারবেন ক্রেতারা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। ফলে নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্তরাও টিসিবির ট্রাকসেলের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। অনেকেই ট্রাকসেলের সামনে দাঁড়িয়ে কম দামে পণ্য পেতে ভোগান্তির সম্মুখীন হচ্ছেন। ডিলাররা ট্রাক আনার আগে পণ্য পেতে দীর্ঘ লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকেন ভোক্তারা। ট্রাকভর্তি পণ্য এলে শুরু হয় হুড়োহুড়ি। সরবরাহ কম থাকায় সবার চেষ্টা থাকে কে কার আগে পাবেন। শুধু টিসিবি ট্রাকসেলই নয়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ট্রাকসেলেও একই অবস্থা। তারা ১০ অক্টোবর থেকে রাজধানীতে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি মূল্যে ডিম, আলু, পেঁয়াজ, পেঁপে, লাউ, কাঁচামরিচ ২০টি এলাকায় খোলাবাজারে বিক্রি করছে। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করায় দাম কমাতে এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কিন্তু সেখানে চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম। ভোক্তাদের অভিযোগ, অনেকক্ষণ দাঁড়ানোর পর যা পাওয়া যায় তা সামান্যই। আবার অনেকেই পণ্য না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনায় একই পরিবারের সদস্য একাধিকবার নিচ্ছেন। ফলে ট্রাকসেলের সামনে সৃষ্টি হচ্ছে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির। দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যে ট্রাকসেল কার্যক্রম চলমান রয়েছে সেটাকে সুদূরপ্রসারী করতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সাধারণ মানুষ যাতে নির্ধারিত পণ্য সঠিকভাবে পেতে পারে সেজন্য চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়াতে হবে। আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ অতি কষ্টে আছে। এ অবস্থায় ট্রাকসেল কার্যক্রমের আওতা আরো বাড়ানো জরুরি। সরকারকে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় ট্রাকসেল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। টিসিবিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে জনবল বাড়ানো, নতুন গুদাম তৈরি ও কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের পাশাপাশি নগদ তহবিল বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আপৎকালীন খাদ্য সংকটে সংস্থাটির কেনা পণ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ও বিপণনক্ষমতা বাড়ানো দরকার। টিসিবির যেসব সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা দূর করার পাশাপাশি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও আবশ্যক। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে টিসিবির সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।










