সময়ের পরিক্রমায় দেশ নগরায়ণের পথে বহুদূর এগিয়েছে। নগরায়ণের গতিও দ্রুত ছিল। নগরায়ণের পাশাপশি শিল্পায়নেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করেছে। নগরে জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা পূরণে বেড়েছে আবাসন, স্থাপনার সংখ্যা। গড়ে উঠেছে অসংখ্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অকাঠামো। সেই সঙ্গে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সেবা খাতভিত্তিক অবকাঠামোও। একেকটি শহর হয়ে উঠেছে ‘মেগা সিটি’। কিন্তু এতসব অগ্রগতির ভেতরে অগ্নিনিরাপত্তার কথা সরকার থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, ভবনের স্থপতি, সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থা কারো বিবেচনায় এসেছে বলে প্রতীয়মান হয় না। নয়তো এক সপ্তাহের ব্যবধানে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কীভাবে ঘটে, সেই প্রশ্ন ওঠে। দুর্ঘটনা কারো নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয় নয়—এ কথা বিচারে নিলেও প্রশ্ন জাগে, যেকোনো কার্যকর পদ্ধতিতে দুর্ঘটনা মোকাবেলার মাধ্যমে হতাহত ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু অগ্নিদুর্ঘটনা এড়ানো এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে উদ্ধার কর্মকাণ্ডের নজির দেখে মনে হয়, আজও দেশে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর অগ্নিনিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। সম্প্রতি মিরপুরে এক রাসায়নিক গুদাম ও পোশাক কারখানা, চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (সিইপিজেড) এবং ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুনের ঘটনা সেটিই প্রমাণ করে।
প্রতিবারের মতো এসব অগ্নিকাণ্ডের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান সাপেক্ষে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব উঠে আসবে। কিন্তু এর মাধ্যমে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসবে না, সেটা অনুমান করাই যায়। কোনো জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে না। এমনকি সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের যথাযথ শাস্তির আওতায়ও আনা যাবে না। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো, প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে বিল্ডিংগুলোয় অননুমোদিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো, আগুনের ঝুঁকি ছিল এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সনদ ছিল না। কিন্তু ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের অন্যতম কাজই হলো অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি ও ‘নোটিস’ দিয়ে দায়সারা হওয়া। আগুন লাগার ঝুঁকি আছে এমন ভবনের কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না, যেমনটা সম্প্রতি মিরপুরে আগুন লাগা গুদামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে। অতীতেও একই বিষয় দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে গাউছিয়া ও ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটের কথা বলা যায়। ২০১৯ সালে অগ্নিনিরাপত্তার দিক দিয়ে অতিঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে একাধিকবার নোটিস দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। তবে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যার ফলাফল ২০২৩-এর এপ্রিলে পাওয়া যায়। সেই সময় আগুন লাগে ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে। গাউছিয়া বা নিউ সুপার মার্কেটের মতো রাজধানীর প্রায় ২ হাজার ৬০৩টি ভবন অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিসের গত বছরের এক হালনাগাদ তথ্যে উঠে আসে। এর মধ্যে বিপণিবিতান থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আবাসিক ভবন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ভবনও রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু এর পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় একের পর এক রাজধানীসহ সারা দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা দেখতে হয়। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, বনানীর এফআর টাওয়ার, ইউনাইটেড হাসপাতাল, চকবাজারে রেস্তোরাঁয়, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স, বেইলি রোড, সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোয় বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে যেতে হয় দেশবাসীকে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, গত বছর সারা দেশে ২৬ হাজার ৬৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে কেবল গত বছরই ৪৪৬ কোটি ২৮০ লাখ ৩ হাজার ৯৭ টাকা মূল্যের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। বৈদ্যুতিক গোলযোগ, বিড়ি-সিগারেটের টুকরো, চুলা ও গ্যাসের লাইন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে অধিকাংশ আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে সারা দেশের তুলনায় রাজধানীতে আগুনের ঘটনা বরাবরের মতো বেশি ঘটেছে। কেবল ঢাকায় ৬ হাজার ৬০২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
বড় উদ্বেগের বিষয় হলো আগুন লাগার পর নিয়ন্ত্রণ করতেও বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিসকে। এ কাজে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ। এক্ষেত্রে কখনো দোষ চাপানো হয় জনবল সংকটের ওপর, কখনো সরঞ্জাম ঘাটতির ওপর। এতে অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির দায় নেই। এই দায় নানা সময়ে ক্ষমতায় থাকা সরকার এড়াতে পারবে না। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা কেন বাড়ানো হয়নি, সেই জবাবদিহি নিশ্চিত করবে কে? এমনকি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয় না। সেপ্টেম্বরে গাজীপুরের টঙ্গীতে রাসায়নিকের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ফায়ার সার্ভিসের একাধিক কর্মী আহত হন ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারাও গেছেন। অথচ প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগে আগুন নেভাতে মানুষের পরিবর্তে জিপিএস-নির্ভর রেসপন্স সিস্টেম, ড্রোন সার্ভিল্যান্স, হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। পানির পরিবর্তে অগ্নিনিরোধক রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দেশে আজও শোনা যায় পানির অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে দেরি হয়ে গেছে। কার্যকর রিজার্ভার সিস্টেমও গড়ে তোলা যায়নি।
এসব ঘটনা মূলত অগ্নিনিরাপত্তার ক্ষেত্রে অবহেলাকে নির্দেশ করে। বেশির ভাগ অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধযোগ্য ছিল। কিন্তু ভবন নির্মাণ নীতিমালার (বিল্ডিং কোড) পেছনে বিশেষভাবে দায়ী। আবার ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা-২০০৮-এ ইমারতে অগ্নিপ্রতিরোধক দরজা, উপকরণ এবং অগ্নিনিরাপদ সিঁড়ি থাকার কথা রয়েছে। কিন্তু বিধিমালা লঙ্ঘন করেই যত্রতত্র গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, রেস্তোরাঁ, ঘিঞ্জি বসতি ও বাজার ব্যবস্থা। ২০০৩ সালে অগ্নিকাণ্ড রোধ ও নির্বাপণ আইন অনুযায়ী, কোনো ভবনে আগুন থেকে সুরক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না পেলে সেই ভবনকে অনুপযোগী ঘোষণার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসকে। এছাড়া ২০০৬ সালে জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিতে ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় আনা হয়। কিন্তু এসব আইনকানুন ও নীতিমালার বাস্তবিক প্রয়োগ নেই। কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। যে কারণে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না কিংবা সহজে আগুন নির্বাপণ করা যায় না।
এ পরিস্থিতির জন্য ভবন মালিকসহ প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকদেরও সমান দায় আছে। বারবার আগুন লাগার পরও কার্যকর নজরদারি বা কঠোর শাস্তির নজির নেই। দায়হীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। নীতি আছে, বাস্তবায়ন নেই। এ চর্চা থেকে বের না হলে সামনে আরো ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটবে এবং যা হয়ে আসছে সেগুলোই চক্রাকারে হতে থাকবে।









